মোদির পাখির চোখ সিঁদুর! দুর্নীতির ইস্যু নিয়ে মাথাব্যথা নেই?

West Bengal: বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ইস্যুতে কেন্দ্রকে সমর্থন করলেও, ভেতরে অভিযোগ ছিলই যে আসলে অপারেশন সিঁদুরও ভোট টানারই কৌশল। রাজ্যে শিক্ষকদের লড়াই, দুর্নীতি ইত্যাদি ইস্যু ছাপিয়ে এখন সিঁদুরের ছাপ।

inscript
৩ মিনিট
মোদির পাখির চোখ সিঁদুর! দুর্নীতির ইস্যু নিয়ে মাথাব্যথা নেই?

সিঁদুর শব্দটি নিয়ে মাসখানেক ধরেই ভারতবর্ষ উত্তাল। ধর্মে যারা হিন্দু, সেই মহিলাদের বিবাহপরবর্তী চিহ্ন। কেন সিঁদুর নিয়ে তরজা? কারণ পহেলগাঁওয়ে লস্করের ছায়া সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট বেছে বেছে হিন্দুধর্মের পুরুষ পর্যাটকদের খুন করে (তাঁদের বাঁচাতে গিয়ে স্থানীয় মুসলিম যুবকের প্রাণ যায়)। অর্থাৎ এই পুরুষদের স্ত্রীদের সিঁদুর মুছে দেওয়া হয় এক অর্থে। তারপর ভারত অপারেশন সিঁদুর নামে প্রত্যাঘাত করে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সন্ত্রাসী ডেরাগুলিতে। এরপর আরও সংঘাত বাড়ে। তবে অপারেশন সিঁদুর নামটি নিয়ে চর্চা থামেনি। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই ইস্যুতে কেন্দ্রকে সমর্থন করলেও, ভেতরে অভিযোগ ছিলই যে আসলে অপারেশন সিঁদুরও ভোট টানারই কৌশল। রাজ্যে শিক্ষকদের লড়াই, দুর্নীতি ইত্যাদি ইস্যু ছাপিয়ে এখন সিঁদুরের ছাপ।

সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'সিঁদুর' নিয়ে মন্তব্য করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অগভীর মন্তব্যগুলি পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের নিবিড় চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিতই নয়। অপারেশনের নামকরণ নিয়ে মমতা বলেছেন, "সব নাম কেন্দ্রীয় সরকারই ঠিক করে। অপারেশন সিঁদুর নামটা দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিকভাবে ক্যাচ করার জন্য। আমি এতদিন কিছু বলিনি। কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হলাম। প্রথমবার নির্বাচনের আগে (মোদি) বলেছিলেন চা-ওয়ালা। তার পরের বার বললেন, পাহারাদার (চৌকিদার)। আর এখন কি সিঁদুর বেচতে এসেছেন? মনে রাখবেন, সিঁদুর বেচা যায় না। এটা মা-বোনেদের আত্মসম্মান। অপারেশন সিঁদুর নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। প্রত্যেক মহিলার সিঁদুরের প্রতি সম্মান রয়েছে। তাঁরা স্বামীদের থেকে সিঁদুর নেন। কিন্তু আপনি তো সকলের স্বামী নন!"

কেন হঠাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঁদুর বিষয়ে এতখানি সময় ব্যয় করলেন? বৃহস্পতিবার বাংলায় এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। আলিপুরদুয়ারে প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরে মোট ৩২ মিনিট বক্তব্য রাখেন মোদি। ১৮ মিনিটে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ, ৮ মিনিট অপরেশন 'সিঁদুর'-এর প্রসঙ্গ, বাকি ৬ মিনিট সম্ভাষণ-সহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন। সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে দলের স্লোগানও তৈরি করে দিয়েছেন, "বাংলার নির্মম সরকার, আর নেই দরকার।"

মোদি বলেন, “আজ সিঁদুর খেলার বাংলার ভূমিতে এসেছি। তাই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভারতের নতুন সংকল্প নিয়ে চর্চা হওয়া খুব স্বাভাবিক। ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওতে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল তারপর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যেও অনেক ক্ষোভ জন্মেছিল। সন্ত্রাসবাদীরা আমাদের বোনেদের সিঁদুর মুছে দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছিল। আমাদের সেনারা সিঁদুরের শক্তি দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা ওই আতঙ্কবাদীদের মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে যেটা পাকিস্তান কল্পনাও করতে পারেনি। পাকিস্তানের কাছে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো ছাড়া আর কিছু নেই। ওদের কোনও ভালো দিক নেই। দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই ওরা শুধু আতঙ্কবাদীদের পুষেছে। দেশভাগের পর থেকে ওরা শুধু ভারতের উপর হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশে যেভাবে খুন, ধর্ষণ চালিয়েছিল পাকিস্তানের সেনা সেটা কেউ ভুলবে না। এটাই ওদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। যখন সম্মুখ সমর হয় তখন পাকিস্তান নিজের অবস্থান বুঝে যায়। এজন্যই ওরা সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য নেয়। কিন্তু পহেলগাঁও হামলার পর ভারত বিশ্বকে বলে দিয়েছে ভারতে সন্ত্রাসী হামলা হলে শত্রুকে তার বড় দাম দিতে হবে। পাকিস্তান মনে রাখুক আমরা তিনবার ওদের ঘরে ঢুকিয়ে মেরেছি। আমরা শক্তির পূজা করি। আমরা মহিষাসুরমর্দিনীর পুজো করি। এটা ১৪০ কোটির ভারতবাসীর বার্তা – অপারেশন সিঁদুর এখনও শেষ হয়নি। পশ্চিমবঙ্গকে এখন হিংসা, তোষণ, দাঙ্গা, মহিলাদের উপর অত্যাচার, দুর্নীতির রাজনীতি থেকে মুক্ত করতে হবে।”

তারপরেই মমতাও আক্রমণ শানান। মনে রাখতে হবে, ৩৩টি দেশে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অবস্থান তুলে ধরতে কেন্দ্র সরকার যে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল গড়েছে, সেই দলে রয়েছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এই প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে দিয়েছেন যে, অভিষেক মাতৃভূমির জন্য বিদেশে গিয়েছেন। "যতদিন আমাদের পার্টি বেঁচে আছে, আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাব। দেশ কারও একার নয়। দেশ আমাদের সবার," বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় অভিষেক নিজে বলেছেন, "বাইরের শক্তি দেশে বিভাজন তৈরি করতে চাইলেও আমরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। আমি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের সদস্য। সংসদের দুই কক্ষ মিলিয়ে আমাদের ৪২ জন প্রতিনিধি রয়েছেন। কেন্দ্রের শাসকদলের সঙ্গে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে হয়তো মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু যখন সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্ন আসে, তখন আমরা দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়েই কাজ করি।"

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সিঁদুর শব্দ নিয়ে এত অহেতুক চর্চা কেন হচ্ছে বাংলার রাজনীতিতে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি নিশ্চিত যে শিক্ষকদের নিয়োগে দুর্নীতি ইস্যুকে ঢেকে দিতে পারে সিঁদুরচর্চাই? বিজেপিও বাংলায় এসে কেন দুর্নীতি সংক্রান্ত ইস্যুগুলি নিয়ে স্বল্প সময় ব্যয় করে সিঁদুরের বিজ্ঞাপনই করে গেল? বাংলায় নির্বাচনের আগে অপারেশন সিঁদুরই কি তবে একমাত্র ভোট-বাগানোর অস্ত্র হতে চলেছে?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।