আঘাত করলে লাগত দু'জনেরই, আজও কাঁদায় লায়লা-মজনুর প্রেমকাহিনি

tiasa gupta
৩ মিনিট
আঘাত করলে লাগত দু'জনেরই, আজও কাঁদায় লায়লা-মজনুর প্রেমকাহিনি

লায়লা-মজনু প্রেমকাহিনি আবিশ্ব পরিচিত। এই কাহিনির মূল উৎস আরবি লোকগাথা। কেউ কেউ বলেন, এর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তবে সেই মতের পক্ষে তেমন একটা জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আমির পুত্র কয়েস বাল্যকালে বণিক-কন্যা লায়লার প্রেমে পড়ে মানসিক স্থিতি হারিয়ে ফেলেন। তখনই তিনি 'মজনু' বা 'পাগল' নামে পরিচিত হন। লায়লাও মজনুর প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। কিন্তু উভয়ের বিবাহে আসে বাধা। ফলে মজনু পাগল হয়ে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। অন্যদিকে লায়লার অন্যত্র বিয়ে হলেও তাঁর মন ঘিরে থাকেন মজনু। তাঁদের দীর্ঘ বিরহজীবনের অবসান ঘটে করুণ মৃত্যুর মাধ্যমে। এই মর্মস্পর্শী বেদনাময় কাহিনি অবলম্বনেই লায়লা-মজনু কাব্য রচিত।

শোনা যায়, লায়লা-মজনু সপ্তম শতাব্দীর নাজদি বেদুইন কবি কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়া এবং তাঁর প্রেমিকা লায়লা বিনতে মাহদি-র প্রেমকাহিনি-নির্ভর প্রাচীন আরব্য লোকগাথা। এই কাহিনি পরবর্তীতে ফারসিকবি নিজামি গানজাবি-র পঞ্চকাহিনিযুক্ত আখ্যান কাব্যগ্রন্থ 'খামসা'-র (পাঁচ) তৃতীয় খণ্ডে স্থান পায়। পরবর্তীতে প্রেম-সম্পর্কিত কাব্য হিসেবে এটি প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন একে মধ্যপ্রাচ্যের রোমিও-জুলিয়েট বলে আখ্যায়িত করেন। দৌলত উজির বাহরাম খান বিরচিত লায়লা-মজনু কাব্য রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান কাব্যধারায় একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে স্থান পেয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মতে, লায়লা-মজনু কাব্যের রচনাকাল ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দ। কবি দৌলত উজির বাহরাম খান রচিত লায়লা-মজনু কাব্য, পার্সি তথা ইরানি কবি জামির-এর লায়লা-মজনু নামক কাব্যের ভাবানুবাদ।

লায়লা ও মজনু আমাদের দেশে সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনি। যদিও কালজয়ী এই প্রেমকাহিনির সত্যাসত্য নিরূপণ করা এখন অনেকটাই কষ্টসাধ্য। সময়ের বিবর্তনে নানা জাতি আর নানা দেশের মানুষের মুখে মুখে লায়লা-মজনুর গল্প বিবর্তিত হয়েছে নানাভাবে।

লায়লা-মজনুর প্রেম লোকমুখেই বেশি ছড়ায়। শোনা যায়, বহু বছর পূর্বে আরব দেশে ছিল বনু আমির বেদুইন গোত্রের এক মহান শাসক, যার নাম ছিল সাঈদ। তিনি ছিলেন আরবের ধনী, তাঁর ধন-দৌলত এতোটাই প্রচুর ছিল যে, আরব দেশে তাঁকে ধনাঢ্য সুলতান নামে অভিহিত করা হত। কিন্তু এত কিছুর পরেও তিনি সুখী ছিলেন না। কারণ তাঁর কোনও সন্তান ছিল না। আল্লাহতালার কাছে অনেক প্রার্থনার পর তাঁদের সংসারে একটি সুন্দর ও ফুটফুটে ছেলে জন্মায়। শিশুটির জন্মের পর বাদশা প্রজা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে টাকাপয়সা ও খাবার বিলোতে শুরু করেন। শিশুটির নাম রাখা হয় কয়েস। এই কয়েসই গল্পের, অর্থাৎ লায়লা-মজনুর প্রেমকাহিনির প্রধান নায়ক।

লায়লা মজনুর প্রেম ঘিরে নানা জনপ্রিয় মিথ ছড়িয়ে আছে বিশ্বের নানা প্রান্তে। স্বর্গীয় প্রেমের প্রতীক মানা হয় এই লায়লা-মজনু জুটিকে। বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে লায়লা এবং কয়েস একে-অন্যের প্রেমে পড়েন। তাঁদের প্রেম সমাজের নজরে এলে দু'জনের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে যায়। নিঃসঙ্গ কয়েস মরুপ্রান্তরে নির্বাসনে যান। কয়েসের ক্ষ্যাপাটে আচরণের জন্য তাঁকে ডাকা হত মজনু (পাগল) নামে। লায়লার বাবা কয়েসের সঙ্গে লায়লার বিয়েতে সম্মতি দেন না। কথিত আছে, লায়লার বাবা মজনুকে আহত করলে লায়লাও আহত হতেন, এমনই ছিল তাঁদের সেই স্বর্গীয় প্রেম। কিন্তু মজনুকে মরুভূমিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে বেদুইনের দল মজনুর হার না-মানা ভালবাসা দেখে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। তারা লায়লার বাবাকে যুদ্ধে হারিয়ে দেয়। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। লায়লাকে তাঁর বাবা জোর করে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর লায়লা মজনুর কাছে ফিরে আসেন, কিন্তু প্রচণ্ড দুঃখ আর অনাহারে মজনু মারা যান। লায়লাও মজনুর পথ অনুসরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁদের পাশাপাশি সমাধিস্থ করা হয়। স্বর্গে গিয়েও ভালবাসার মানুষকে চাওয়ার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের আকুতি এই কাহিনিকে অমর করে রেখেছে।

লায়লা মজনুর প্রেম ঘিরে নানা মুনির নানা মত। কিছু সূত্র থেকে এটা জানা যায় যে, তাঁদের উভয়ের বাবা-মা তাঁদের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এবং সর্বশেষ তাঁরা ভারতে চলে আসেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, ভারতের রাজস্থানে লায়লা-মজনুও চলে আসেন এবং রাজস্থানের অনুপগড়ে তাঁদের মাজার রয়েছে।

আবার অনেকে বলে থাকেন, লায়লার বৃদ্ধ স্বামী মজনুকে মারার জন্য লোকবল নিয়ে এক জঙ্গলে রওনা দেন এবং মজনুকে আক্রমণ করেন। আবার অনেকে বলে থাকেন, মজনুকে যখন আঘাত করা হয়, ম্যাজিক্যালি সেই সম-পরিমাণ আঘাত লায়লার গায়েও লাগে। এভাবে যখন লায়লার বৃদ্ধ স্বামী মজনুর বুকের মাঝে ছুরি চালান, তখন লায়লাও মৃত্যুবরণ করেন। পরে তাঁদের দুইজনকে একসঙ্গে সমাধিস্থ করা হয়। লায়লা-মজনুর প্রেমকাহিনি নিয়ে রয়েছে এমনই নানা রকম মিথ।

এই প্রেমকাহিনি কাল অতিক্রম করে মুখে মুখে বিবর্তিত হয়েছে। আক্ষরিক অর্থে এটা জনশ্রুতি, সেভাবে এর কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তবে এই প্রেম ঘিরে যে মিথ যুগের পর যুগে সঞ্চারিত, তাতে একটা কথা বলাই যায়, এর পরিণতি ট্র্যাজিক। তাই হয়তো প্রেমিক মন লায়লা-মজনুর জন্য রেখে যাবে এক ফোঁটা চোখের জল।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।