অবৈধই ছিল প্রথমে, অথচ দামও আকাশছোঁয়া! কীভাবে বাঙালির হেঁশেলে জাঁকিয়ে বসলো ‘পোস্ত’?

Posto or Poppy Seeds in Bengal : দাম বাড়লেও স্বাদে ভাটা পড়েনি এক রত্তিও! কীভাবে বাঙালি বাড়িতে জনপ্রিয় হয়ে উঠল পোস্ত?

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
অবৈধই ছিল প্রথমে, অথচ দামও আকাশছোঁয়া! কীভাবে বাঙালির হেঁশেলে জাঁকিয়ে বসলো ‘পোস্ত’?

ভাত, ডাল সঙ্গে একটু আলু পোস্ত; ব্যাস! এতেই মাছ, মাংসের স্বাদ নিমেষে ভুলতে পারে বাঙালি। সাদা মিহি দানা, কেজি প্রতি দাম প্রায় দুই হাজার টাকা ছুঁইছুঁই। যদিও দামের জেরে আহারে ভাটা পড়ে মা এক রত্তিও। আজও নিরামিষ পদ হিসেবে পোস্তর জুড়ি মেলা ভার। আলু ছাড়াও, ঝিঙে, পটল, চিচিঙ্গা, বড়ি ইত্যাদি দিয়ে পোস্তর পদ রাঁধা হয় বাংলার হেঁশেলে। মূলত ঘটি বাড়ির রান্না হিসেবেই পরিচিত হলেও, বাঙাল বাড়িতে ঝাল ঝাল পোস্ত রাঁধা নিয়ে বেশ তরজা চলে। যদিও আকাশছোঁয়া দামের ঠেলায় বর্তমানে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে এই পদ, তবুও ভালোবাসার জোর তো দাম দিয়ে ঠেকানো যায় না, তাই আজও সপ্তাহান্তে অন্তত একবার পোস্ত খাওয়ার অভ্যাস ছাড়তে পারেন না বেশিরভাগ বাঙালিই।

শিল নোড়ায় বাটা পোস্ত, সঙ্গে অল্প কাঁচা লঙ্কা আর সর্ষের তেল, জবাব নেই এ স্বাদের। আজও এই ক্লাসিক স্বাদে মজেন অধিকাংশ। কিন্তু জানেন কি কবে থেকে প্রথম পোস্ত খাওয়ার চল শুরু হয় এ দেশে? কীভাবেই বা বাঙালির বাড়িতে অনুপ্রবেশ ঘটে সাবেকি পোস্তর?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভুল থেকেই জন্ম জনপ্রিয় মিষ্টির! যে রহস্য লুকিয়ে আছে গুলাব জামুনের নেপথ্যে

Gulab Jamun : ভুল করেই নাকি তৈরি হয়েছিল গুলাব জামুন! মিষ্টির জন্মরহস্য জানলে চমকে উঠবেন আপনিও

বাংলার চিরন্তন পদ হলেও পোস্তর উদ্ভাবন আসলে বিদেশের মাটিতে। প্রথমদিকে চীনই ছিল আফিম চাষের ঘাঁটি। তাই ব্রিটিশরা প্রাথমিকভাবে বিদেশ থেকেই আমদানি করতো পোস্ত। যদিও শোনা যায়, এ দেশে মুঘল আমলে তরকারির ঝোল গাঢ় করতে পোস্ত বাটা মেশানোর রেওয়াজ ছিল। অন্যদিকে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পরপরই তারা চিনের বিশাল অবৈধ আফিমের বাজারে হানা দেয়। আসলে সেই সময় চিন থেকে চোরাপথে বাংলাতে আফিম আসতো। লাখ লাখ টাকার আফিম চোরাপথে এদেশে নিয়ে আসা হতো ফলে এতে খরচও পড়তো বিশাল। তাছাড়া ধইরা পড়ার ভয় তো ছিলই। এই সময় ব্রিটিশরা ঠিক করল আর আমদানি নয় এবার ভারতের মাটিতে চাষ করা হবে আফিম। কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশরা আফিম উৎপাদনের জন্য বাংলায় পোস্ত চাষ করাতে শুরু করে। যদিও এতে বাংলার এতদিনের কৃষিজ ভিতে চরম আঘাত আসে। পোস্ত চাষের ফলে অন্যান্য সবজি চাষে ভাটা পড়ে। ফলে কৃষকরাও কিছুতেই রাজি হতে চান না চাষ করতে, যদিও পরাধীন ভারতীয়দের চাওয়ার ওপর কিছুই নির্ভর করতো না ব্রিটিশ শাসকদের। জুলুম করেই শুরু হয় পোস্ত চাষ।

যেহেতু পোস্ত চাষ সামগ্রিকভাবে মাটির ফলন ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় সেহেতু বাংলায় ব্রিটিশ আমলে পোস্ত চাষ হওয়ায় সবজি চাষে ব্যাপক ক্ষতি দেখা যায়। কেবলমাত্র আলু চাষের ক্ষেত্রে এ ক্ষতি পরিলক্ষিত হয় না ফলে আলুর সঙ্গে পোস্ত বাটা মিশিয়ে রান্না করার প্রবণতা সেই সময় কৃষক ঘরে লক্ষ্য করা যায়। কথিত আছে, এক কৃষকের স্ত্রী শুকনো ও অবশিষ্ট আফিম ফুলের বীজ পোস্ত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তিনি তা বেঁটে তাতে সর্ষের তেল ছড়িয়ে দেন, এরপর সেদ্ধ আলু সহযোগে পান্তা ভাত খান। এবং সেই স্বাদ থেকেই প্রথম আলু পোস্ত রাঁধার কথা মাথায় আসে তাঁর। যা পরবর্তীতে বাঙালি হেঁশেলে জাঁকিয়ে জায়গা করে নেয়।

যদিও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এদেশে আফিম চাষ ব্যান করে করে দেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে বাঙালি তথা ভারতীয়দের জিভের সঙ্গে ভালো রকম বন্ধুত্ব হয়ে গেছে পোস্তর ফলে চাহিদা বাড়তে থাকে অন্যদিকে কমতে থাকে জোগান। স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়তে থাকে। সময়ের সঙ্গে এই বাড়তি দাম এতটাই আকাশছোঁয়া হয়ে যায় যে তা প্রায় মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যায়। যদিও সাবেকি বাংলার রান্না হিসেবে প্রস্তুত তার আজও অটুট দাম দিয়ে হলেও মাঝে মাঝে পোস্ত খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেনা বাঙালি। আলু পোস্ত, পোস্ত বাটা, পোস্ত বড়া, ঝিঙে পোস্ত, পটল পোস্তর এই নিরামিষ জগতে ক্রমেই ঢুকে পড়ে চিকেন পোস্ত, পেঁয়াজ পোস্ত, রুই পোস্তের মত আমিষ পদেরাও। স্বাদ তাতে বেড়ে যায় বহুগুণ। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পোস্ত চাষে অনুমতি দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে চিঠিও দিয়েছেন বলে শোনা যায়। ফলে পরবর্তীতে বাংলায় পোস্ত চাষ হলে দাম অনেকটাই কমতে পারে বলে আশা আম জনতার।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।