ক্রাইম থ্রিলারে 'অনুপ্রাণিত' হয়েই প্রেমিকাকে ৩৫ টুকরো! কী আছে এই ওয়েব সিরিজে

Delhi Murder Case: রেস্তোরাঁয় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আফতাবের। ফলত ছুরি ব্যবহার করে কীভাবে মানুষের দেহ টুকরো টুকরো করা যায়, সেই বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন আফতাব

Arunava Nag Roy
৪ মিনিট
ক্রাইম থ্রিলারে 'অনুপ্রাণিত' হয়েই প্রেমিকাকে ৩৫ টুকরো! কী আছে এই ওয়েব সিরিজে

শ্রদ্ধা ওয়ালকার খুনের মামলায় নড়ে চড়ে বসেছে গোটা দেশ। ১৪ নভেম্বর ২০২২, গোটা দিল্লি শহর ঘুম থেকে উঠে জানতে পারে শিহরণ ধরানো এক খুনের কাহিনি। সকাল হতেই সমস্ত সংবাদমাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ হয়ে ফুটে ওঠে, প্রেমিক আফতাব আমিন পুনাওয়ালা তাঁর লিভ ইন পার্টনার শ্রদ্ধা ওয়ালকারকে খুন করেছেন। তবে এই খুনের বীভৎসতা কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দেবে যে কোনও মানুষকেই। শ্রদ্ধাকে নৃশংস ভাবে খুন করে রাজধানী দিল্লির মেহরৌলিতে সেই দেহ ৩৫ টুকরো করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই প্রেমিক আফতাব আমিন পুনাওয়ালার বিরুদ্ধে! কীভাবে কীভাবে এই হত্যা আর দেহ কাটা, তা দেখে লজ্জা পাচ্ছে বহু ভারতীয় ক্রাইম থ্রিলারও। মুম্বইয়ের এক বহুজাতিক সংস্থার কল সেন্টারে কাজ করতেন আফতাব এবং শ্রদ্ধা। সেখান থেকেই বন্ধুত্ব, প্রেম, লিভ ইন আর ঠান্ডা মাথায় এই নৃশংস খুন। জেরায় আফতাব জানিয়েছেন বিয়ের জন্য চাপ দিত শ্রদ্ধা। তাই তাঁকে খুন করে ফেলেছে সে। এত সহজেই প্রেমিকাকে হত্যা করা যায়? এতটা বীভৎসভাবে খুন করা সম্ভব! পুলিশ সবটা শুনে যা জানিয়েছে তা আরও চিন্তায় ফেলার মতো। পুলিশ জানিয়েছে, আফতাব ডেক্সটার সিরিজটি দেখেই খুন করতে ‘অনুপ্রাণিত’ হয়।

শ্রদ্ধা ওয়ালকার খুনের মামলা নিয়ে যেখানেই কথা হচ্ছে, পারিপার্শ্বিকভাবে উঠে আসছে ডেক্সটার ওয়েব সিরিজটির কথা। জেরায় আফতাব জানিয়েছে, এই ওয়েব সিরিজটি দেখেই শ্রদ্ধাকে খুনের প্ল্যান বানায় সে। ডেক্সটার দেখে ‘অনুপ্রাণিত’ হয়ে শ্রদ্ধার মৃতদেহগুলি ৩৫ টুকরো করেন অভিযুক্ত আফতাব। এরপর মেহরৌলির জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় সেই দেহ টুকরোগুলি ফেলে দেন। ক্রাইম ঘরানার এই ওয়েব সিরিজটি ২০০৬ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রচারিত হয় টেলিভিশনে। আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় ক্রাইম সিরিজ এটি। আমেরিকান এক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন ডেক্সটার মর্গ্যান। সকালবেলা তিনি তুখোড় ফরেনসিক এক্সপার্ট আর রাতের বেলায় তিনিই হয়ে ওঠেন সিরিয়াল কিলার। একের পর এক খুন করে সেই দেহগুলোকে টুকরো টুকরো করে কেটে লোপাট করে দিতেন ডেক্সটার। ডেক্সটার মর্গ্যান চরিত্রটি কাল্পনিক হলেও আফতাব আমিন পুনাওয়ালা একেবারে রক্ত মাংসে গড়া বাস্তবের ডেক্সটার।

এখন প্রশ্ন ওঠে কী এমন আছে এই সিরিজে, যা দেখে আফতাব এত ‘অনুপ্রেরণা’ পেলেন খুন করার। ডেক্সটার সিরিজটি মূলত ডেক্সটার মর্গ্যান নামক এক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞকে কেন্দ্র করে। মায়ামির এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দিনে পুলিশের হয়ে কাজ করলেও রাতে একের পর এক খুন করে বেড়ান। তবে যে কোনও মানুষকেই খুন করে বেড়াতেন ডেক্সটার? মোটেই নয়। ডেক্সটারের চোখের সামনে তাঁর মাকে চেইন-স দিয়ে কেটে দু’ টুকরো করে দেয় এক দুষ্কৃতী। মায়ের সেই রক্তাক্ত দেহ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শিশু ডেক্সটার। এরপর ছোট্ট ডেক্সটারকে দত্তক নেয় হ্যারি মর্গ্যান নামের এক পুলিশ। কিন্তু ওই ছোট বয়সেই মনে মনে সে ঠিক করে ফেলে, যে করেই হোক মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভালোবাসার পরিণতি ৩৫ টুকরো, লিভ ইন সম্পর্কে যেভাবে খুন হলেন শ্রদ্ধা ওয়ালকর!

Delhi Murder Case: পুলিশের দাবি, আফতাবকে বারবার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিল শ্রদ্ধা। কিন্তু আফতাব ছিল লিভ ইনের পক্ষে। প্রথম প্রথম সমস্যা না হলেও, এই কারণে ক্রমে দু’জনের মধ্যে বচসা হতে শুরু করে।

পালক পিতা হ্যারির নির্দেশে পড়াশোনা শেষ করে মায়ামি মেট্রো পুলিশে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে যোগ দেয় সে। কাজের সুবাদে বিভিন্ন কেসের সম্বন্ধে পড়াশোনা করার সুযোগ হয় ডেক্সটারের। এই কেসগুলি সম্বন্ধে পড়তে পড়তেই ডেক্সটার দেখতে পান কীভাবে আইনের প্যাঁচ ব্যবহার করে প্রভাবশালী অপরাধীরা মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর মায়ের মতোই বহু মৃত ব্যক্তির পরিবার। ডেক্সটার ঠিক করেন যাঁদের আইন শাস্তি দিতে পারেনি, তাঁদের নিজেই শাস্তি দেবেন তিনি। রাতের অন্ধকারে মায়ামির ভিজিলান্তে হয়ে ওঠে ডেক্সটার মর্গ্যান। দিনের আলোয় নিপাট ভদ্রলোক ডেক্সটার, রাতের অন্ধকারে সুচারুভাবে একের পর এক খুন করে দেহগুলি লোপাট করতে থাকেন। এই হত্যাগুলিকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হয়েছে এই জনপ্রিয় ক্রাইম সিরিজটি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রণামের ছলে আরডিএক্স বিস্ফোরণ! রাজীব হত্যায় ফাঁসির সাজা পেয়েও কেন মুক্ত নলিনী শ্রীহরণ?

Rajiv Gandhi Assassination: মালা পরিয়ে দিয়ে ধানু রাজীব গান্ধীকে প্রণাম করার জন্য নিচু হয় এবং সেই সময় পোশাকের নিচে বাঁধা ৭০০ গ্রাম ওজনের RDX ভর্তি বেল্টের ট্রিগার টেনে দেয়।

এই সিরিজে ডেক্সটার মর্গ্যানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মাইকেল সি. হল। এই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য এমি অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট টেলিভিশন অ্যাক্টর ক্রিটিক্স চয়েস, স্ক্রিন অ্যাক্টর গিল্ড অ্যাওয়ার্ড-সহ বহু সম্মানে ভূষিত হন তিনি। মাইকেল হলের পাশাপাশি এই সিনেমায় অন্যান্য চরিত্রে দেখা গিয়েছিল জেনিফার কার্পেন্টার, ডেভিড জায়াস, ডেসমন্ড হ্যারিংটনের মতো শিল্পীদের। ২০০৬ থেকে ২০১৩, এই শোয়ের টানা আটটি সিজন প্রচারিত হয় টিভিতে। প্রতিটি সিজনে মোট ১২টা করে, অর্থাৎ গোটা সিরিজে মোট ৯৬টি পর্ব রয়েছে। আইএমডিবিতে এই সিরিজটির রেটিং ৮.৭! বর্তমানে Voot প্লাটফর্মে এই ওয়েব সিরিজটি দেখা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত নভেম্বর মাসে এই শোয়ের একটি বিশেষ স্পিন অফ সিরিজ, ‘ডেক্সটার : নিউ ব্লাডস’ মুক্তি পায়। এই সিরিজটিতে ছিল ১০টি এপিসোড।

এই সিরিজে মানুষকে হত্যা করে দেহ লোপাট করার যে পদ্ধতি দেখানো হয়েছে তা দেখেই নিজের বান্ধবী-প্রেমিকাকে খুন করার পরিকল্পনা করে আফতাব পুনাওয়ালা। সিরিজে দেখানো হতো, মৃতদেহের টুকরোকে প্লাস্টিক ব্যাগে ভরে লোপাট করে দিতেন ডেক্সটার। ঠিক একইভাবে শ্রদ্ধার দেহ লোপাট করার চেষ্টা করেছিলেন আফতাব। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কল সেন্টারে কাজের আগে শেফ হিসেবে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে আফতাবের। ফলত ছুরি ব্যবহার করে কীভাবে মানুষের দেহ টুকরো টুকরো করা যায়, সেই বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন আফতাব। খুন করার পর রক্ত মোছার জন্যও বিভিন্ন ক্রাইম সিরিজে দেখানো উপায় অবলম্বন করেছিলেন তিনি। শুধু ডেক্সটার নয়, শ্রদ্ধা ওয়ালকরকের খুনের আগে আফতাব একাধিক ক্রাইম সিরিজ এবং সিনেমা দেখে পরিকল্পনা কষেছিলেন বলে মনে করছেন তদন্তকারী দলের সদস্যরা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে আফতাব আসলে সাইকোপ্যাথ। তাঁর মানসিক বিকৃতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আফতাব এর আগেও কাউকে এভাবে খুন করেছে কী না তা খতিয়ে দেখা উচিত। নচেৎ প্রথম খুনেই এরকম ভাবে দেহ লোপাট করা সহজ নয়। এই প্রসঙ্গে স্বনামধন্য মনোবিজ্ঞানী সন্দীপ ভোহরা (Dr. Sandeep Vohra) বলছেন, “হয় তিনি এক জন দাগী অপরাধী, নয়তো সম্পূর্ণ মানসিক বিকারগ্রস্ত বা সাইকোপ্যাথ। অতীতে ওঁর এমন অপরাধের নজির থাকলেও থাকতে পারে। পুলিশের খতিয়ে দেখা উচিত। যে ব্যক্তির স্বাভাবিক মানসিক পরিস্থিতি রয়েছে, তাঁর পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব নয়। আফতাব যা করেছেন, তার ১ শতাংশও সাধারণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণত এই ধরনের লোকজনের মধ্যে অপরাধমূলক প্রবণতা আগে থেকেই দেখা যায়। অথবা, তাঁরা মানসিক বিকারগ্রস্ত হন।”

লিখেছেন
Arunava Nag Roy
Arunava Nag Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।