জাভেদ আখতারের আমন্ত্রণ বাতিল: উদারপন্থীদের নীরবতায় মৌলবাদের উত্থান

Koushik Sen: আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ তত্ত্বে বিশ্বাস করি। যেমন ‘ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার’, ‘তোমার ধর্ম তুমি পালন করো’ এটা করতে গিয়েই সর্বনাশ হয়ে গেছে।

Kaushik Sen
৩ মিনিট
জাভেদ আখতারের আমন্ত্রণ বাতিল: উদারপন্থীদের নীরবতায় মৌলবাদের উত্থান

জাভেদ আখতারের অনুষ্ঠান বাতিল করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার হিন্দু মতবাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তাদের তাত্বিক মাথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘকে বাড়তি সুবিধা করে দিল। এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটা ব্যর্থতা। জাভেদ আখতারের মতো একজন নাস্তিক এবং বুদ্ধিজীবী, প্রথিতযশা কবি, যিনি সাংঘাতিকভাবে হিন্দু মৌলবাদের বিরুদ্ধেও কথা বলেন। তাঁর মতো একজন মানুষকে শুধুমাত্র কিছু কট্টর মুসলিম সংগঠন ফতোয়া জারি করল আর সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য সরকারও মেনে নিল, তা একেবারেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। এর ফল হবে সুদূরপ্রসারী।

আমার বিশ্বাস এমন বহু মানুষ আছেন, যারা এটার নিন্দা করছেন। এই বিষয়টা নিয়ে গভীরে গিয়ে আলোচনা করার, ভাবার প্রয়োজন আছে। ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে শ্রাবণ মাসের সংখ্যায় ‘পরিচয়’ পত্রিকায় সমর সেন লিখেছিলেন, ‘উদারপন্থীদের মধ্যে সমস্যা আছে।’ ইতিহাস ঘাঁটলেও দেখা যাবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই ফ্যাসিবাদকে চিনতেও কিন্তু উদারপন্থীদের অনেকটা দেরি হয়েছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুক্তমনা বলেই বাতিল করতে হলো জাভেদ আখতারের অনুষ্ঠান?

Javed Akhtar: জাভেদ আখতার দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে জানিয়ে আসছেন যে তিনি ধর্মাচরণে বিশ্বাসী নন, তিনি নাস্তিক এবং মানবতাবাদী। তাঁর এই অবস্থানই কট্টর সংগঠনগুলির চোখে ‘আল্লা-বিরোধী’ বলে প্রতিপন্ন হয়েছে।

কিছুদিন আগে পর্যন্তও বাঙালি নিজেদের কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিতে শ্লাঘা বোধ করত— আমরা যে বামপন্থী, বামমনস্ক, আমাদের বাংলাতে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে, তার মধ্যে বামনীতি আছে এটা জাহির করতে বাঙালি ভালোবাসে। যদিও সেখান থেকে বাঙালি অনেকটাই সরে এসেছে। কারণ বাঙালি সমাজে সিপিএম চর্চা হয়েছে। ৩৪ বছর বাংলায় সিপিএম ক্ষমতায় ছিল বলে, বাঙালি সমাজে সিপিএম ঢুকে গেছে। কিন্তু সত্যিকারের কমিনিস্ট হওয়া খুব কঠিন কাজ।

১৯৭৭-এর মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র বলেছিলেন, “আমি ভদ্রলোক নই, আমি কমিউনিস্ট।” তখন তাঁর কথায় খুব হৈচৈ হয়েছিল। অনেকেই তাঁর কথায় ভুল বুঝেছিলেন। কিন্তু তিনি যেটা বলতে চেয়েছিলেন, ভদ্রলোকের সঙ্গে কমিউনিস্টের একটা পার্থক্য আছে। কমিউনিস্ট হচ্ছে সে, যার শৌখিন ভদ্রলোকিপনাটা আসে না। আমরা ইউরোপেও দেখেছি উদারপন্থীরা সেভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধাচারণ করতে পারেনি, বলা ভালো তাঁরা চিনতেই পারেনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সংখ্যার রাজনীতিতে জাভেদ আখতাররাই চিরশত্রু

মুসলিম মৌলবাদকে যাকে এভাবে তোল্লাই দিতে হয়, হিন্দু মৌলবাদের বিরোধিতা করার এক্তিয়ার কি তার আছে? যে মোল্লাতন্ত্রের হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় না, হিন্দুত্ববাদের বিপদ থেকে সে সেকুলার-নাস্তিককে বাঁচাতে বাড়তি দায়-দরদ দেখাবে?

উদারপন্থী তত্ত্ব আসলে গরিবদের বিরুদ্ধেই যায়। এটা ক্ষমতাবানদেরই ক্ষমতাপুক্ত করে। আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিরা ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ তত্ত্বে বিশ্বাস করি। যেমন ‘ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার’, ‘তোমার ধর্ম তুমি পালন করো’ এটা করতে গিয়েই সর্বনাশ হয়ে গেছে। এবং সরকারও ঠিক করে নিয়েছে সে সবাইকে তোল্লাই দেবে। চাকরির যোগান, শিশুর চিকিৎসা প্রদান না করতে পারলেও ধর্ম পালনের ব্যবস্থা করে দিয়ে সরকার বলতে চায় ‘আমি তোমার পাশে আছি’। চিকিৎসার জন্য একটা হাসপাতাল থেকে আরেকটা হাসপাতালে ছুটতে হলেও ছটপুজো তো করতে দিচ্ছি, রাস্তা ব্লক করে মহরম বা প্যান্ডেল বেঁধে পুজো, এই প্রশ্রয়টা রাষ্ট্র দিতে পারছে আমাদের মতো উদারপন্থীদের জন্যই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, ধর্মতে হাত দিও না। ফলে আমাদের দেশে যারা কট্টরপন্থী। সেটা হিন্দু মৌলবাদী হোক বা মুসলিম মৌলবাদী, এই সুযোগটা পুরো উদ্যমে নিচ্ছে। তাই এই পরিস্থিতির জন্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করতে পারছি না। এটা আমরা যারা নিজেদের উদারপন্থী বলি, তাদেরই সমস্যা।

গরিব মানুষের কাছে ধর্ম একটা বড় আশ্রয়, সরকার চায় তারা ওটা নিয়েই থাক। আর আমলাদের ছেলে-মেয়েরা বিদেশ যাক। গরিব মানুষের চাকরির দরকার নেই, তারা পুজো করবে আর কোনো প্রশ্ন করবে না। এই যে একটা ফাঁদ পাতা হয়েছে, এটার জন্য শুধু রাষ্ট্র দায়ী নয়। ১৮৩১ সালে ইন্ডিয়া গেজেটে একটা রিপোর্ট বের হয় সে যুগের অতিবিপ্লবী সংস্কারকদের নিয়ে। পরে এদেরই নাম দেওয়া হয়েছিল ইয়ং বেঙ্গল। যারা হেনরি ডিরোজিও, হিন্দু কলেজের ছাত্রছাত্রী ছিল। রোসিঙ্কা চৌধুরী-এর লেখা India's First Radicals: Young Bengal and the British Empire বইয়ে তাঁদের নিয়ে লেখা হয়েছে।

উনিশ শতকের প্রথমের দিকে এই ইয়ং বেঙ্গলদের দেখা পাওয়া গিয়েছিল। তার আগে পিপল অফ ইন্ডিয়া কনসেপ্টটা ছিল না। অর্থাৎ সাধারণ গরিব মানুষও যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তারাও যে মানুষ, তাদের আইন, জীবন-জীবিকা, ভাবনা-চিন্তা, সমস্ত কিছুর অধিকারের কথা ইয়ং বেঙ্গল র‍্যাডিক্যালরাই প্রথম তুলে ধরেছিল। সেখান থেকেই ভারতে উদারপন্থার শুরু।

আধুনিক ভারত তৈরিতে ইয়ং বেঙ্গলের বড় অবদান ছিল এবং তার মধ্যে বড় পদক্ষেপ ছিল ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সেই কারণেই ওটা একটা বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড ছিল। কিন্তু আমরা যেন পিছিয়ে গেলাম। যখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠ এই ধারণাটাই ছিল না। এই বাংলাতেই এত বড় আন্দোলন হয়েছে, ধর্মের বিরুদ্ধে স্পষ্ট করে কথা বলা, জাতপাতের বিরুদ্ধে কথা বলা— এগুলি এরাই করেছে। তাই জাভেদ আখতারের অনুষ্ঠান বাতিল প্রসঙ্গে একটু গভীরভাবে আলোচনা হওয়া দরকার। রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার তো আমাদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছেই, কিন্তু আমরাও আমাদের দায়িত্বটা সঠিভাবে পালন করছি না। তাই বর্তমানে ইয়ং বেঙ্গলর মতো একটা আন্দোলনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

লিখেছেন
Kaushik Sen
Kaushik Sen
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।