মাটির মানুষ আমার 'ইরফান ভাই'

Memories of Irrfan: ইরফান ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করাটা একটা অভিজ্ঞতা! ইরফান সংলাপ বললেই আমাদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেত। মনে হত কেবল অভিনয়টাই দেখি! মনে হত প্রতিটা পদক্ষেপ থেকে শেখার কিছু রয়েছে।

Shiraz Mukherjee
৭ মিনিট
মাটির মানুষ আমার 'ইরফান ভাই'

মূলত বিজ্ঞাপন জগতে আমার কাজ। তবে আমি তিগমাংশু ধুলিয়ার সহকারী হিসেবে কাজ করেছি দীর্ঘদিন। সেই সূত্রেই ইরফান খানের সঙ্গে পরিচয়। আমার 'ইরফান ভাই'। ছবির জগতের লোকেদের কাছে, বিশেষত যাঁরা ছবি নির্দেশনার স্বপ্ন রাখেন, তাঁদের কাছে ইরফানের বিষয়ে দু'কথা বলার সুযোগ পাওয়া খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার।

প্রথম আলাপ

ইরফানের সঙ্গে একেবারে দিনক্ষণের বিচারে প্রথম আলাপ কবে, তা মনে করা একটু কঠিনই। তিগমাংশুর একেবারে প্রথম দিকের সহকারী আমি। বোম্বে আসার পরে কেবল তিগমাংশুকেই অ্যাসিস্ট করেছি। ইরফান তিশুর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ফলে বলা যায়, ইরফানের সঙ্গে আলাপটা আমার ভাগ্যে ছিল। খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। একরকম ইরফানের প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম।

ক্রিকেট ও ইরফান

আমাদের আলাপের নেপথ্যে আরেকটি অনুঘটক ছিল। তিগমাংশু ধুলিয়া বা ইরফান খান কেউ রাতারাতি হয়ে যান না। তার আগে একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি-পর্ব থাকে। স্ট্রাগল থাকে। আমার সঙ্গে এঁদের আলাপ সেই লড়াইয়ের দিনগুলিতে। তখনও এঁরা নিজেদের তৈরি করছেন। তিগমাংশুর নিজের কেরিয়ার সবে শুরু করেছে। ইরফান খানও টুকটাক কাজ করছেন। ফলে হাতে প্রচুর অবসর। তখন তিগমাংশুর বাড়িতে আমাদের মদ্যপানের আসর বসত। ইরফানের সঙ্গেও নিয়মিত আড্ডা হত সেখানে। এ ছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ক্রিকেট। এই একটা ব্যাপারে আমাদের খুব মিল। আমরা ক্রিকেটের ভক্ত। ইরফান আবার খুব ভালো খেলতেনও। খুবই ভালো ব্যাটার ছিলেন। বলও ভালো করতেন। তিগমাংশুর বাড়ির নিচে আমরা টেনিস বলে ক্রিকেট খেলতাম রোজ। বহু অভিনেতাই খেলতে আসতেন। ফলে, ক্রিকেট ছিল আমাদের কাছে একটা বন্ধুত্বের পরিসর।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বলিউডের নতুনরা খারাপ ছাত্র, সকলে শুধু বিখ্যাত হতে চায়: তিগমাংশু ধুলিয়া

তিগমাংশু ইনস্ক্রিপ্ট-এর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন তাঁর কাজের দর্শন, ভাবনা, ইরফান খানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বন্ধুত্বের সাতসতেরো।

অ-বাক বিস্ময়

আমি টুকটাক অভিনয়ও করতাম। ইরফান ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করাটা একটা অভিজ্ঞতা! ইরফান সংলাপ বললেই আমাদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেত। মনে হত কেবল অভিনয়টাই দেখি! মনে হত প্রতিটা পদক্ষেপ থেকে শেখার কিছু রয়েছে। সে সময় কোথায় ইরফান ভাই! আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে চিত্রনাট্যের পাতা থেকে উঠে আসা জীবন্ত এক চরিত্র। কখনও বিহারি উচ্চারণে কথা বলছেন অনর্গল। চেনাই যাচ্ছে না। কখনও ইংরেজি। যদিও ইংরেজি উচ্চারণ খুব একটা ভালো ছিল না ইরফান ভাইয়ের। তা না হলে হয়তো হলিউডে আরও প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন। ভাষায় সমস্যা থাকলে অভিনেতার অভিনয়েও একটু সমস্যা হয়। তারপরেও তিনি ইংরেজিতে যেভাবে সংলাপ বলতেন, আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম।

তিগমাংশু ধুলিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা পারিবারিক হয়ে গিয়েছিল। তিগমাংশুর মেয়ে জানসি যেবার হল, সেবার আমি হাসপাতালেও গিয়েছিলেম। ইরফান ভাইও ছিলেন। জানসি আর বাবিল পিঠোপিঠি। এদের বেড়ে ওঠা আমার চোখের সামনেই। কোথাও শুটিং চলছে হয়তো। তিশু আর ইরফান ব্যস্ত। আমি বাবিলের সঙ্গে বা জানসির সঙ্গে খেলেছি, দেখভাল করছি। এমন ভাব হয়ে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে ওদের খুব জমত।

আমি বোম্বেতে দুর্গাপুজোর স্টল দিতাম। রোল, ফিশফ্রাই─এ সবের স্টল আর কি। দু'পয়সা রোজগার হত তাতে। সেই স্টলে সস্ত্রীক তিশু ভাই, ইরফান ভাই হাজির। "আরে দাদা, বসুন বসুন। বলুন, কী নেবেন?” “ভেটকি মাছ খাওয়াও তো ভাই!” ইরফান ভাইয়ের স্ত্রী সুতপাদি বাঙালি। তিনি তো বাঙালি খাবার খুব পছন্দ করতেন। আমাদের স্টলে এসে ঘুগনি খেতে চাইতেন। ইরফান নিজেও রান্না করতে খুব পছন্দ করতেন। ওঁর যা পড়াশোনা, আমি খুব কম অভিনেতার অত বিপুল পড়শোনা দেখেছি। বিশ্ব-সাহিত্যের ওইরকম জ্ঞান না থাকলে বোধহয় ভালো সিনেমাবোদ্ধা হওয়া সম্ভব নয়। এত ধরনের ছবি দেখতেন! নির্দেশকেরা প্রচুর সিনেমা দেখেন, জানি। তিগমাংশুকে ফিল্ম-বাফ বলা যায়। কিন্তু একজন অভিনেতা এত ছবি দেখেন, এ জিনিসও বিরল। জাপানি ছবি, স্প্যানিশ ছবি, লাতিন-আমেরিকার ছবি─কী দেখতেন না!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পরিচারিকা, স্ত্রী, বিতর্কিত যৌনতা! অভিনেতার নেপথ্যে রয়েছেন অন্য নওয়াজউদ্দিন

Nawazuddin Siddiqui: ২০১০ সালে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী বিয়ে করেন অঞ্জনা কিশোর পাণ্ডেকে। অন্য ধর্মে বিয়ের নিয়ম মেনে অঞ্জনা নিজের নাম বদলে করেন আলিয়া।

চিত্রনাট্য ও ইরফান

ইরফান যখন একটু বিখ্যাত হয়েছেন, তখন তাঁর কাছে রাশি রাশি চিত্রনাট্য আসত। সমস্ত চিত্রনাট্য খুঁটিয়ে পড়তে দেখতাম তাঁকে। "এত চিত্রনাট্য আপনি পড়েন ইরফান ভাই?” আমাকে বলেছিলেন, “পড়তেই হয়। চিত্রনাট্য না পড়লে অভিনেতা হওয়া যায় না।" ওঁকে দেখে আমি বুঝেছিলাম, উঁচু দরের অভিনেতা হতে গেলে কেবল ভালো সংলাপ বলতে পারলেই হয় না। একই সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পড়াশোনা প্রয়োজন। ওঁর মতো চিত্রনাট্য পড়তে আমি খুব অভিনেতাকেই দেখেছি।

মাটির মানুষ

ব্যক্তিগত পরিসরে মাটির মানুষ ছিলেন ইরফান। বিখ্যাত হওয়ার পরেও তাঁকে দেখেছি, অত্যন্ত সাদামাটা থাকতেই পছন্দ করতেন। মাঝেমাঝে সিগারেট পর্যন্ত চেয়ে খেতেন। একটা ঘটনার কথা বলি। তখন আমি ব্যাচেলর। একটা বন্ধুর সঙ্গে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। দিওয়ালির রাত। মদ্যপানের সঙ্গে একটু আধটু তিনপাত্তি খেলা চলত আমাদের। ওই দু'টাকা পাঁচ টাকার বাজি আর কি। খুব বড় মাপের কিছু না। সেবার তিশু আর ইরফান ভাই এসেছেন। ইরফান ভাই তাস খেলতে খুব ভালোবাসতেন। আর আমি তখন ভয়ে খেলতে চাইতাম না। এমনিতেই পকেট গড়ের মাঠ। তার উপরে হেরে গেলে পরের দিনের বাসভাড়া টুকুও থাকবে না আর কি! সেদিনও উঠে রান্না ঘরে গিয়েছি কোনও কারণে। হঠাৎ পিছনে ইরফান ভাইয়ের গলা। "হ্যাঁ রে, তোর কাছে কিছু হবে?” আমার কাছে তখন হাজার টাকা মানে বিরাট ব্যাপার। আমি বললাম, “হ্যাঁ! আছে তো! শ পাঁচেক টাকা আছে।" শুনে ইরফান ভাই একটু বিমর্ষ হয়ে পড়লেন, “ধুর! ওতে কী হবে! দশ-বারো হাজার থাকলে জমত।" জীবনটা চুটিয়ে উপভোগ করতেন ইরফান ভাই। 'ডিপ্রেশন' শব্দটাই ওঁর ডিকশনারিতে ছিল না। সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টা, ক্রিকেট, সিনেমা নিয়ে আড্ডা─এই চলছে। তার সঙ্গে ছিল ঘুড়ি ওড়ানো। ঘুড়ি ওড়াতে এত পছন্দ করতেন! অত বিখ্যাত হওয়ার পরেও সে উৎসাহে ভাঁটা পড়েনি। গুলি খেলতে ভালোবাসতেন। এই সাদামাটা জীবন ক'জন অভিনেতার রয়েছে? এখানেই ইরফান সবার থেকে আলাদা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিনয় মজুমদার: আমার তিন টুকরো স্মৃতি

Binoy Majumdar: অকস্মাৎ বিনয় মজুমদার দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, “ভালোউ? ভালোউ কারে বলো? আমি কি আর কোনওদিন ভালোউ হবো? একটা দশ বছরের বালকের মতো মন কি আমি আর পাবো কোনওদিন?”

তিশু আর ইরফান

তিগমাংশুর সঙ্গে ইরফানের একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব ছিল। সেটা যাঁরা নিজের চোখে দেখেছেন কেবল তাঁরাই অনুভব করতে পারবেন। মনে হয়, পরিচালক এবং অভিনেতার মধ্যে এই ধরনের একটা সম্পর্ক থাকা খুব জরুরি। যা বন্ধুত্বকেও ছাপিয়ে যায় কোনও কোনও সময়। ওঁদের মধ্যে ঝগড়া হত, গালাগালি হত, একে অপরকে হুকুম করতেন স্বচ্ছন্দে। এই অধিকারগুলো ওঁরা একরকম অর্জন করেছিলেন। তিশুর বাড়িতে তখন সান্ধ্য আড্ডার কথা আগে বলেছি। সেখানে মদ্যপান-টান করতাম আমরা। একবার ইরফান ভাই এসেছেন, আমিও আছি। কোনও একটা ব্যাপারে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে দু'জনের। রাগ করে ইরফান ভাই উঠে গিয়েছেন। লিফটে করে একেবারে নিচে। মিনিট পাঁচেক পরেই দেখা গেল লিফটটা আবার ফিরে আসছে। দরজা খুলতেই ইরফান ভাই। তাই দেখে তিশু বলল, “পারো, তোমার দেবদাসকে (তিগমাংশু) ছেড়ে যাবে কোথায়? ফিরে তোমায় আসতেই হবে!” তারপর পরস্পরকে আলিঙ্গন করে সে কি হাসি দু'জনের! এই রকম বন্ধুত্ব চট করে খুব একটা দেখা যায় না। সেই কারণেই সম্ভবত এত ভালো কাজ করেছেন ইরফান তিগমাংশুর নির্দেশনায়।

এগারো

যখন নিজে স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করেছি, সে সময় ইরফান ভাইয়ের সঙ্গে একটা প্রজেক্টে আমি জড়িয়ে পড়েছিলাম। সেও এক স্মৃতি। সে সময় 'এগারো' নামে একটা বাংলা ছবি মুক্তি পায়। ১৯১১ সালে মোহনবাগান ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আইএফএ শীল্ড জয় করে। দলের অধিনায়ক ছিলেন শিবদাস ভাদুড়ী। ব্যাপারটা জাতীয় জয় হিসেবেই নিয়েছিল ভারত। সে বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অর্ধশতবর্ষ পূর্তি। প্রথম জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হচ্ছে কংগ্রেস অধিবেশনে, লর্ড হার্ডিঞ্জ বঙ্গভঙ্গ রদ করছেন। সেই আবহেই মোহনবাগানের জয় পরিণত হচ্ছে জাতীয় জয়ে। ছবির বিষয়বস্তু ছিল সেই ম্যাচ। ছবিটা দেখে আমি যারপরনাই অবাক। কারণ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা নিয়ে এত বাজে ছবি হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। ঠিক করলাম, এই বিষয়টা নিয়েই আমি ছবি করব। ইরফান ভাই সে সময় আমায় খুব সাহায্য করেছিলেন। তাঁরও ইচ্ছে ছিল ছবিটা হোক। ইরফানই আমাকে কলকাতা পাঠালেন। গবেষণার খরচ দিলেন। সে সময় কলকাতায় শিবকুমার ভাদুড়ীর বাড়ি থেকে শুরু করে বাকি খেলোয়াড়দের বাড়ি খুঁজে খুঁজে উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে কথা বলেছি। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ছ-সাত মাস ধরে গবেষণা করে তারপর রিতেশ শাহ'র সঙ্গে বসেছি। এই রিতেশই 'পিঙ্ক' ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিল। রিতেশের সঙ্গে চিত্রনাট্যের একটা প্রাথমিক খসড়া তৈরিও হয়ে গিয়েছে ততদিনে। ইরফান ভাই মোহনবাগানের তৎকালীন কোচ শৈলেন বসু-র চরিত্রে অভিনয় করবেন। হঠাৎ একদিন ইরফান ভাই এসে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে জানালেন, সম্ভবত এই বিষয়ে আর কাজ করা যাবে না। কারণ, সুজিত সরকার নাকি একই বিষয়ে কাজ করছেন জন আব্রাহামের সঙ্গে। তখন সুজিতের সঙ্গে 'পিকু'র কাজ করছেন ইরফান ভাই। সেই সূত্রেই সম্ভবত খবর পেয়েছেন। আমার মাথায় হাত! এত দিনের খাটাখাটনি! সুজিতদাও ফুটবলপ্রেমী। কাজেই ব্যাপারটা মোটেই অসম্ভব নয়। ঘটনাচক্রে যে সময় আমি ছবিটা করার কথা ভেবেছি, সুজিতদাও ভেবেছে। কী আর করা! ইরফান ভাই প্রজেক্টটা আপাতত মুলতুবি রাখতে বললেন। বললেন, "দেখছি কী করা যায়!” আমার মনটা ভেঙে গেল। এতদিনের এতখানি সময় ব্যয় করে, দিনরাত খেটে তথ্য জোগাড় করেছি, চিত্রনাট্য পর্যন্ত প্রায় তৈরি, সেই প্রজেক্ট বাতিল হয়ে গেল! এরপরে সুজিত সরকারের সঙ্গে কাজটা করার চেষ্টা করেছিলাম। ইরফান ভাই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আর সেই উৎসাহ পাইনি। ফলে চিত্রনাট্য ঠিকঠাক হল না। সুজিতদারও পছন্দ হল না। ইরফান ভাই ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন। এই সিনেমাটা না করে উঠতে পারা আমার জীবনের সবথেকে বড় আক্ষেপগুলোর একটা।

কালামের বায়োপিক

আমার মনে হয় স্বাধীন ভারতবর্ষে এপিজে আবদুল কালামের মতো বিরাট মাপের মানুষ আর আসেননি। মহাত্মা গান্ধী জাতির জনক। তাঁকে নিয়ে বিপুল চর্চা হবে─এ'টাই স্বাভাবিক। তবে আবদুল কালাম, আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, তাঁর মতো মানুষ হয় না। ওঁর সম্বন্ধে কয়েকটা বই পড়ি এককালে। আমার এতটাই পছন্দ হয়, যে মনস্থির করে ফেলি আমি আবদুল কালামের জীবনের উপর একটা ছবি করব। নাম ভূমিকায় ইরফান ভাই। তাঁকে বলি। আমাকে বাড়িতে ডাকেন ইরফান। "কী ব্যাপার?” পুরোটা মন দিয়ে শোনেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন পাক্কা দু'মিনিট। কোনও কথা নেই। তারপর বলেন, "হায়দরাবাদ থেকে কয়েকজন প্রযোজক দেখা করতে আসছেন পরশু। ঠিক এই বিষয়েই ছবি করছেন। তুমি তাহলে এসো সেই মিটিং-এ। আমি বলে দেব।" আমি তখন ঠিক বুঝতে পারছি না আমার খুশি হওয়া উচিত নাকি দুঃখ পাওয়া উচিত! এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। আমি যা ভেবেছি, ঠিক তাই ভেবে ফেলেছে অন্য কেউ। সেটা নিয়ে যেমন মনখারাপ, আবার কাজটার সঙ্গে যুক্ত থাকব—এর একটা উত্তেজনাও কাজ করছে। হায়দরাবাদের কয়েকজন বিখ্যাত প্রযোজক। ইরফান ভাই আলাপ করিয়ে দিলেন। তাঁদের নিজস্ব চিত্রনাট্য লিখিয়ে রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে একত্রে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি─এ'টাও কম কথা নয়! সমস্ত ঠিকঠাক। চুক্তির ব্যাপারেও কথাবার্তা শুরু হয়েছিল। সেই সময়ই ইরফান ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিছুদিন যোগাযোগ ছিল না। হঠাৎ জানতে পারলাম ওঁর ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তারপর তো চলেই গেলেন। এই ছবিটাও আর হল না। বর্তমানে ভারতের আর কোনও অভিনেতা আবদুল কালামের চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।

শেষ দু'টি কথা

আমার বইয়ের ব্লার্বে ইরফান ভাই ভালোবেসে দু'টি কথা লিখে দিয়েছিলেন। "চমৎকার একটি বই। অবশ্যই এর থেকে সিনেমা হওয়া প্রয়োজন।" আমার মনে হয় এই ছোঁয়াটুকুই যথেষ্ট। এ আমার নিজের অর্জন। মানুষটা অকালে চলে গেলেন। তবে তার মধ্যেই ভারতীয় অভিনয়ের জগতে একটা মাপকাঠি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। যা দিয়ে সমস্ত ভারতীয় অভিনেতাদের বহুদিন বিচার করবেন দর্শক। আর রইল পড়ে আমাদের মতো কিছু সহকারী কাম বন্ধুবান্ধবের দল, তাঁদের জন্য রেখে গিয়েছেন একরাশ মমত্ব, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, মেদুর অবেলার স্মৃতি। শুধু অভিনয় নয়, ব্যক্তিত্বের এই যাবতীয় খুঁটিনাটি ইরফানকে ইরফান করে তুলেছিল। এর মধ্যেই ইরফান আমাদের কাছে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।

লিখেছেন
Shiraz Mukherjee
Shiraz Mukherjee
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।