বিশু পাগলের চরিত্রে কাজী নজরুল! যে ‘রক্তকরবী’-র খোঁজ জানেন না অনেকেই

Kazi Nazrul Islam in Raktakarabi : নন্দিনী যদিও বা হলো, এবার খোঁজ চলল বিশু পাগলের। শিশিরকুমারের একমাত্র পছন্দের নাম ছিল- কাজী নজরুল ইসলাম।

Arpan Das
৩ মিনিট
বিশু পাগলের চরিত্রে কাজী নজরুল! যে ‘রক্তকরবী’-র খোঁজ জানেন না অনেকেই

বাংলা নাটকের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ যেমন এক অমূল্য সম্পদ, তেমনই আকর্ষণীয় এই নাটক প্রযোজনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্প। সাল ১৯৫৪। শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় ও ‘বহুরূপী’-র প্রযোজনায় ‘রক্তকরবী’-র অভিনয় কালজয়ী মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু তার প্রায় ত্রিশ বছর আগে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়িকে ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এবং সেই নাটকে বিশু পাগলের চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল খোদ কাজী নজরুল ইসলামের।

‘রক্তকরবী’ নাটকটি ১৯২৪ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ওই বছরই শিশির ভাদুড়ি ‘সীতা’ নাটকের অভিনয় করে বাংলার নাট্যপ্রেমী দর্শককে মুগ্ধ করে দেন। রবীন্দ্রনাথ ‘সীতা’-য় শিশিরকুমারের অভিনয় দেখে একেবারে মুগ্ধ! অভিনয় ও মঞ্চকলার উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন রবিঠাকুর। শিশিরকুমার তো নিজেও ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। ফলে আগে থেকেই দু'জনের যোগাযোগ ছিল। ‘সীতা’-র সাফল্যের পর রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের বেশ কিছু নাটকের প্রযোজনার দায়িত্ব শিশিরকুমারের হাতেই দেন। এই নাটকগুলির মধ্যেই অন্যতম ছিল ‘রক্তকরবী’। ১৯২৪-এর সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ আমেরিকা যাওয়ার আগেই তিনি শিশিরকুমারকে নাটকটি পড়ে শোনান। তিনি বিদেশ থেকে ফেরার আগেই এই নাটকের প্রযোজনা যাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে থাকে খুব চেয়েছিলেন রবি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নজরুলের নিজস্ব গ্রামোফোন বেজে চলে আজও...

Kazi Nazrul Islam Songs: হারুবাবুকে কানন দেবী চিঠি লিখছেন, "…যে কাজ করার কথা ছিল সরকারের অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে কাজ আপনি করেছেন।"

তবে সব ইচ্ছারা আলো দেখে না! দু'পক্ষের যথেষ্ট আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সে নাটক শেষ পর্যন্ত অভিনয় হয়নি। তার অনেক ক'টা কারণ ছিল অবশ্য। সেই সব কারণের মধ্যে কয়েকটা নিয়ে কথা বলা যাক। ‘রক্তকরবী’ সম্বন্ধে একটি প্রচলিত ধারণা এখনও আছে যে এ নাটক ‘দুর্বোধ্য’। ‘রক্তকরবী’ নয়— শক্তকরবী। ফলে ওই সময়ের পাবলিক থিয়েটারের আমজনতা রবীন্দ্রনাথের ‘দুর্বোধ্য’ নাটক কতটা বুঝতে পারবে, সেটা একটা প্রশ্ন তো বটেই। সে নাহয় দর্শকদের বোধের উপর আস্থা রাখাও গেল। রয়েছে কাস্টিং! কারা কোন চরিত্রে অভিনয় করবেন? নন্দিনীর মতো চরিত্রে অভিনয় কে করবেন? পুরনো দিনের অভিনয় পদ্ধতি দিয়ে যে এই চরিত্রটিকে ধরা যাবে না, তা শিশিরকুমার ঠিকই বুঝেছিলেন। তাঁর পছন্দ ছিল কঙ্কাবতী সাহুকে। কঙ্কাবতী ছিলেন বাংলা থিয়েটারের প্রথম গ্র্যাজুয়েট অভিনেত্রী। কিন্তু তিনিও তখন অন্য থিয়েটার দলের চুক্তি নিয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জেরবার। শিশিরকুমার প্রায় বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। একটা সময় তো এমনও ঠিক হলো যে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করবেন শিশিরকুমারের ভাই বিশ্বনাথ ভাদুড়ি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নাকি তাতে মত দিয়েছিলেন।

নন্দিনী যদিও বা হলো, এবার খোঁজ চলল বিশু পাগলের। শিশিরকুমারের একমাত্র পছন্দের নাম ছিল- কাজী নজরুল ইসলাম। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙ্গার গান’ দিয়ে নজরুল তখন বাংলা কবিতার বন্ধ দরজার তালাগুলো ভাঙতে শুরু করে দিয়েছেন। নজরুল গান জানেন, আবৃত্তি জানেন, তার সঙ্গে আছে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ ইমেজ। শিশিরকুমারের নিজের ভাষায়,

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যৌন জটিলতাও হয়ে উঠেছিল স্নিগ্ধ! নজরুলের যে গল্পের হদিশ আজও জানেন না পাঠক

Kazi Nazrul Islam Stories: এই গল্পগুলির অদ্ভুত অভিব্যক্তি কিংবা জীবন সংকটে যৌন উৎকণ্ঠা এক বিশেষ মাত্রা নিয়ে আসে।

“কাজী তখন আমার খুব ন্যাওটা ছিল। বয়সটা আর একটু বেশি হলে ভালো হত, তবে শেখালে ও পারত, ওর মধ্যে অভিনেতা ছিল।”

ঠিকই ভেবেছিলেন তিনি। গান দিয়ে যক্ষপুরীর দ্বার খুলিয়ে ‘দুখজাগানিয়া’-র ঘুম ভাঙানোর মতো উদাত্ত মাটির সুর মেশানো গানের কণ্ঠ আর কারই বা ছিল? প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে নজরুল, কাজ করেছেন রুটির দোকানে, প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধে গেছেন। আবার ফিরে এসে বাংলা কবিতায়-সমাজে-ধর্মে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। এ মানুষ তো বিশু পাগলের মতোই জেল ভেঙে বেরোবে। বিশু ছিল রঞ্জনের অন্য পিঠ, যে পিঠে আলো পড়ে না। একটু ভেবে দেখলেই মনে হয় নজরুলও ঠিক তাই, হাজার রকম গানের ডালি নিয়েও রবির আলোর ছায়ায় তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। শুধু প্রতিভা বা জনপ্রিয়তার বিষয় নয়, ভিতর থেকে উঠে আসা একটা প্রবল বিশ্বাসও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। নজরুল নিজেও তো বলেছেন, “মাথার উপর জ্বলিছেন রবি”। শিশিরকুমার হয়তো তাঁকে অভিনয়টুকু শিখিয়ে দিতেন, কিন্ত ভিতরের বিশু পাগলটা তো তাঁর নিজের। বাংলা থিয়েটারের দুর্ভাগ্য যে ‘রক্তকরবী’-তে শুধু নজরুলের অভিনয় প্রতিভা নয়, এই জীবনদর্শনের স্বাদ পাওয়া থেকে পর্যন্ত সে বঞ্চিত হলো।

তথ্যঋণ- ‘বাংলা থিয়েটার ও নাট্যাচার্য শিশিরকুমার’- অনিল মুখোপাধ্যায় (সম্পাদনা- মলয় রক্ষিত)

লিখেছেন
Arpan Das
Arpan Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।