'আসতে লেডিস' সমঝে বলুন, স্টিয়ারিংটা তারই হাতে

Piya Saha
৪ মিনিট
'আসতে লেডিস' সমঝে বলুন, স্টিয়ারিংটা তারই হাতে

'আস্তে লেডিস কোলে বাচ্চা' - কলকাতাবাসীর কাছে কথাটা তো খানিক প্রবাদের মতোই। বাসে- ট্রামে, চলতে ফিরতে কখনও বা ঠাট্টার ছলে একথা শোনেনি এমন মানুষ বোধহয় নেই। আর এখানেই যেন বুঝিয়ে দেওয়া হয় মেয়েরা সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।কিন্তু কোলের সন্তান যে কখনই মায়ের দুর্বলতা নয় বরং লড়াইয়ের কারণ একথা প্রতিটি ' মা '-ই জানেন। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই অদম্য সাহসে উপড়ে ফেলেন সমাজের বদ্ধমূল চিন্তার শিকড়। সেকারণেই বোধহয় সন্তান কোলে মাঠে আসেন পাকিস্তানের মহিলা দলের অধিনায়ক বিসমা মারুফ। বাসের স্টিয়ারিং ধরতে বাধ্য হন বেলঘরিয়ার প্রতিমা পোদ্দার। মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় হাজার মায়ের লড়াই। পুরুষশাসিত এক পেশাকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিতে দু'বার ভাবেন নি তিনি। সেখানেই অনন্য প্রতিমা। কলকাতার প্রথম মহিলা বাস চালিকা প্রতিমা পোদ্দার। নিমতা- বেলঘরিয়া- হাওড়ার রাস্তায় মিনিবাস চালান তিনি। তবে যাত্রীর আসন থেকে চালকের আসনে বসার কাহিনি মোটেও সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নিজে মুখেই জানালেন তাঁর লড়াইয়ের গল্প

প্রতিমা আপনি কাজের জায়গা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আউট অফ দ্য বক্স ভেবে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। আমি শুরুতেই জানতে চাইব আপনার বেড়ে ওঠাটা নিয়ে। আসলে বুঝতে চাইছি আপনার বেড়ে ওঠার পর্বটা আর পাঁচজনের মতোই পুরুষতান্ত্রিক পরিসরে কিনা।

ছোটবেলা কেটেছে নিমতা পাইকপাড়া এলাকায়। খুব সাধারণ একটি ছোট পরিবারে আমার জন্ম।ছোট বয়সে মায়ের হাতে হাতে সংসারের কাজে সাহায্য করেছি মাকে। এরপর সেখান থেকেই মাধ্যমিক পাশ এবং উচ্চমাধ্যমিকের জন্য স্কুলে ভর্তি হওয়া। তবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর পরই আমার বিয়ে হয়ে যায়। অবশ্য শ্বশুরবাড়ির থেকেই আমি পরীক্ষা দিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছি।

আপনি কবে থেকে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হলেন?

২০০৬ সালে প্রথম লাইসেন্স হয় আমার। এর আগে স্বামীর কাছেই গাড়ি চালানো শিখেছি। তবে লাইসেন্স পাওয়ার বেশকিছু বছর পরে ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাই। আজ প্রায় দশ বছর হয়ে গেল এই পেশার সাথে যুক্ত।

অন্য কোনো তথাকথিত 'মহিলাদের কাজ' ছেড়ে বাস চালানোর চিন্তা কেন মাথায় এল?

আমি যেহেতু গাড়ি চালানো জানতাম তাই অন্য কাজের কথা মাথায় আসে নি। এর আগে আমি অ্যাম্বুলেন্স চালিয়েছি। পরবর্তীকালে বাসের কন্ডাক্টরিও করেছি। স্বামীর অসুস্থতার জন্য তিন চার মাস ঘরে বসে গিয়েছিলেন। সেই সময় বাস ড্রাইভারের সিটে বসা।

বাস ড্রাইভার বলতেই তো আমাদের চোখের সামনে একজন পুরুষের কথাই মনে আসে। মহিলা চালক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি পড়েছেন?

প্রথম দিকে যখন শুরু করেছি তখন কেউ মহিলা বাস ড্রাইভারের দেখেন নি, তাই প্রথম দেখে অনেকই আঁতকে উঠেছেন।আবার অনেকে চোখে পড়লে পাশের মানুষকে ডেকে দেখাতেন। মহিলা বাস চালক দেখে অনেকে আবার ভয়ে নেমেও গেছেন বাস থেকে।ভেবেছেন আদৌ ঠিকভাবে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা। আবার বাস চালাতে চালাতে বহু যাত্রীর কথা কানে এসেছে যাঁরা আলোচনা করছেন আর কি অন্য কোনো কাজ ছিল না? এখন কাদম্বিনী গাঙ্গুলি যখন ডাক্তার হয়েছিলেন তখনও তো অনেকেই প্রশ্ন করেছেন ডাক্তারি ছাড়া আর কি অন্য কোনো কাজ ছিল না ? আজ এত বছর পরেও কিন্তু সেই একই প্রশ্ন থেকে গেছে।

আপনার সহকর্মী পুরুষ চালকদের থেকে কতখানি সাহায্য পেয়েছেন ?

শুরুর দিকে অনেক বাঁধা এসেছে। অনেক বাস চালক স্ট্যান্ডে ঝামেলা করেছেন একজন মহিলা কেন আসবেন স্ট্যান্ডে এই নিয়ে। আবার বেশ কিছু সময় তাঁরা গাড়ি চালাতে দেবেন না বলে স্টিয়ারিংয়ে ওপর উঠে বসে আছেন। গাড়ি চালানোর সময়েও আগে পিছের চালকদের থেকে অনেক কথা শুনেছি। মহিলা বাস চালিকা বলে অনেক পুরুষ চালকদের ধারণা ছিল হয়তো তাঁর গাড়ি বেশি যাত্রী টানছে। তাঁদের লোকসান হচ্ছে।এমন অনেক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। তবে আজ ধারণা একটু হলেও বদলেছে।

কটূ কথার মোকাবিলা করেছেন কীভাবে?

ঘরে বাইরে অনেক কথাই শুনতে হয়েছে। তবে আমি মনে করি ছেলে মেয়ে উভয়েই সব কাজ করতে পারে। আমাদের সমাজে একদম ছোটবেলা থেকেই শিখিয়ে দেওয়া হয় এই কাজগুলি মেয়েদের এবং এগুলি ছেলেদের কাজ। এই পৃথক কাজের ভিত্তিতেই আমরা ভাগ হয়ে যাই।কিন্তু জন্মানোর পর থেকেই যদি সবাইকে সব কাজ শেখানো হয় তবে কিন্তু এমনটা হয়না। অনেক কটু কথাই শুনেছি তবে সেই সময় আমার স্বামীর সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ না করলে আমার সন্তানদের এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম না। মানুষের কথা কান দিয়ে শুনেছি, চোখের জল ফেলেছি।আবার জল পুঁছে বেরিয়ে পড়েছি কাজে।

আপনার স্বামীর থেকে কতখানি সমর্থন পেয়েছেন এই কাজে?

আমার স্বামী শ্বাশুড়ি এবং ননদ এই কাজকে সমর্থন করলেও অনেক আত্মীয়স্বজন প্রশ্ন করেছেন এই কাজ ছাড়া অন্য কিছু কি করা যেত না ? স্বামীর প্রেরণাতেই এই সবকিছু করেছি।একজন মহিলা যেমন পুরুষদের পাশে থাকে তেমন পুরুষরাও যদি মহিলাদের পাশে থাকে তবেই সমাজ এগোবে।আমাদের দুই কন্যাসন্তান। তাঁদের দুজনকেই ছোটবেলা থেকে খেলা শিখিয়েছেন উনি। দুজনেই এখন জাতীয় স্তরে খেলায় অংশগ্রহণ করে।আমার পাশাপশি আমার বড় মেয়েকেও সব ধরনের গাড়ি চালানো শিখিয়েছেন।আমরা দুজন যে লড়াই করেছি তা কথায় বলে বোঝাতে পারবো না। এখনও দুজনে একসাথেই কাজ করি। আমি বাস চালালে উনি কন্ডাকটর এবং উল্টো ঘটনাও ঘটে। মহিলা বলে বাস চালাতে দিত না সেই থেকে লোন নিয়ে বাসও কিনেছি নিজেদের।

পেশার কারণে নিশ্চয়ই অনেক সময় রাত করে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।সেক্ষেত্রে কী কখনও শহরটাকে অচেনা ঠেকেছে?

সত্যি বলতে আমার কখনই রাতের শহরকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়নি। আমার দুই মেয়েকে নিয়েও যখন কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় প্র্যাকটিস করাতে নিয়ে যেতাম তখনও অনেক সময়েই রাত হয়েছে বেলঘরিয়া পৌঁছতে।আর তখন আমি একেবারে ঘোমটা মাথায় ঘরের বউ ছিলাম কিন্তু সত্যি বলতে ভয় হয়নি কখনও।

পেশাকে ঘিরে অনেকেরই স্বপ্ন, উচ্চাশা থাকে, তা কখনও ব্যক্তিক, কখনো আবার সমষ্টিগত। আপনি কী ভাবেন এই পেশাটা নিয়ে?

আমি চাই আরও মেয়ে এই পেশায় এগিয়ে আসুক।তাহলে অ্যাকসিডেন্টের পরিমাণ অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি অনেকগুলো সংসারও বেচেঁ যেতে পারে এভাবে। অনেক মহিলা যোগাযোগ করে শিখতেও চেয়েছেন। একজন মহিলা বাড়ি খুঁজে চলেও এসেছিলেন বাড়িতে।

সমাজের চিরাচরিত ধারণাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন।এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে মহিলাদের কী বার্তা দেবেন আপনি ?

এই নারী দিবসে আমি মহিলাদের বলবো তাঁরা যেন কোনো দিক থেকেই পিছিয়ে না থাকে। সমস্ত কাজেই মহিলাদের এগিয়ে আসতে হবে।লোকে কী বলবে, সেকথা ভাবলে চলবে না। আমি মনে করি কাজকে ভালোবাসলেই তাঁরা সবদিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।