আসলে কে এই রোদ্দুর রায়, কেন এই ভূমিকায়! পরিচয় জানলে চমকে উঠতে হবে

আগেও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর করা বহু বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। তবু কেন্দ্র থেকে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানের সঙ্গে এতটুকু আপস করেননি তিনি। তিনি রোদ্দুর রায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর পরিচিতি রোদ্দুর রায় হলেও তাঁর আসল নাম অনির্বাণ রায়।

কীভাবে অনির্বাণ রায় থেকে রোদ্দুর রায়ের উত্থান?
অনির্বাণ রায় ওরফে রোদ্দুর রায়ের জন্ম কলকাতায়। এরপর রামনগর কলেজ থেকে স্নাতক হন অনির্বাণ। কিন্তু এই অনির্বাণই কী করে হয়ে উঠলেন রোদ্দুর রায়! রোদ্দুর রায়ের নিজের কথায়, "রোদ্দুর রায় আসলে একটা চরিত্র। আমি সেই ভূমিকায় অভিনয় করি। সেই লোকটা চূড়ান্ত বিভ্রান্ত এবং হতাশাগ্রস্ত।" প্রথম জীবনে রোদ্দুর রায় কিছুদিন ডিজে হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বরাবরই গানবাজনা, লেখালিখি, গিটার বাজানোয় আগ্রহ ছিল তাঁর। এছাড়াও রোদ্দুর রায়ের বিশেষ আগ্রহের বিষয় মনোবিজ্ঞান।

অনির্বাণ রায় যখন থেকে রোদ্দুর রায় হয়ে উঠতে শুরু করলেন, তখনও তাঁর জনপ্রিয়তা এতটা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের গানের 'অচলায়তন' ভাঙার মধ্য দিয়েই প্রথম আবির্ভাব ঘটে রোদ্দুর রায়ের।

আরও পড়ুন: বিরোধিতা মানেই মামলা, গ্রেপ্তার! রোদ্দুর রায় প্রথম নন, তৃণমূল আমলে বারবার ঘটেছে এমন

রবীন্দ্রনাথ নিয়ে রোদ্দুর রায়ের ভাবনা
রোদ্দুর রায়ের অন্যতম ভাইরাল রবীন্দ্রসংগীত 'চাঁদ উঠেছিল গগনে'-র আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভে এসে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেন রোদ্দুর রায়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রোদ্দুর রায়ের স্পষ্ট বক্তব্য, "আমাদের কাছে টেগোর শুধুই বিজনেস অবজেক্ট। কখনও শান্তিনিকেতন, কখনও কিছু মুষ্টিমেয় লোকের সম্পদ। আমরা রবীন্দ্রনাথকে টেনে নামিয়েছি। আমরা রবীন্দ্রনাথের কিস্যু বুঝিনি।"

রবীন্দ্রনাথের সুরে বিভিন্ন গান নিয়ে রোদ্দুরের যে এক্সপেরিমেন্ট, তা ভালোভাবে দেখেন না বহু শ্রোতাই। কিন্তু অডিয়েন্সের পরোয়া করেন না রোদ্দুর রায়। বরং বিশ্বাস করেন শিল্পীর স্বাধীনতায়। শিল্পী কোন শিল্পের জন্ম দেবেন বা কোন শৈলিতে গান গাইবেন, সেখানে রোদ্দুর রায়ের কাছে দর্শকের কোনও ভূমিকা নেই।

সেই একই জায়গা থেকে আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে রোদ্দুর রায় ভাবছেন রবীন্দ্রনাথ নিয়ে। সেই ভাবনার নির্মাণ ও বিনির্মাণ ঘটছে তাঁর গান, লেখা ও কথার মধ্য দিয়ে।

রোদ্দুর রায়ের বই
মনোবিজ্ঞানের ওপরে রোদ্দুর রায় লিখেছেন একটি  'অ্যান্ড স্টেলা টার্নস এ মম' নামক একটি বই। বইটি সমষ্টি থেকে ব্যক্তিমনের ভাবনাচিন্তা নিয়ে চর্চা করার কথা বলে। সমাজে প্রচলিত নারী ও পুরুষের পরস্পরের প্রতি ধারণার মূলে আঘাত করে। আমাদের সমাজের অভ্যস্ত পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। 'আমিত্ব'-র অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে উত্তরাধুনিক ভাবনা ও অন্যরকম এক কালচারের ধারণাকে উসকে দেয় এই বই। 'স্টেলা' যেখানে সমাজের বাঁধা গতের বাইরে গিয়ে নারীত্বের উদযাপন করে।

রোদ্দুর রায়ের 'মোক্সা তত্ত্ব'
নবারুণ ভট্টাচার্য এবং জীবনানন্দ দাশের ভক্ত রোদ্দুর রায় সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের এই ভাবনাচিন্তা কে 'মোক্সাবাদ' হিসেবে প্রচার করে থাকেন। সংস্কৃত 'মোক্ষ' শব্দটি থেকেই 'মোক্সা' শব্দটির আবির্ভাব। এর অর্থ আত্মার মুক্তি। এই প্রসঙ্গে রোদ্দুর রায় বলেন, "এখানে মোক্সা বলতে মানবিক আত্মার কথা বলা হয়েছে। মোক্সা হোক স্বাধীনতা। নাগরিক মানুষের জন্য স্বাধীনতা প্রেম ও শান্তি।"

রোদ্দুর রায়ের জীবনে বিতর্ক
রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান 'সেদিন দুজনে'-র প্যারডি গেয়ে প্রথম বিতর্ক তৈরি করেন রোদ্দুর রায়। রোদ্দুর বিতর্ক

২০২০: দোলের সময় 'সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে' গানটির প্যারডির জন্য প্রথম বিতর্কে জড়ান রোদ্দুর রায়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত উৎসব চলাকালীন কয়েকজন তরুণী তাঁর ওই লাইনটি পিঠে লিখে প্রদর্শন করলে বিতর্কের আগুনে ঘি পড়ে। বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠলেও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে নিজের পরীক্ষানিরীক্ষায় অনড় থেকেছেন রোদ্দুর রায়।

আবার সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে মন্তব্য করে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছেন। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'কবিতাবিতান' বইটির জন্য বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার দেয় পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাডেমি। এই পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে ওঠা প্রতিবাদের পাশাপাশি রোদ্দুর রায় নিজের পদ্ধতিতে ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে এই পুরস্কার পাওয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন। এই পোস্টের শব্দচয়ন নিয়েই সমালোচনা শুরু হয়। সেই বিতর্ক আরও দানা বাঁধে যখন, গায়ক কেকে-র মৃত্যুর পর রূপঙ্কর বাগচীকে আক্রমণ করে করা এক লাইভে মুখ্যমন্ত্রী-সহ বেশ কিছু নেতা-মন্ত্রীকে নিয়ে বেশ কিছু শব্দ প্রয়োগ করেন রোদ্দুর, যা 'অশ্লীল' বলে বিবেচিত হবে।

কিন্তু নিজের বক্তব্যের শব্দপ্রয়োগ নিয়ে বরাবরই নির্ভীক রোদ্দুর রায়। শব্দের প্রচলিত ব্যবহারকে সচেতনভাবেই ভাঙেন তিনি। অলটারনেটিভ ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানকে দাঁড় করাতে চান রোদ্দুর রায়। তাঁর ভাবনায় অ্যানার্কিস্ট চেতনার মিশেল রয়েছে কি না জানতে চাইলে রোদ্দুর রায় বলেন, "অ্যানার্কির সঙ্গে আমার কিছু দর্শন মেলে। আমি প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছি না। আমি চেষ্টা করছি পৃথিবীতে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার। আমার বিশ্বাস এই স্বাধীনতাটুকু শিল্পী হিসেবে আমার প্রাপ্য।"

কিন্তু হায়, আমরা কতটুকু শিল্পের স্বাধীনতার পরিসর তৈরি করতে পেরেছি? রাষ্ট্রের বাধার সামনেও রোদ্দুর রায় কিন্তু নিজের ভাবনায় অবিচল। "আমি আমার ভাবনা চিন্তা অব্যাহত রাখব। আমাকে জেলে দিক আর ফাঁসি দিক আমি নাগরিক অধিকারের কথা বলে যাব।" এই দুঃসময়ে দাঁড়িয়ে এই আপ্তবাক্য নতুন করে আশা জোগায়।

More Articles

;