১০০০ তালিবানের 'খুনি' কমিউনিস্ট মার্শাল দোস্তাম কি আফগানিস্তান বাঁচাতে পারবেন?

Simanto Chowdhury
৩ মিনিট
১০০০ তালিবানের 'খুনি' কমিউনিস্ট মার্শাল দোস্তাম কি আফগানিস্তান বাঁচাতে পারবেন?

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: আফগানিস্তানে এখন তালিবান সরকার। ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০২১ এর ১৫ আগস্ট রবিবার থেকে ...আগামী অজানা ভবিষ্যৎ পর্যন্ত দুবার জঙ্গিদের সরকার কায়েম হলো। আফগান সরকার পরাজিত। দেশ ছেড়ে প্রতিবেশি তাজিকিস্তানে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন অপসারিত প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি।

তবে তালিবান সরকারের ভয় আছে। তাদের দোজখের দরজা (নরকের দ্বার) দেখানো চরম কুশলী আফগান সেনাপতি আবদুল রশিদ দোস্তাম জীবিত। তিনি অবশ্য গোপন ডেরায় চলে গিয়েছেন। তাঁর গণ মিলিশিয়া বাহিনি তৈরি হচ্ছে তালিবান তাড়াতে।

দোস্তাম কোথায়? কেউ জানে না। ওয়াশিংটনের কাছে খবর নেই। ক্রেমলিন জানলেও নীরব। ইজরায়েলের বিখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ আঁতিপাঁতি করে খোঁজ লাগাচ্ছে। পাকিস্তানের সামরিক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিসেন্স) কর্তারা দোস্তামের সর্বশেষ খবরটি কাবুলে তালিবান সরকারের কাছে পাঠাতে মরিয়া।

কারণ মার্শাল দোস্তাম নামটাই তালিবানের কাছে ভয়। দোস্তাম তালিবান খুনি। এক হাজার তালিবানকে মেরে ফেলার জন্য বিখ্যাত। আফগানিস্তানের এই সেনা কমান্ডারের অপর পরিচয় তিনি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ। ৮০-৯০ দশকে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রনাধীন আফগানিস্তানের শ্রেষ্ঠ সেনা কমান্ডার। পরবর্তীতে আফগান শীর্ষ রাজনীতিক ও নিজের বিশেষ বাহিনির প্রধান।

আসুন আবদুল রশিদ দোস্তামকে নিয়ে কিছু কথা জানি। বিভিম্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে এই তালিবান বিরোধী কমিউনিস্ট মনোভাবের আফগান সেনানায়কের বিষয়ে কিছু তথ্য প্রকাশ হয়েছে।

কেমন লোক আবদুল রশিদ দোস্তাম?

৬ ফুট লম্বা, গোলাপি রঙের মানুষ দৈত্য যেন। আব্দুল রশিদ দোস্তাম জোকস আর টম অ্যান্ড জেরির লাফালাফি দেখে হো হো করে হাসেন। তাকে ডরাত মোল্লা ওমর, ওসামা বিন লাদেন। ডরায় এখনকার তালিবান প্রধান হাইবাখান্দা আখুন্দাজাদা। পাকিস্তানের জঙ্গি নেতা মাসুদ আজাহার তো সেই তুলনায় শিশু।

দোস্তাম সাহেব দুধে চোবানো বাছুরের মাংসের রোস্ট দিয়ে ভদকা খেতে খেতে স্বপ্ন দেখেন রাশিয়ায় আবার কমিউনিস্ট সরকার হবে ! ফের সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল রঙের পতাকা উড়বে !

আব্দুল রশিদ দোস্তামের কোমরে থাকা পিস্তল সদা লোডেড। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন আফগান মহিলারা যতদিন না পড়াশোনা করবে ততদিন বিপদ কাটবে না।

দেস্তাম লোকটা আসলে রক্তসূত্রে আফগানি নয়-ই। উজবেক বংশজ। পুরো জীবনটা আফগানিস্তানের হয়ে লড়াই করেছেন। প্যারাসুট বাহিনির যোদ্ধা হিসেবে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখান।

দোস্তামের ঘাঁটি আফগানিস্তানের মাজার ই শরিফ। পুরো আফগানিস্তানে একমাত্র এই এলাকায় তালিবান বিরাট বাধা পেয়েছিল। কারণ দোস্তাম ছিলেন নেতৃত্বে। হাজারে হাজারে আফগান সেনা তালিবান ভয়ে বন্দুক ফেলে পালাচ্ছিল, তখন মাজার ই শরিফে দোস্তামের গণ মিলিশিয়া বাহিনি প্রবল প্রতিরোধ গড়ে।

দোস্তাম বিতর্কিত। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তিনি আত্মসমর্পণ করা হাজার খানেক তালিবান জঙ্গিকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলেন। তবে এই অভিযোগ উড়িয়ে দেননি দোস্তাম।

আশির দশকে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে সে দেশে প্রবেশ করেছিল সোভিয়েত সেনা। বরাবর সোভিয়েত অনুরাগী দোস্তাম সরাসরি সেই সুযোগ নেন। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির হামলা রুখে দিয়ে দ্রুত পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে আফগান সেনার অন্যতম কমান্ডার হন।

সোভিয়েত মদতে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ডক্টর মহম্মদ নাজিবুল্লাহ। কমিউনিস্ট মনোভাবের প্রেসিডেন্ট ড নাজিবুল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ আফগান বীরের পদক পাওয়া সেনা কর্তা হলেন আবদুল রশিদ দোস্তাম। নব্বই দশকে সোভিয়েত ভেঙে যায়। নাজিবুল্লাহর আফগান সরকারকে উপড়ে ফেলতে ধর্মীয় মুজাহিদিনদের একত্রিত করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জন্ম নেয় তালিবান।

১৯৯৬ সালে আমেরিকার মদতে তালিবানদের ক্ষমতা দখল করা ছিল চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সেই বছরেই কাবুলে নাজিবুল্লাহকে খুনের পর প্রথমবার তালিবান সরকার হয়।

২০০১ সালে পরিস্থিতি উল্টে গেছিল। আমেরিকায় ৯/১১ নাশকতার জেরে মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে ঢোকে। ওয়াশিংটনের মদতে যে তালিবান তৈরি হয়েছিল তাদেরই তাড়ানো শুরু হলো। এই পর্বে তালিবান বিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে আবদুল রশিদ দোস্তাম গেরিলা হামলা শুরু করেন। ধীরে ধীরে গুটিয়ে গেছিল তালিবান।

টানা কুড়ি বছর পর সেই তালিবান ফের আফগানিস্তানের শাসনে। মার্কিন সরকার জানিয়েছে, আর তাদের সেনা আফগানিস্তানে থাকবেনা। সুযোগের সদব্যবহার করেছে তালিবান।

গত কুড়ি বছরে আফগান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আলোচিত দোস্তামের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সম্পর্ক ছিল শীতল। দুজনই সম্মানজনক দূরত্ব রাখতেন। মাজার ই শরিফ নিয়েই ব্যাস্ত থাকতেন দোস্তাম। তবে তালিবান হামলা নতুন করে শুরু হতেই মার্কিন সাহায্যহীন আফগান সেনার পিছু হটা শুরু হয়। একের পর এক প্রদেশ সরকারের হাতছাড়া হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আশরাফ ঘানি বিপন্ন বোধ করেন।

পরিস্থিতি বুঝে ঘানি মাজার ই শরিফ গিয়ে দোস্তামের সাহায্য চান। ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। তবে দোস্তাম নেমে পড়েন তালিবান বিরোধী সংঘর্ষে। প্রাথমিকভাবে তিনি তালিবান ঠেকালেও আফগান সেনার প্রাণভয়ে পালানো রুখতে পারেননি। সামনাসামনি যুদ্ধ ছেড়ে দোস্তাম চলে গেছেন গেরিলা রণকৌশলে।

উজবেক বংশজ দোস্তাম কি উজবেকিস্তান গিয়েছেন? কেউ বলতে পারবে না। কারণ দোস্তাম রহস্যময় চরিত্র। তিনি একাধারে সোভিয়েত অনুরাগী। আবার তিনিই সোভিয়েত ও তালিবানের একসাথে বিরোধী পঞ্জশির পর্বতমালার সিংহ বলে পরিচিত আহমেদ শাহ মাসুদের দোস্ত। তুমুল তালিবান বিরোধী মাসুদের মৃত্যু হয়েছে আগেই।

তবে দোস্তাম বেঁচে। তাঁকে ঘিরে ফের তালিবান বিরোধী আফগানিরা কোমর কষছে। কঠিন লড়াই।

সৌ: Warlord Rashid Dostum pledges to kill Taliban in Afghanistan: The Sentinel Assam

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।