দুধের শিশুর শরীরে বিষ হয়ে ঢুকছে দুধ! জানেন কী বিপদ ডেকে আনছেন

Lactose Intolerance: দুধ যথেষ্ট কম মাত্রায় খাওয়া প্রয়োজন, তবেই তা পুষ্টি বৃদ্ধি করে।

Ahana Das
৪ মিনিট
দুধের শিশুর শরীরে বিষ হয়ে ঢুকছে দুধ! জানেন কী বিপদ ডেকে আনছেন

"দুধ না খেলে, হবে না ভালো ছেলে," চন্দ্রবিন্দুর গানের এই পংক্তি ছিল সকলের জানা। ভারতীয় পরিবারে ঘি, বাটার, পনির, দই ও ক্রিম খাওয়া হবে না- এমনটা হতেই পারে না। আমরা সকলেই দৈনন্দিক জীবনে এইসব খাদ্যদ্রব্য আমাদের খাবারের উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়ে থাকি। আর এই সমস্ত খাদ্যদ্রব্যই দুগ্ধশিল্প, অর্থাৎ ডেয়ারি ইন্ডাস্ট্রির মধ‍্যে পড়ে। পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই কম-বেশি দুগ্ধজাত দ্রব্য পাওয়া যায়। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন যে, দুগ্ধজাত দ্রব্য আমাদের দেশেই কেন এত প্রচলিত। এটি কি আদতেই আমাদের জন্য উপকারী, না কি শ্বেত বিপ্লবের ফলাফল, যার প্রভাব এখনও শেষ হয়নি?

ভারতের কৃষিব্যবস্থায় দুগ্ধশিল্প সবচেয়ে বড় শিল্প। এছাড়াও এই শিল্প দ্বারা আগত মুনাফার সিংহভাগটাই ভারতীয় অর্থনীতিতে যোগ হয়। দেশের অর্থনীতির প্রায় ৪%-ই আসে দুগ্ধশিল্প থেকে। গোটা পৃথিবীতে ভারতে দুগ্ধশিল্পের হার সবচেয়ে বেশি। ২০১৮-'১৯ সালে কেবল ভারত থেকেই ১১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন দুধ উৎপাদন হয়। এর সবচেয়ে বড় কারণ লুকিয়ে আছে হিন্দু পুরাণে। কারণ, ভারতে দুধ কেবলই একটি পানীয় নয়, যে আমরা সকালবেলায় উঠে কোনও খাদ্যদ্রব্যর সঙ্গে মিশিয়ে খেয়ে নিলাম। হিন্দু পুরাণেও দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যর বিশেষ উল্লেখ আছে।

সমুদ্রমন্থনে যখন অমৃত পাওয়ার জন্য যখন দেবতাদের মধ্যে প্রতিস্পর্ধা চলছিল, সেই সময়ে দেবী কামধেনুর আবির্ভাব হয় গোমাতা-রূপে। এছাড়া শ্রীকৃষ্ণর ছোটবেলার নানা গল্পের খণ্ডে আমরা দই ও মাখনের উল্লেখ পেয়ে থাকি। আর সে পালিত হয়েছিল একজন গোয়ালার ঘরে, তাই এই হিন্দুরাজ্যে গরু ও দুগ্ধ অত্যন্ত পূজনীয় সাধারণ মানুষের কাছে। সেই কারণে ভারতে দুধের গুরুত্ব অনেক বেশি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কুখ্যাত ২২ অক্টোবরের স্মৃতি আজও দগদগে! কোনও দিন কি ফুরোবে কাশ্মীরের 'কালো অধ্যায়'?

Black Day of Jammu and Kashmir: মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার পক্ষপাতী হলে ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই কাশ্মীরকে নিজ রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে।

পৌরাণিক ইতিহাস ছাড়াও এই খাদ্যদ্রব্যের অনেক পুষ্টিগুণ আছে। যেমন হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে সাহায্য করে, এছাড়া শক্তি জোগায় ও রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু এত পুষ্টি থাকা সত্ত্বেও দুধ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এমন অনেক গবেষণায় পাওয়া গেছে, যেখানে বলা হয়েছে দুধ মোটেই আমাদের শরীরের জন্য উপকারী নয়। উপরন্তু এটি আমাদের শরীরে আরও খারাপ প্রভাব ফেলে।

এই বিষয়টি সবার প্রথম সামনে আনেন হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিদ মার্ক হেগস্টেড ১৯৫১ সালে। ছোট থেকেই তিনি আইদাহের একটি ছোট ডেয়ারি ফার্মে পালিত হয়েছেন। ফার্মে থাকাকালীন তিনি দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের উপকারিতা সমন্ধে অনেক কিছু শুনেছিলেন। কিন্তু পুষ্টিবিদ্যা (নিউট্রিশন) পড়ার সময়ে তিনি জানতে পারলেন, এমন অনেক দেশ আছে, যেখানে দুধ পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও তার পরিমাণ অত্যন্ত কম। সেইসব দেশে আবার মানুষ বৃদ্ধ অবস্থায় অনেক বেশি সুস্থসবল থাকত বাকি দেশগুলোর তুলনায়। মার্ক হেগস্টেড তখন পরীক্ষানিরীক্ষা চালু করলেন যে, দুধ কি আদৌ প্রয়োজনীয় আমাদের জন্য! যদি প্রয়োজনীয় হয়, তবে কত মাত্রায় তা আমাদের পুষ্টি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়।

এই বিষয়ে আরও গবেষণা করতে তিনি হাজির হলেন পেরুর এক অখ্যাত জেলে, যেখানে অপরাধীদের কেবলই ভাত ও বিনস দেওয়া হতো খাওয়া হিসেবে, এবং তাঁদের সারা সপ্তাহে কেবল একবার দুধ খেতে দেওয়া হতো। হেগস্টেড সেই জেল থেকে দশ জন কয়েদিকে বেছে নিলেন এবং নিজের পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করলেন। সেই পরীক্ষার মাধ‍্যমে তিনি জানতে পারলেন যে, কোনও মানুষ সারাদিনে কেবল মাত্র ১২৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম শোষণ করতে পারে, যা প্রায় হাফ গ্লাস দুধের সমান। পরে যখন তিনি সেই ১০ জন ব্যক্তির নিউট্রিশন টেস্ট করেন, তাঁদের ফলাফল একদম স্বাভাবিক এল। অর্থাৎ, দুধ যথেষ্ট কম মাত্রায় খাওয়া প্রয়োজন, তবেই তা পুষ্টি বৃদ্ধি করে। হেগস্টেডের এই পরীক্ষা আলোড়ন এনেছিল পুষ্টিবিদ্যায়।

এই পরীক্ষাটি করা হয় ১৯৫১ সালে, কিন্তু তারপরেও বাজারে বিভিন্নরকম পানীয় দ্রব্য আসে। বাজারে এতরকম পানীয় দ্রব্য আসার পরেও দুধের চাহিদা কমে না। আর এমন হওয়ার বিশেষ কারণও ছিল, কারণ দুধ ছিল একদিকে সস্তা ও অন্যদিকে পুষ্টিকর। তা পান করেই অনেক বাচ্চাদের রিকেট রোগ সেরে যেত কারণ এর প্রধান উপাদান ছিল ক্যালসিয়াম। বাচ্চাদের জন্য যে দুধের কোনও বিকল্প নেই, তার পরিচয় তো অনেকবার পাওয়া গেছে, কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও কি দুধ এতটাই উপকারী!

ওয়াল্টার উইলেটকো নামে একজন পুষ্টিবিদ ছিলেন। তিনিও হেগস্টেডের মতো একটি ডেয়ারি ফার্মে বড় হয়েছেন। কিন্তু তাঁর গবেষণা দ্বারা তিনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, যেসব প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজের দৈনন্দিক জীবনে অনেক বেশিমাত্রায় দুধ অথবা দুগ্ধজাত দ্রব্য গ্রহণ করেন, তাঁরাই পরবর্তীতে বেশিরভাগ অসুস্থতার শিকার হন। এ-বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখে উইলেটকো এবং তার টিম জানতে পারেন যে, দুগ্ধজাত দ্রব্যে ক্যালশিয়াম ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টি-উপাদান বেশিমাত্রায় থাকার কারণে এমন শারীরিক অসুস্থতা দেখতে পাওয়া যায়।

এই বিষয়ে গবেষণা করতে করতে, উইলেটকো-র পর্যবেক্ষণে কিছু ভয়ানক বিষয় উঠে আসে। তার গবেষণা অনুসারে যে মহিলারা দিনে দুইয়ের বেশি গ্লাস দুধ খায়, তাঁদের হাড় ক্ষয়ে যাওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি থাকে। এবং যেসব পুরুষ দিনে দুই গ্লাসের বেশি দুধ খেয়ে থাকেন তাঁদের ক্যানসার হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি। এছাড়া দুধের মধ্যে ল্যাক্টোজ নামক একটি মিষ্ট পদার্থ থাকে, যা সহজে হজম করা যায় না। আর যে-সকল ব্যক্তি একেবারেই ল্যাক্টোজ হজম করতে পারেন না, তাঁদের দুগ্ধজাত পদার্থ খেলে ডায়েরিয়া পর্যন্ত হতে পারে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ল্যাক্টোজ হজম করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে।

লিখেছেন
Ahana Das
Ahana Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।