হাজার বছর ধরে জলের গভীরে লুকিয়ে আছে দানব? যে রহস্যের কিনারা হয়নি আজও...

Loch Ness Monster, Scotland: হ্রদে বসবাসকারী এই জলজ অতিকায় প্রাণীর বিবরণ ১,৫০০ বছর আগে মিললেও প্রাণীটির অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।

inscript
৪ মিনিট
হাজার বছর ধরে জলের গভীরে লুকিয়ে আছে দানব? যে রহস্যের কিনারা হয়নি আজও...

সবাই জানে আছে, কিন্তু কেউ দেখেনি! শত শত বছর ধরে তাবড় বিজ্ঞানীরাও যুৎসই কোনও উত্তর দিতে পারলেন না। ফলে আজীবনের মতো কিংবদন্তি হয়ে রইল লোচ নেস মনস্টার, আদর করে মানুষ তাকে ডাকেন নেসি বলে। স্কটল্যান্ডের ইনভারনেসের কাছে বিশাল বড় মিষ্টি জলের হ্রদ লোচ নেসে বাস করে এই নেসি। আকারে সে এক বিশাল প্রাণী, কিন্তু কেউই সেভাবে নির্দিষ্ট করে দেখেনি এই প্রাণীটিকে। কল্পনা, না কি সত্যিই কোনও রহস্য, এ একমাত্র নেসিই জানে। হ্রদে বসবাসকারী এই জলজ অতিকায় প্রাণীর বিবরণ ১,৫০০ বছর আগে মিললেও প্রাণীটির অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। স্কটিশ হাইল্যান্ডে অবস্থিত লোচ নেসে গ্রেট ব্রিটেনের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে মিষ্টি জল রয়েছে; জলের গভীরতা প্রায় ৮০০ ফুট এবং হ্রদটি লম্বায় প্রায় ২৩ মাইল দীর্ঘ! ১৯৩৪ সালে ইংরেজ চিকিৎসক রবার্ট কেনেথ উইলসন নাকি এই প্রাণীটির ছবি তোলেন। বিখ্যাত সেই ছবিটি 'সার্জনস ফটোগ্রাফ' নামে পরিচিত। তাতেই দেখা যায় জলবাসী ওই দৈত্যের মাথাটি ছোট এবং ঘাড় বিশাল লম্বা। ১৯৯৪ সালে জানা যায় উইলসনের ছবিটি জাল। আসলে একটি খেলনা সাবমেরিনের সঙ্গে একটি প্লাস্টিক এবং কাঠের মাথা জোড়া হয়েছিল। চূড়ান্ত কোনও প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও, লোচ নেসের দানব জনপ্রিয় এবং লাভজনক হয়ে স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতেও বাঁক আনে। ২১ শতকের গোড়ার দিকে দেখা যায়, লোচ নেস স্কটল্যান্ডের অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার যোগ করেছে।

সেন্ট কলম্বা

সপ্তম শতাব্দীর আইরিশ ধর্মপ্রচারক সেন্ট কলম্বার জীবনীতে প্রথম এই অদ্ভুত প্রাণীর কথা মেলে। সেন্ট কলম্বা স্কটল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন। সেন্ট কলম্বার জীবনীকারের মতে, ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট কলম্বা ইনভারনেসের কাছে উত্তর পিক্টসের রাজার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। পথমধ্যে লোচ নেস হ্রদে তিনি থামেন। তখন তিনি দেখতে পান হ্রদের মধ্যে এক অদ্ভুত দর্শন বিশালাকার জন্তু একটি মানুষকে আক্রমণ করেছে। সেন্ট কলম্বা আর কী করেন, প্রাণপণে ভগবানের নাম নিয়ে দূর থেকে ওই প্রাণীটিকে নির্দেশ দেন "এক্ষুণি এখান থেকে পালাও"! দৈত্যাকার ওই প্রাণী ফিরে যায়। শোনা যায় আরও কখনও অন্য মানুষের ক্ষতি করেনি সে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আর কোনও প্রাণীর দেহেই নেই! জানেন, কেন কেবল মানুষেরই চিবুক আছে?

Human Chin Evolution: কেন একমাত্র মানুষেরই চিবুক আছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের মুখগুলি কেন ছোট হয়ে গেল তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ

লোচ নেসের দৈত্যটি আসলে কে?

১৯৩৩ সালে, লোচ নেসের তীরে একটি নতুন রাস্তা তৈরি করা হয়। এই রাস্তা দিয়ে যে গাড়ি চালকরা যাবেন স্পষ্টভাবে হ্রদটিকে দেখতে পাবেন। ১৯৩৩ সালের ২ মে, ইনভারনেস কুরিয়ারের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, স্থানীয় এক দম্পতি নাকি হ্রদের জলের উপর এক বিশাল প্রাণীকে ভেসে থাকতে, সাঁতার কাটতে দেখেছেন। লন্ডনের সংবাদ সংস্থাগুলি স্কটল্যান্ডে সংবাদদাতা পাঠাতে শুরু করে বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে। এখানেই শেষ না, একটি সার্কাস কোম্পানি তো আবার জানোয়ারটিকে ধরার জন্য ২০,০০০ পাউন্ড পুরস্কারের ঘোষণাও করে ফেলে। ধীরে ধীরে লোচ নেস দানবের গল্পটি সাংবাদিক মহলেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

১৯৩৩ সালে ওই পশুটিকে দেখতে পাওয়ার পরে, অন্য এক দম্পতি দাবি জানান, হ্রদের তীরের রাস্তা পার হওয়ার সময় জমিতে জন্তুটিকে দেখেছেন তারা। লন্ডনের ডেইলি মেইল সহ বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ সংবাদপত্র স্কটল্যান্ডে সাংবাদিকদের পাঠায়। ডেইলি মেইল আবার জন্তুটিকে ধরার জন্য ব্রিটিশ-দক্ষিণ আফ্রিকান অভিনেতা ও শিকারি মারমাডিউক ওয়েথেরেলকে নিয়োগ করে।

কয়েকদিন ধরে ওই হ্রদের অঞ্চলে লোচের অনুসন্ধান চালানোর পরে, ওয়েথেরেল দাবি করেন, বিশাল এক চারপেয়ে প্রাণীর পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। ডেইলি মেইলের তো পোয়া বারো! পরদিনই কাগজে বড় করে খবর বেরোয়, "লোচ নেসের দানব কিংবদন্তি নয় বরং সত্য"।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঁদরেরই জাত ভাই! তবে কেন মানুষের মতো বুদ্ধি ধরে না অন্য কোনও প্রাণীই?

Human Brain: মস্তিষ্কে নিউরোনের অন্তর্জাল বা নিউরোনাল নেটওয়ার্ক সাধারণত আমাদের অভিজ্ঞতা এবং অভ্যেসের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ব্রেন প্লাস্টিসিটি

খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক পর্যটক লোচ নেসে নেমে পড়েন! নৌকা বা ডেক চেয়ারে বসে পশুটিকে এক ঝলক দেখার অপেক্ষা করেন। পায়ের ছাপের প্লাস্টার ঢালাই করে ব্রিটিশ ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে খতিয়ে দেখা যায় পায়ের ছাপগুলি একটি জলহস্তীর। আরও ভালো করে বলতে গেলে একটি জলহস্তীর কৃত্রিম পায়ের। এই ছাপগুলি বড় ছাতা, অ্যাশট্রে দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এই গুজবে লোচ নেসের দানবের গল্প কিছুটা ধামাচাপা পড়ে ঠিকই কিন্তু নানা রটনা চলতেই থাকে।

১৯৩৪ সালের একটি বিখ্যাত ছবিতে দেখা যায়, ডাইনোসরের মতো এক প্রাণীর লম্বা ঘাড় ঘোলা জল থেকে বেরিয়ে আসছে, পরে জানা যায় ছবিটি ভুয়ো। কেউ কেউ অনুমান করেন, 'নেসি' আসলে দীর্ঘকাল আগে বিলুপ্ত প্লেসিওসরদের একামাত্র বেঁচে থাকা সদস্য। জলজ প্লেসিওসররা ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে বাকি ডাইনোসরদের সঙ্গেই মারা গিয়েছিল বলে মনে করা হতো।

লোচ নেস বরফ যুগে জমাট বাঁধা হ্রদ ছিল। তাই এই প্রাণীটিকে বিগত ১০,০০০ বছরে সমুদ্র থেকে নেস নদীতে আসতে হয়েছে। প্লেসিওসরদের রক্ত ঠান্ডা। তাই এই পশু নাকি লোচ নেসের হিমশীতল জলে বেশিদিন টিকতে পারবে না।

অন্যরা আবার বলেন, এটি একটি আর্কিওসাইট। সাপের মতো ঘাড়ওয়ালা এক আদিম তিমি যা ১৮ মিলিয়ন বছর ধরে বিলুপ্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়। আরেক অংশের মানুষ বলতে থাকেন, এসব কিচ্ছু না। তাঁদের যুক্তি, মানুষজন যা দেখেছে তা আসলে 'সিচেস'। সিচেস হচ্ছে সামান্য উষ্ণ লোচে নদীর ঠান্ডা জলপ্রবাহের কারণে জলের পৃষ্ঠের দোলন।

অনুসন্ধান অব্যাহত

লোচ নেসের এই পশুটি কি তবে সত্যিই গল্প? অবিরাম নজরদারি চালানো হয় এই হ্রদের রহস্য সমাধানের লক্ষ্যে। ১৯৬০-এর দশকে বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় গভীর জলে অনুসন্ধান চালায়। কিছুই তেমন পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিটি অভিযানে জলের নিচে চলমান বিশালাকার বস্তু দেখতে পেয়েছেন সন্ধানকারীরা। যা আসলে ঠিক কী তারা ব্যাখ্যা করতে পারেননি।

১৯৭৫ সালে, বোস্টনের আকাডেমি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স লোচ নেসের একটি অভিযানে তোলা জলের নিচের ছবিগুলিকে একত্রিত করে। একটি ছবিতে দেখা যায়, প্লেসিওসর-সদৃশ প্রাণীর বিশাল দেহ। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে আরও অভিযান চালানো হয়, যদিও মেলেনি কিছুই। নানা গুজব প্রকাশ্যে ফাঁস হয়ে যাওয়ার পরেও মানুষের কৌতূহল কিন্তু কমেনি।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।