ছত্রে ছত্রে লেগে রয়েছে একুশের রক্ত, যেভাবে তৈরি হল 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি

International Mother Language Day : ভাষা আন্দোলনের বুক ফুঁড়ে উঠে এসেছে এই গান। নিজেই চলমান ইতিহাস হয়ে গিয়েছে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…”

Aritra Som
৩ মিনিট
ছত্রে ছত্রে লেগে রয়েছে একুশের রক্ত, যেভাবে তৈরি হল 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' গানটি

একুশ মানে সংগ্রাম। একুশ মানে বুক চিতিয়ে বন্দুকের সামনে লড়ে যাওয়ার কাহিনি। একুশ মানে ভালোবাসা, মাতৃভাষাকে প্রাণের ভেতর জড়িয়ে রাখা। একুশ মানে রক্তের দাগ। ১৯৫২ সালের সেই ভাষা আন্দোলনের দাগ যেন আজও বয়ে বেড়াচ্ছে সমগ্র বঙ্গদেশ জুড়ে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বরদের মতো অজস্র তরুণ প্রাণ হারিয়ে গিয়েছে। তারপরও নৃশংসতা দেখেছে বাংলার মাটি। কিন্তু লড়াই ছাড়েনি বাঙালি। এ লড়াই মাতৃভাষাকে বাঁচানোর লড়াই। প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটা এলেই মনে পড়ে এমন অজস্র ইতিহাস। কেবল বাংলাদেশ নয়, কলকাতা সহ বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ নিজের নিজের মাতৃভাষার ছাতার তলায় জড়ো হন। স্মরণ করেন সেই দিনটি।

এই গোটা অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি কবিতা। যেখানে শব্দ একসময় হয়ে ওঠে বেয়নেট। একুশের ভাষা আন্দোলন, আত্মত্যাগ, রক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তা-মাঠ, এই সবকিছুর সাক্ষী থেকেছিল মাত্র কয়েকটি লাইনের ওই কবিতাটি। যেন একুশের আত্মার ভেতর দিয়ে সেই কবিতা জেগে উঠেছিল। প্রথমে কবিতা হিসেবে থাকলেও, পরে আপামর বিশ্বে গান হিসেবেই ছড়িয়ে পড়ে সেটি। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”। ভাষা দিবসের সঙ্গে এই গানটি যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন বিশ্বের প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষীর মনে বেজে ওঠে এই গানটি। আক্ষরিক অর্থেই এই শব্দগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রক্তাক্ত এক ইতিহাস। একেবারে ভাষা আন্দোলনের বুক ফুঁড়ে উঠে এসেছে এই গান। কালে কালে নিজেই চলমান ইতিহাস হয়ে গিয়েছে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…”

শুরু করা যাক একেবারে সেই দিনটি থেকেই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঢাকা। পাকিস্তান সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙে এগোতে থাকে একটি মিছিল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষরাও এতে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময় হঠাৎই গুলিবৃষ্টি শুরু করে পুলিশ। রাস্তা ভেসে যায় রক্তে, মুখ থুবড়ে পড়ে অজস্র তরুণ প্রাণ। কেউ কেউ পরিচিত মুখ, অনেকের নামও জানা যায় না। আহত ও নিহতদের নিয়ে আসা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখানেই তাঁদের দেখতে হাজির হন অনুবাদক, লেখক ও তৎকালীন ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী। তখনই দেখতে পান, মেডিকেল কলেজের মাটিতে পড়ে রয়েছে রফিকউদ্দিন আহমেদের দেহ। তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন। মাথায় গুলি লেগেছে তাঁর, গোটা শরীর রক্তে ভেজা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিশ্বের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন ঘটেছিল এই বাংলায়, জানেন কীভাবে জন্ম হয়েছিল পুরুলিয়া জেলার

The world's longest language movement : হিন্দি আগ্রাসন থেকে মাতৃভাষাকে ছিনিয়ে এনেছিল বাঙালিরা, পুরুলিয়ার মাটিতে আজও রয়ে গিয়েছে সেই ইতিহাস

ভাষা শহিদ রফিকের সেই মরদেহের সামনেই বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনিও তখন যুবক। পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনায় তাঁরও শিরায় রক্ত ফুটছে। সামনে যে তরুণের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে, তিনি তো তাঁর ভাইও হতে পারতেন। আবদুল গাফফারের মনে হল, রফিকউদ্দিন তাঁর আপন ভাই। সেখান থেকেই ঝড়ের মতো ভেসে এল কয়েকটি লাইন। ফাঁক বুঝে চটপট লিখে নিলেন সেটি –

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া-এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি”

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমার বোনেরও বর্ণমালায় ২১ শে ফেব্রুয়ারি! ভাষা আন্দোলনে অনুচ্চারিত মেয়েদের কথা

Women in Bhasha Andolan: ভাষার জন্য মার খাওয়া প্রতিটা মানুষের নাম জানুক সকলে, শুধু ভাইয়ের রক্তে নয়, বোনেরও বর্ণমালাতে বেঁচে থাক ২১ শে।

এখান থেকেই হয় শুরুয়াৎ। কিন্তু ইতিহাসের কাহিনি এখনও বাকি রয়েছে। মেডিকেল কলেজেই দেখা হয়ে গেল এক বন্ধুর সঙ্গে। তাঁকে নতুন লেখা কয়েকটা লাইন শোনালেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে কবিতাটি আরও বাড়াতে বললেন। ইতিমধ্যেই ঢাকা কলেজের হোস্টেলে ফিরে যান আবদুল গাফফার চৌধুরী। সেখানে গিয়ে শুনলেন আরেক কেলেঙ্কারি। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির জন্য কলেজ, হোস্টেল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। রাতের মধ্যেই বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে চলে যাওয়ার কথা বলল কর্তৃপক্ষ। ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে আরও কয়েকটা লাইন লিখলেন আবদুল গাফফার।

ঠিক তার পরেরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি আরও একটি মিছিল আয়োজিত হয়। ভাষা শহিদদের স্মরণে বের হওয়া এই মিছিলে ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরীও। হঠাৎই ধেয়ে আসে কয়েকশো পুলিশ। শুরু হয় নির্বিচারে লাঠিপেটা। লাঠির আঘাতে জখম হন আবদুল গাফফারও। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজে। সেখানেই হাজির হন প্রথম দিনের সেই বন্ধু, সৈয়দ আহমদ হোসেন। খবরাখবর নেওয়ার পর তিনি কবিতাটির কথা জিজ্ঞেস করলেন। আবদুল গাফফার জানালেন, হয়েছে খানিকটা। তবে এখনও কিছুটা বাকি। তারপর হাসপাতালে বসেই শেষ করেন “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…” লেখাটি।

ওই বছরই একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন ও শহিদদের নিয়ে প্রথম লিফলেট প্রকাশ করা হয়। সেখানেই প্রথমবার আবদুল গাফফার চৌধুরীর এই কবিতাটি জায়গা পায়। কয়েক হাজার লিফলেট ছড়িয়ে পড়ে গোটা বাংলাদেশে (তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান)। তখনও গান হিসেবে আবির্ভাব হয়নি এই লেখাটির। ১৯৫৩ সালে ঢাকা কলেজের ছাত্র সংসদের অনুষ্ঠানে প্রথমবার এই কবিতাটিতে সুর দেন আব্দুল লতিফ। এই গান গাওয়ার অভিযোগে আব্দুল লতিফ সহ আরও কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়।

তবে এখনকার প্রচলিত সুরটি প্রথম শোনা যায় ১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলে। সুরকার আলতাফ মাহমুদ এই কবিতায় সুর দেন। বাকিটা, ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের শিরায় শিরায় আজও বইছে এই গানটি। সেখানে লেগে আছে আবেগ, লেগে আছে চিৎকার, প্রতিবাদ, রক্ত আর বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর স্বাধীনতা।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।