জুয়াড়ির স্বর্গ-নরক

Ladly Mukhopadhaya
৪ মিনিট
জুয়াড়ির স্বর্গ-নরক

সম্পর্কে আমার কাকা। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিল শিবপুর থেকে, জলপানি-সহ। তো তার ছিল মারাত্মক একরোখা ভাব। ওই যাকে বরিশালিয়া গো বলে। পরিবারে কোনো পাত্তা না পাওয়া এই কাকাটি কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাশ দেবার পর বছর খানেক এক নামডাকওয়ালা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতেই শুরু ও শেষ। দু'হাতে রোজগার করেছে আর খরচ করেছে শেষতক। এই রোজগারের অনেকটা এসেছে ছেলেমেয়েদের পড়িয়ে মানে টিউশান দিয়ে আর ইংরেজির নোটবুক লিখে। বাদবাকিটা জুয়া খেলে। যা তার নিঃস্ব হওয়ার রোজনামচারও আখ্যান। জুয়া ছিল তাঁর আবেগের মুকুল। জুয়ার ক্ষেত্রে তার ছিল অসম্ভব প্যাশনেট থিংকিং।

যেহেতু কাকার পারিবারিক পদবি সর্বজ্ঞ তাই চলতে ফিরতে লোকে টোকা দিত, খোঁটা দিত। তার আরেকটি কারণ হলো আগ বাড়িয়ে সব বিষয়ে কথা বলা। কিন্তু ওর কথা শুনলে বোঝা যেতো যে এ পৃথিবীর অনেকানেক পূর্বাপর তার কমবেশি জানা আছে। পরিষ্কার মাথার লোক ছিল। মারাত্মক স্মৃতিধর। এখানে জানিয়ে রাখি, সর্বজ্ঞ পদবিটা বরিশালের। এদিকে কম শোনা যায়। আর হ্যাঁ, কাকা ছিল ভোরেসাস রিডার। তখন ছিল লাইব্রেরি থেকে বই আনার চল। গোটা ছয়েক বড় লাইব্রেরির সদস্য কাকা, নিয়মিত বই নেওয়া দেওয়া করতো এবং তার বিষয় হল বিবিধ। সমাজনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি সব ধরনের বই।

কথাপটুয়া এই কাকার সঙ্গে আমার ছিল দারুণ একটা সম্পর্ক। আমরা বোধহয় একে অন্যের নিজেদের কারণেই পটিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পছন্দের জগতও ছিল মেরুপ্রমাণ পার্থক্যে। যেমন আমি জুয়ার বিরুদ্ধে সেই বুঝবার বয়স থেকে আজ পর্যন্ত। কোনো দিন জুয়া খেলায় প্ররোচিত হইনি। যে বয়সে জুয়া বিরোধী হয়েছি তখনো দস্তয়েভস্কি পড়িনি, জন মন্টেগু কিংবা রিচার্ড নিক্সনের জীবন পড়িনি। হাতের কাছে থাকা দেবব্রত বিশ্বাসের গল্প তখনও শুনিনি। ওর রেস প্রীতির কাহিনি বড়কালে শোনা। প্রকৃতপক্ষে কাকাই আমার দেখা আপাদমস্তক এক জুয়াড়ি। যার 'সাথ' দিয়েছি জুয়ার টেবিলে, সঙ্গ করেছি বেলাঅবেলায়। আরেকজন ছিল সমুদ্রপাড়ার দাদা, তারও সঙ্গ করেছি। তাকে নিয়েও লিখেছি। আবারও কখনো লিখবো।

আসি আমার কাকার কথায়। কাকা তাসের রাজা আর হাতসাফাইয়ে খাসা। তাঁর বক্তব্য হলো, "কপালের ওপর নির্ভর করে খেলা যায় না। সেতো লাগলে তুক না লাগলে তাক। খেলায় তোমার দখলদারি নিতে হবে বুদ্ধি খাটিয়ে। সেক্ষেত্রে চোখে চাড্ডি ধুলোও দিতে হবে। ওই যাকে তোরা বলিস ম্যানিপুলেশন।"

আমি যে সময়ের কথা লিখছি তখন বড় বড় বোর্ডে চলতো শুধুমাত্র তাসের জুয়া। কাকা রোয়াবি দেখিয়ে সে সব জায়গায় পৌঁছে যেত। তখনও সঙ্গে টেনিয়া নিয়ে যাওয়ার চল ছিল। সেভাবে আমিও তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার গেছি। শুধু সঙ্গী হয়ে নয়, হিসাব রাখতে। আনলিমিটেড ওপেন বোর্ডে তো খুচরো টাকার ছয়লাপ। সে সব টাকা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে হতো। পরের দানের (রাউন্ড) জন্য। আবার ভালো টাকা আমদানি হলে সঙ্গের টেনিয়াকে গুডলাক (টাকা) দেওয়ার চল ছিল সেসময়। হারলে কিছু পাওয়া যাবে না।

কাকাকে কেউ আমরা মদগাঁজা খেতে দেখিনি। কিন্তু পানাহারের আড্ডায় সে অত্যন্ত সাবলীল। সঙ্গের খাদ্যখাবার অর্থে চাটের অর্ধেকের বেশি সেই খেয়ে নিত। কাকা খেতে ও খাওয়াতে ভালবাসতো। আর অসম্ভব কম ঘুমোতো। তাকে কি ঘুম বলা যায়? সতর্ক সজাগ বিশ্রাম।

সে বলতো, "অতো ঘুমের কি দরকার? জীবনের এতোটা সময় প্রতিদিন পাঁচ-সাত ঘন্টা ঘুমালে তুই কতটা সময় নষ্ট করছিস বল। না ঘুমালে কোনো সমস্যা হয় না। একটা সময় চোখকে খানিক বিশ্রাম দিলেই হলো। ঘোড়াকে দেখিস না দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঘুমায়ে। আমি কতবার ভিড় ট্রেনে দাড়িয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বাড়ি ফিরেছি।"

সবই ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ শুনি কাকার শরীর খারাপ। এ আমরা কখনো শুনি। নানা কাজে-অকাজে ব্যস্ত থাকার ফলে কাকার সাথে দেখা হয়না প্রায় বছরখানেকের বেশি। তখন অকারণে এতো ফোন দেওয়ার চল ছিল না। তো শোনা মাত্র খবর নিতে ছুটলাম। কলকাতার দক্ষিণ থেকে উত্তরে। গিয়ে শুনলাম কাকার জীবনে একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে।

জুয়াড়িদের সার্কেলে কাকা খেলতে পারবে কিন্তু তাস বাটতে, সাফল করতে পারবে না। কেননা ইতিমধ্যে এটা সকলের জানা হয়ে গেছে যে কাকা খেলতে বসে নিপাট চুরি করে। কাকা বলতে চাইল না। কিন্তু আমার ধারণা কাকা হাতেনাতে ধরা পড়েছে বেশ কয়েকবার। মুখে বলছে, সবাই বদনাম করছে। এমন ব্ল্যাক লিস্টেড জুয়াড়ির কথা আমি আগেও শুনেছি। কাকার সঙ্গেও সে বিষয়ে কথা হয়েছে। তখন কাকা বলেছে, "আরে তাহলে কি করলাম এতগুলো বছর যদি ধরতেই পারবে!" আমার কানে সেই কথাই বাজছে আর কাকা বলছে উল্টো কথা। সে যাই হোক, যে কোনো মানুষই নিজেকে ভালবেসে লুকোতে চায়। বুঝলাম কাকাও তার ব্যতিক্রম নয়।

এমন একটা বিপর্যয় কাকা ঠিক মেনে নিতে পারেনি। সে ক্রমে একটা দশ বাই বারো ঘরে নিজেকে বেঁধে ফেলেছে। লেখাপড়াও ত্যাগ করেছে। বলতো, ছাত্র ছাত্রীদের পড়নো হলো কাজ। যা আমাকে দুবেলার খাবার জোগায়। আর জুয়া হলো মনের এক্সারসাইজ, সম্পূর্ণ মনোরঞ্জন। এবার হলো কি কাকা প্রকাশকদের কাজ ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল। দু'একজন বাছা ছাত্রছাত্রী পড়াতো। শেষ দিকে তাও ছেড়ে দিল।তখন রোজগার বলতে আগে লেখা বইয়ের সামান্য রয়ালটি । ফলে সেই ফ্যামব্লয়েন্ট কাকা

চুপসে গেল দিনে রাতে। যার সব কিছুতেই কথা বলার অভ্যাস। সে সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে। আর ছলছল চোখে মন মরা ভাব।

দু'চার দিন গিয়ে এসব দেখে বুঝতেই পারছিলাম এবার হয়ে এসেছে। কাকা কিন্তু পরিবারের শত অনুরোধেও কোনো ডাক্তার দেখায়নি। কেননা ও জানতো ওর কোনো অসুখ হয়নি। ও জেনে ফেলেছিল যে ওঁর দুরন্ত মন ও প্যাশানের তার ছিঁড়ে গেছে। এ পৃথিবীতে তার আর কোনো জায়গা নেই।

জুয়ার প্রতি এই ভালবাসা কখনো দেখিনি।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

লেপচারা অনেক আগেই 'গীতবিতান' অনুবাদ করে ফেলেছে

ঠিক এই সময়টায় আরেকটি বড়সড় প্রতিরোধ  সংগঠিত হচ্ছিল তিস্তার ওপর সতেরোটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের প্রতিবাদে। নতুন প্রজন্ম সেই সময় লাগাতার অনশন করেছে। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত বন্ধু তথ্যচিত্রকার দাওয়া লেপচা প্রায় একশো দিন অনশনে ছিল।

পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে এই দুর্গশহর?

হঠাৎ মেলানিয়া কফি নিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বলে , "তুমি কি জানো, স্টিভেন স্পিলবার্গ দিনসতেরো এই পুইভার্টে রেকি করে তারপর এগারো দিন লোকেশন শুটিং করেছিলেন?"

যাযাবর, অচ্ছুৎ, 'আধা-বেশ্যা'! যেভাবে বাঁচে রাজস্থানের কালবেলিয়ারা

একদিন হয়তো প্রকৃত সমাদর পাবে এই ভেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখছে কালবেলিয়ারা।