"এই ছেলেকে দিয়ে আমি গান গাওয়াব," বাথরুমে কিশোরের গলা শুনে বলেছিলেন শচীন কত্তা!

Kishore Kumar: ইন্ডাস্ট্রিতে একুশ বছর কেটে যাবার পরেও কিশোরকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিলেন না সুরকাররা।

Kaushik Majumder
৪ মিনিট
"এই ছেলেকে দিয়ে আমি গান গাওয়াব," বাথরুমে কিশোরের গলা শুনে বলেছিলেন শচীন কত্তা!

ষাটের দশকের শেষের দিকে হতাশ, ডিপ্রেসড কিশোর কুমার ঠিক করলেন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে গাঁয়ের বাড়ি খান্ডোয়া চলে যাবেন। বম্বেতে তাঁর জন্য আর কোনও ভবিষ্যৎ নেই। খুব একটা ভুল কথা না। আসলে একই সঙ্গে সেই সময় স্ট্রাগল করছিলেন দুই কিশোর কুমার। একজন কমেডিয়ান, অন্যজন গান করেন। তাও হালকা চালের, মজার গান। গভীর কিছু না। সেরা গানগুলো জোটে মহম্মদ রফির ভাগ্যে। অভিনয়েও তিনি নায়ক না। বড়জোর সেকেন্ড লিড। ইন্ডাস্ট্রিতে একুশ বছর কেটে যাবার পরেও কিশোরকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিলেন না সুরকাররা। অন্যদিকে কমেডিয়ান কিশোর ক্রমাগত গ্রাস করে নিচ্ছিলেন গায়ক কিশোরকে।

আসলে ঝামেলাটা পাকিয়েছিলেন আভাস কুমার গাঙ্গুলি নিজেই। ১৯৪৮ সালে দেব আনন্দের ‘জিদ্দি’ ছবিতে কিশোর কুমার নামে “মরনে কি দুয়ায়েঁ কিঁউ মাঙ্গু” গেয়ে আত্মপ্রকাশ। শুনে দেখবেন। সায়গলের অক্ষম অনুকরণ মনে হবে। আর করতেনও তাই। তখন প্লে-ব্যাকের আকাশে গনগন করছেন মুকেশ। তাঁর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন তালাত মাহমুদ, মহম্মদ রফি। একের পর এক 'সিরিয়াস' ক্লাসিকাল গানে ভরে উঠছে চলচ্চিত্র। সেখানে একেবারে নওসিখিয়া, তালিমহীন কিশোরকণ্ঠ নেহাত ফিকে। ছোট থেকেই প্র্যাঙ্কস্টার। টিকে থাকতে তাই বেছে নিলেন কমেডিয়ানের চরিত্র। ফল হলো শাঁখের করাতের মতো। একদিকে অভিনেতা কিশোরকুমার একের পর এক ছবি সই করতে লাগলেন, অন্যদিকে গায়ক কিশোরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করলেন সুরকাররা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গান প্রতি ১৫ টাকা! গানের চাবুকে বলিউড শাসন করেছিলেন সামসেদ বেগম

Shamshad Begum: বাবা গোঁড়া মুসলমান। বললেন, সব ঠিক আছে, কিন্তু মেয়ে গান গাইবে বোরখা পরে। মেয়ের কোনও ছবিও তোলা যাবে না। তাতেই রাজি সে।

ব্যাতিক্রম একজন। শচীন দেব বর্মন। একদিন অশোককুমারের বাড়ি দেখা করতে গিয়ে কিশোরের বাথরুম সং শুনে পছন্দ হয়ে যায় তাঁর। অশোককে বলেন, “এই ছেলেকে দিয়ে আমি গান গাওয়াব”। শুধু মুখের কথা না। পঞ্চাশের দশকে শচীন কত্তা 'বাজি' ছবিতে দেব আনন্দের গলায় গাওয়ালেন “মেরে লবোঁ মে ছিপে”। মোটামুটি হিট। পরের বছরই 'মুনিমজি'-তে আবার দেব আনন্দের গলায় “জীবন কে সফর মে রাহি”। সিনেমার এক ডজন গানের মধ্যে একটাই মেগা হিট। গায়ক কিশোর ভাবলেন, ভাগ্য প্রসন্ন হল। পরের বছর আবার দেব আনন্দ। এবার সেন্টিমেন্টাল গান, “দুখি মন মেরে”। সিনেমার নাম 'মিস্টার ফান্টুস'। ততদিনে সায়গলের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসেছেন কিশোর। তবুও নায়ক কিশোরের ধারেকাছে নেই গায়ক সত্ত্বা। নবকেতনের 'নও দো গ্যারা' তে “হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে”, 'পেয়িং গেস্ট'-এ আশার সঙ্গে “ছোড় দো আঁচল” কিংবা সেই বছরের সেরা হিট “মানা জনাব নে পুকারা নেহি” গাইবার পর যখন ভাবছেন এবার পুরোপুরি গানে মন দেবেন, 'কালা পানি'র মতো মেগা প্রজেক্টে শচীন কত্তা তাঁকে বাদ দিয়ে সব গান গাওয়ালেন রফিকে দিয়ে। কত্তার থেকে সেই দশকে বলার মতো সোলো একটাই পেয়েছিলেন কিশোর। “এক লড়কি ভিগি ভাগি সি”- তাও নিজের লিপে!

অবশেষে বিরক্ত কিশোর নিজেই সুর দিয়ে অভিনয় শুরু করেন। ৬১-তে রিলিজ করা 'ঝুমরু'তে “ঠান্ডি হাওয়া ইয়ে চাঁদ হ্যায় সুহানি”-তে তাঁর গলা শুনে চমকে গেলেন শ্রোতারা। এ কোন কিশোর? এত আবেগ তাঁর গলায়! আগে তো কেউ এর খোঁজ রাখেনি! একের পর এক বেদনাভরা গানে নিজেকে নিংড়ে দিতে লাগলেন কিশোরকুমার। হাহাকারের মতো বাজতে লাগল “কোই লওটা দে মেরে”, “যিন রাতোঁকি ভোর নেহি” আর কাল্ট হয়ে যাওয়া “আ চলকে তুঝে”। নিজেকে সিরিয়াস প্রমাণ করতে জান লাগিয়ে দিলেন। সাত বছর পরে আবার শচীনকর্তা দেব আনন্দের গলায় ফিরিয়ে আনলেন তাঁকে। কিন্তু সেই স্টিরিওটাইপ গানে ,“ইয়ে দিল না হোতা বেচারা”। বরং ছেলে রাহুল 'পড়োসন'- ছবিতে “ক্যাহনা হ্যায় ক্যাহনা হ্যায়”-র মতো গান দিলেন তাঁকে। কিশোর বুঝলেন তাঁকে সেকেন্ড বেস্ট হয়েই থাকতে হবে। এক নম্বর হওয়া আর এই জীবনে হবে না। তখনই বম্বে ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা। নেহাত দাদা অশোককুমার কোনওমতে ঠেকালেন। ভাগ্যিস! কারণ ঠিক এই সময় দুটো ঘটনা ঘটল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জোর করে ঠোঁটে চুমু খান নায়ক, বাধ্য হতে হয় নগ্ন চরিত্রে, কানন দেবী এক অজানা 'বনফুল'

Kanan Debi: অভিভাবকহীন নিচু ঘরের মেয়ে হওয়ায় তাঁকে টাকা-পয়সার লোভ দেখিয়ে নগ্ন দৃশ্যে বাধ্য করা হয়। এ রকম একটি ছবি হলো ‘বাসবদত্তা’।

'আরাধনা' নামে এই ছবিতে রাজেশ খান্না নামে এক নতুন মুখকে সুযোগ দেওয়া হলো আর সেই ছবির সুরকার হিসেবে কাজ করতে করতে হঠাৎ শচীনদেব শয্যাশায়ী হয়ে পড়ায় বাকি কাজ চালানোর ভার পেলেন ছেলে রাহুল। আর ডি। বাবার এক রকম অনিচ্ছাতেই কিশোরকে দিয়ে গাওয়ালেন “মেরে সপনো কি রানি” আর “রূপ তেরা মস্তানা”। গ্রামাফোন, রেডিও থেকে শুরু করে সবার মুখে মুখে ফিরতে লাগল গান দুটো। চমক কাটতে না কাটতে রাহুল ভয়ানক এক কাজ করলেন যা তাঁর বাবা ভাবতেও পারতেন না। 'প্যায়ার কা মৌসম' ছবিতে একই গান “তুম বিন যাউ কাহাঁ” গাওয়ালেন দুইজনকে দিয়েই। রফি আর কিশোর। কিশোরেরটা হিট করল। রফি বুঝলেন তাঁর সিংহাসন টলছে। 'আরাধনা' সাফল্য পেতেই দেব আনন্দের পর আর এক নায়কের গলায় স্থায়ী হয়ে গেলেন কিশোর। এবার পাকাপাকি। 'কাটি পতং'-এর “ইয়ে জো মোহাব্বত হ্যায়” কিংবা পিকনিকের অপরিহার্য গান “ইয়ে শাম মস্তানি”, 'সফর'-এর “জিন্দেগি কা সফর” অথবা “কুছ তো লোগ কহেঙ্গে”, “চিঙ্গারি কোই ভড়কে”- কিশোর-রাজেশ জুটি হিন্দি ছবির এখনও পর্যন্ত সেরা ডুও হয়ে রয়েছে।

শচীন কত্তা অবশ্য পরে ভুল বুঝে 'অভিমান' এর অমিতাভের কণ্ঠ দিলেন কিশোরকে। কিশোর হৃদয় খুঁড়ে গাইলেন “তেরে মেরে মিলন কি ইয়ে রেয়না”। কত্তার সুর করা 'মিলি' ছবির শেষ গানটাও তাঁরই গাওয়া। কত্তা হাসপাতালে শুয়ে শেষ মুহূর্ত গুনছেন। কিশোর স্টুডিওতে গাইছেন “বড়ি সুনি সুনি হ্যায়”- যে ক'টা উদাস গানের জন্য কিশোর বিখ্যাত, বোধকরি তাদের সেরাটা। শচীন কত্তার জন্য এত সুন্দর এপিটাফ আর কেউ লিখতে পারতেন না। কেউ না।

লিখেছেন
Kaushik Majumder
Kaushik Majumder
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।