জঙ্গলেই প্রথম পুজো করেন রাজা সুরথ! কেমন ছিল প্রথম দুর্গাপুজো?

Raja Surath Durga puja: পুজোর সময় এই জঙ্গলে বহু পুণ্যার্থী ছুটে আসেন। দুর্গাপুজোর চারদিন মহা সমারোহে পুজো হয়। প্রতি বছর পুজো আসে পুজো যায়, তবে তাকে কেন্দ্র করে বহু দূর দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষের জমায়েত হয়।

Mukut Tapadar
৩ মিনিট
জঙ্গলেই প্রথম পুজো করেন রাজা সুরথ! কেমন ছিল প্রথম দুর্গাপুজো?

দুর্গা, শক্তির মূর্ত প্রতীক। আমাদের বঙ্গদেশে তিনি পুত্রকন্যা নিয়ে সপরিবারে আসেন। রোগ, শোক-দুঃখ, অভাব থেকে নিষ্কৃতি পেতে মানুষ দেবীর স্মরণ করে। উপাসনা করে। তবেই জীবন সার্থক হয়। দেবী সর্বশক্তিপ্রদায়িণী।

রাজা সুরথের দুর্গাপুজো কীভাবে হয়েছিল? বাংলার বিভিন্ন স্থানীয় লোককাহিনীতে রাজা সুরথ এর নাম পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বীর একজন রাজা। কোনো লোককাহিনীতে তাঁকে আবার অত্যাচারীও বলা হয়েছে। তবে তাঁর সমন্ধে খুব একটা বিশেষ জানা যায় না।

শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থ থেকে বেশ কিছু তথ্য উঠে আসে। রাজা সুরথ যোগ্য রাজার মতোই প্রজাদের সেবা করতেন। সব সময় তাঁদের সুরক্ষা দিতেন। এমনও ধারণা আছে উপযুক্ত শাসকের মতো পুত্রের চোখে প্রজাদের দেখতেন। যাতে তাঁরা শান্তিতে বসবাস করেন ও সন্তুষ্ট থাকেন। চন্দ্রবংশের রাজা ছিলেন সুরথ রাজ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অতীতে দুর্গাপুজো ছিল ফসল কাটার উৎসব, কীভাবে বিলুপ্ত হল দুর্গাভোগ ধান?

Environmental Extinctions : দুর্গাভোগ ধান আর প্রায় নেই। কোনো ধানও আর ভাদ্রে কাটা হয় না। সবই কাটা হয় অগ্রহায়ণে। কে জানে আশ্বিন মাসের পূজায় নবপত্রিকায় ব্যবহৃত ধান এখন কোনটা?

গড় চণ্ডী ধামে মন্দির, কাঁকসা

তবে রাজধর্ম পালনে খারাপ ও বলবান লোকের অভাব থাকে না। এরা সবসময় চায় ক্ষমতার হস্তান্তর। সেই লোকেদের আসুরী গুণের জন্যে রাজাকে কষ্ট দেয়। শোনা যায় সুরথের রাজধানীর নাম ছিল কোলা। সেখান থেকে তিনি বাংলার রাঢ় অঞ্চল বলিপুরে আশ্রয় নেন। প্রজা পালন ও শিষ্ঠাচার যথাযথ করেও নিজের রাজধানী পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।‌

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃৎশিল্পীর ভুলে দেবী হয়ে গেলেন নীল, কৃষ্ণনগরের দুর্গাপুজোর ইতিহাস আজও বিস্ময় জাগায়

Durgapuja 2022: নদিয়া জেলার বহু বনেদিবাড়ি যুগ যুগ ধরে শামিল হচ্ছে এই উৎসবে। আজ মায়ের বিদায়-লগ্নে ছুঁয়ে দেখা সেইসব ঐতিহ্যকে।

রাজা সুরথের রাজধানী আক্রমণ করেন কাশ্মীর প্রদেশের রাজগণ। সুরথ রাজের সঙ্গে সেই রাজার এক ভীষণ যুদ্ধ বেঁধেছিল। এমন ঘটনায় বহু সৈন্য ও সাধারণ মানুষ মারা যান। রাজা সুরথ মহা বিক্রমের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। তবে নিজের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করেও সুরথ হেরে গিয়েছিলেন। রাজা নিজ রাজধানীতে ফিরলে দেখেন লোভী দুষ্ট মন্ত্রী সৈন্য, ধনসম্পদ, রাজ্য সুযোগ বুঝে অধিকার করে নিয়েছেন। রাজ্যের প্রজারাও রাজাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। সমস্ত ঘটনার সঙ্গে তিনি রাজ্য আর পুনরুদ্ধার করতে পারলেন না। দীর্ঘ সময় অরণ্যে কাটিয়ে আসলেন মেধস মুনির আশ্রমে। এই বিষয়ে আরেকটি কাহিনী চালু আছে। প্রচলিত অনুসারে, সুরথ কর্ণাট দেশ জয় করবার জন্যে অভিযান করেছিলেন। বিজয় লাভের উদ্দেশ্যে সেই যাত্রা ব্যর্থ হয়। যা হাসিল করতে চেয়েছিলেন সেটি ব্যর্থ হওয়ার জন্যে প্রজারাও রাজাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি রাজ্য ত্যাগ করে গভীর অরণ্যে মেধস মুনির আশ্রমে আসেন। এখানেই তিনি শক্তি সাধনা করে। জানতে চান, কেমন ভাবে হয় সেই পুজো? যেটি ছিল পৃথিবীর প্রথম দুর্গাপুজো।

অতীতে এমনই এক শাল গাছের নিচে মেধস মুনি কঠোর তপস্যা করেন

না আছে রাজা, না আছে রাজত্ব কিন্তু আজও সেই পুজোর স্থান আছে। আর আছে অরণ্যে মেধস মুনির আশ্রম। মেধস মুনির সঙ্গে দেখা হয় সুরথ ও বৈশ্যর। সমস্ত ঘটনা রাজা বলেন মুনিকে। পুরাণ অনুসারে, মেধস মুনিকে বশিষ্ঠ ঋষি বলা হয়েছে। মুনি তাঁদের আশ্রমে বসে শ্রীশ্রীচণ্ডীর বর্ণনা করেন। তিনি জানান, দেবীর আরাধনা ও ধ্যান করলে অভীষ্ট সিদ্ধ হবে। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য মাটি দিয়ে মাতৃপ্রতিমা নির্মাণ করেছিলেন। ক্রমে ক্রমে দেবীর রূপ ফুটে উঠলো। শাস্ত্র মতে পুজো করলেন রাজা। সুরথ কৃপা লাভ করলেন দেবীর। রাজা স্বরাজ্য ফিরে পেলেন দেবীর কৃপায়। মার্কণ্ডেয় পুরাণে এই ঘটনার উল্লেখ আছে। যা সমগ্র পৃথিবী ও বঙ্গদেশের প্রথম দুর্গাপুজো।

এবার জঙ্গলের পথে, দুর্গাপুর ও পানাগড়ের কাছেই কাঁকসার গড় জঙ্গল বা গড় চণ্ডীধাম। এই জঙ্গলের মধ্যেই প্রথম দুর্গাপুজো শুরু করেন সুরথ। লাল নুড়ি পথ ধরে এগোলেই পায়ে পায়ে রহস্য। দু-দিকে অরণ্যের আদিম পরিবেশ। ভাগ্যে জুটলে দর্শন মিলতে পারে দুলকি চালে কয়েকটি হাতির। তবে খুব একটা এদের আনাগোনা নেই। জঙ্গলে উইয়ের ঢিপি, শাল, পলাশ, মহুয়া দুপাশে রেখে বেশ খানিকটা এগোলেই মহর্ষি মেধসের আশ্রম ও শ্রী শ্রী গড় চণ্ডী ধাম চোখে পড়ে। কাছেই পাশ দিয়ে বয়ে গেছে অজয় নদ। আর এখানে আছে এক পুরনো দেউল ও মাতা শ্যামরুপা দেবীর মন্দির। ইতিউতি অনেক সাধু সন্ন্যাসীরা এখানে ঘুরে বেড়ান। সকলে এই জায়গায় একসঙ্গে বাস করেন। যেন গা ছমছমে এক রহস্যে ঢাকা পরিবেশ। সারা বছরই এখানে দুর্গাপুজো হয়। রাজা সুরথের আমলের এক প্রাচীর ও কিছু স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এখানে আছে। এক সময় এই মন্দিরে আসতেন দেবী চৌধুরাণী। তিনি এখানে সদলবলে এসে পুজো দিয়েছিলেন। দেবী চৌধুরাণীর নামে এখানে এক সুড়ঙ্গ আছে। পুজোর সময় এই জঙ্গলে বহু পুণ্যার্থী ছুটে আসেন। দুর্গাপুজোর চারদিন মহা সমারোহে পুজো হয়। প্রতি বছর পুজো আসে পুজো যায়, তবে তাকে কেন্দ্র করে বহু দূর দূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষের জমায়েত হয়। আজ স্মৃতিচিহ্নগুলো জঙ্গলের ভেতর সংরক্ষণের অভাবে বেশিরাগটাই হারিয়ে গিয়েছে। এই জায়গা প্রাচীন সংস্কৃতির এক অন্যতম বড় নিদর্শন।

লিখেছেন
Mukut Tapadar
Mukut Tapadar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।