জ্বরের জন্য ১৪ দিনের নিভৃতবাসে থাকতে হয় জগন্নাথকেও! জেনে নিন পৌরাণিক কোয়ারেন্টাইনের গল্প

ভারতে কোয়ারেন্টাইনের ইতিহাস অনেক অনেকদিনের পুরনো। এমনকী, পুরীর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে পর্যন্ত প্রতি বছর ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। আজ সেই ইতিহাসের গল্প করি চলুন।

Sindhu Som
৪ মিনিট
জ্বরের জন্য ১৪ দিনের নিভৃতবাসে থাকতে হয় জগন্নাথকেও! জেনে নিন পৌরাণিক কোয়ারেন্টাইনের গল্প

করোনার কথা নিশ্চয় মনে আছে। কে ভুলতে পারবে? প্রায় এক শতক পরে মানুষ ফের ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্লেগের পর সম্ভবত আমজনতার যৌথ মানস থেকে এ-জিনিস একেবারেই মুছে গিয়েছিল। আবার তাকে ফিরিয়ে আনে করোনা অতিমারী। বসন্ত, প্লেগ, ফ্লু বা করোনার মতো ছোঁয়াচে রোগের অন্যতম নিদান হল নিভৃতবাস বা কোয়ারেন্টাইন। অতিমারীর কালে ‘সেলফ-কোয়ারেন্টাইন’ বা ‘হোম আইসোলেশন’- ইত্যাদি নানাবিধ টার্ম আমরা শুনি। অতিমারীর ছোঁয়া বাঁচাতে লকডাউন হয়েছে বারবারে। উপসর্গ দেখা দিলেই হপ্তাদুয়েকের জন্য একান্তবাস। মোটামুটি মিডিয়া এবং আশেপাশের করোনায় ভুগে ওঠা মানুষদের কাছে শুনে শুনে পদ্ধতিটিও আমরা বেশ জেনে গিয়েছিলাম। কিন্তু এই কোয়ারেন্টাইনের ধারণা কি নতুন? না, ভারতে এর ইতিহাস অনেক অনেকদিনের পুরনো। এমনকী, পুরীর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে পর্যন্ত প্রতি বছর ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়। আজ সেই ইতিহাসের গল্প করি চলুন।

পুরী তখন মালবরাজ্য। জগন্নাথের স্বপ্ন পেয়ে নিমকাঠের অপেক্ষা করছিলেন রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। অবশেষে তা ভেসে এল সাগরের জলে। দারুব্রহ্ম পেয়ে রাজা সেই কাঠ দিয়ে জগন্নাথ বিগ্রহ বানানোর দিকে মন দিলেন। দিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ সব ছুতোর ও কারিগরদের ডেকে আনা হলো। কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা। দারুব্রহ্মের গায়ে ছেনি পড়েছে কি পড়েনি ছেনির মাথা যায় গুঁড়ো হয়ে। তখন জগন্নাথ নিজে ছুতোর হয়ে এলেন।

রাজাকে বললেন, 'আমার নাম অনন্ত মহারাণা। এ কাজ আমি ছাড়া কেউ করতে পারবে না, কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে। আমাকে একটা বড় ঘর দিতে হবে বিগ্রহ নির্মাণের জন্য। একুশ দিন সময় দিতে হবে। এই একুশ দিন সে ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি কাজ করব। সেসময় এই ঘরে যেন কেউ না আসে। দরজা খোলা যাবে না।' যেসব ছুতোররা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিল, তাদেরও নিরাশ করলেন না অনন্ত। রাজাকে বললেন,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোন তিন রথে চেপে মাসির বাড়ি যাবেন জগন্নাথ?

১৪ দিন ধরে জড়িবুটি দিয়ে চিকিৎসা চলে তাঁর। তারপরে জ্বর থেকে উঠে রথে চেপে তিনি যাত্রা করেন মাসির বাড়ি। এই রথযাত্রা শুরু। কথিত, আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা পালিত হয়। জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম তিন বিগ্রহ রথে চেপে যান মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুণ্ডিচার মন্দির।

'আমার আগে যাঁরা এসেছিল, তাঁদের বলুন তিনটি বিগ্রহের জন্য তিনটি রথ তৈরি করতে করতে।'

রাজা রাজি হলেন। একটি বড় ঘর তাঁকে দেওয়া হল। দারুব্রহ্ম এনে রাখা হল সেই ঘরে। ঘরে ঢুকে একুশদিনের জন্য দরজা বন্ধ করে দিলেন অনন্ত। বাইরে বসানো হল কড়া পাহারা, যাতে কেউ না ঢুকতে পারে। কাজ চলতে লাগল। এদিকে রানি গুন্ডিচার মন উচাটন। তার কৌতূহল এই গোপনীয়তায় মাত্রাছাড়া হয়ে উঠল। কিছুতেই তাকে দমানো যায় না। একবার দেখলে কি কারিগর রাগ করবেন? একবারটি দেখব! আচ্ছা বাইরে থেকে ছেনি-হাতুড়ির শব্দটুকুই শুনব না হয়! এই ভেবে চোদ্দো দিনের মাথায় আর থাকতে না পেরে সেই ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন গুণ্ডিচা। দরজায় কান পাতলেন। এ কী! ভেতরে তো আওয়াজ নেই কোনও। থাকতে না পেরে দরজা খুলে দৌড়ে ভেতরে ঢুকলেন রানি। তাঁর চোখের সামনে থেকে অনন্ত মহারাণা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। বিগ্রহ যতটুকু হয়েছিল, পড়ে থাকল সেটুকু হয়েই। সেই অর্ধসমাপ্ত তিনটি বিগ্রহ দেখে রানি উঠলেন আঁতকে। এ কেমন বিগ্রহ! জগন্নাথের অমন শ্যাম চেহারার সঙ্গে কুচকুচে কালো রঙ, গোল গোল চোখ, হাত-পা নেই– এমন এক বিগ্রহকে মেলাতে পারছিলেন না তিনি কিছুতেই। খবর শুনে রাজা ছুটে এলেন। বিগ্রহ দেখে তিনিও স্তম্ভিত। রানিকে বহু তিরস্কার করলেন শর্তভঙ্গের জন্য। তবে ব্যাপার শুনে বিচক্ষণ মন্ত্রী বলল, এ কারিগর মানুষ নয়, নিশ্চয় কোনও দেবতা। সেই রাতে জগন্নাথ ফের দেখা দিলেন ইন্দ্রদ্যুম্নকে। বললেন, 'তোমার শর্তভঙ্গেই বিগ্রহ এমন হয়েছে। এ মূর্তিতেই পুজো নেব আমি।' প্রতিষ্ঠিত হলো বলরাম সুভদ্রা ও জগন্নাথের অসমাপ্ত বিগ্রহ। কিন্তু যেহেতু রানির কৌতূহলে বিগ্রহ সম্পূর্ণ হয়নি, তাই রথের হপ্তাদুয়েক আগেই ভালো করে স্নান করিয়ে বিগ্রহ শুদ্ধি করার নিদান দিলেন জগন্নাথ।

এই স্নান করার ঘটনাকেই বলা হয় স্নানযাত্রা। উড়িষ্যাতে এটি আনসারা নামে পরিচিত। অনেকের মতে গরমের হাত থেকে ঠাকুরকে বাঁচাতেই স্নান করানো হয়ে থাকে। প্রতি বছর জৈষ্ঠ্য মাসের প্রথম পূর্ণিমাতেই জগন্নাথের স্নানযাত্রায় আয়োজন হয় মহাসমারোহে। মন্দিরের ভেতর থেকে বিগ্রহ নিয়ে আসা হয় স্নান-মণ্ডপে। তারপরে সুগন্ধি জলে স্নান করেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। যে কুয়োর জলে বিগ্রহ স্নান করানো হয়, তা বছরে খোলা হয় এই একটি বারই। জল বের করে আবার ঢেকে দেওয়া হয় কুয়োর মুখ। স্নানের সঙ্গে সঙ্গে সাজিয়ে তোলা হয় বিগ্রহকে। ১০৮ ঘড়া জলে স্নানের পর বিশ্রাম। এরপরই সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হন তিন ভাই-বোন। তখন তাঁদের পাঠানো হয় একান্তবাসে তথা কোয়ারেন্টাইনে। ভক্তরা ঠাকুরের দেখা পান না এই ক'দিন একেবারেই। যে কক্ষে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে রাখা হয় তার নাম আনসারা কক্ষ। ছাপ্পান্ন ভোগের বদলে এসময় অসুখের উপযোগী সহজপাচ্য খাবার ফল, ফলের রস, তরল পদার্থ ইত্যাদি দেওয়া হয় তাঁদের।

আয়ুর্বেদ মতে চিকিৎসাও চলে সঙ্গে সঙ্গে। রত্নজড়িত বস্ত্রের বদলে সুতির কাপড় পরানো হয়। গয়নাগাটিও খুলে রাখা হয় এই সময়। অসুখের পঞ্চম দিন বড় ওড়িয়া মঠ থেকে ফুলেরি তেল আসে, যা দিয়ে হালকা মালিশ করা হয়। এরপর রক্তচন্দন ও কস্তুরির প্রলেপ লাগানো হয়। এ সময়ও খাবার দেওয়া হয় একদমই হালকা– ‌দুধ, ফলের রস এবং কিছু আয়ুর্বেদিক ওষুধপত্র। দশম দিনে দশমুলারিষ্ঠে নিম, হলুদ, বহেড়া, লং ইত্যাদি জড়িবুটির জল দিয়ে নরম মোদক বানিয়ে খেতে দেওয়া হয়। একে জগন্নাথের ‘জ্বরলীলা’ বলে থাকেন ভক্তেরা। যেমন কোনও বাচ্চা ছেলে অতিরিক্ত জলে চান করলে জ্বরে পড়ে, তার বিশেষ খেয়াল রাখা হয়, এসময় একেবারে সেভাবেই দেখা হয় ভগবানকে। জৈষ্ঠ্য মাসের প্রথম পূর্ণিমা থেকে অমাবস্যা অবধি সেবা পেয়ে রথযাত্রার একদিন আগে মন্দিরের গর্ভগৃহে ফেরেন ভগবান। এরপর তিন ভাই-বোন রথে চেপে মাসির সঙ্গে দেখা করতে যান। নদিন মাসির বাড়িতে থেকে ফের পুরীর মন্দিরে ফিরে আসেন তাঁরা।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?