মেন্থল সিগারেট নিষিদ্ধ করছে আমেরিকা, কারণ জানলে ঘুম ছুটবে ধূমপায়ীদের

আমেরিকান সংস্থা 'ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' (এফডিএ) সম্প্রতি মেন্থল এবং সমস্ত স্বাদযুক্ত সিগারেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য নতুন প্রস্তাব এনেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আগে নাগরিকদের মতামত জানতে চেয়েছে সংস্থা।

 

দেশ এবং বিদেশের বাজারে বিভিন্ন স্বাদের, যেমন অরেঞ্জ, দারুচিনি, ভ্যানিলার মতো সিগারেট পাওয়া যায়। কিন্তু এদের মধ্যে মেন্থলের স্বাদ সর্বাধিক জনপ্রিয়। এফডিএ-র মত অনুযায়ী আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে মেন্থল সিগারেট ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় যুবক এবং তরুণরা মেন্থল সিগারেট খেতে বেশি পছন্দ করে। সংস্থার তরফে আরও জানা গেছে যে, ২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধূমপায়ীদের মধ্যে ১২ বছর এবং তার কমবয়সি প্রায় ১৮.৫ মিলিয়ন মানুষ মেন্থল সিগারেট খান।

 

মেন্থল সিগারেট কী?
মেন্থল হলো একটি রাসায়নিক যৌগ, যা প্রাকৃতিকভাবে পিপারমিন্ট তেল থেকে পাওয়া যায়, বা থাইমল ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়, যা ভেষজ থাইমের একটি যৌগ। তাই তামাকজাত সিগারেটে এই যৌগ যোগ করা হলে, মেন্থল মুখ এবং গলায় এক শীতল অনুভূতি দেয়। ফলে যাঁরা এই সিগারেট খান, তাঁদের গলায় তামাকের কারণে কষ্ট অনুভব হয় না। এই কারণেই মেন্থল সিগারেট কমবয়সিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

 

আরও পড়ুন: যৌন সংসর্গ থেকে সংক্রমণ? মাঙ্কি পক্স নিয়ে নতুন যে তথ্যে তোলপাড় বিশ্ব

 

নিষেধাজ্ঞার কারণ কী?
যেহেতু মেন্থল সিগারেট ধূমপানের কষ্ট হ্রাস করে, তাই ধূমপায়ীদের পক্ষে সিগারেট ছাড়া থাকা সম্ভব হয় না। অন্যান্য ধূমপায়ীদের তুলনায় মেন্থল সিগারেট ধূমপায়ীদের সিগারেটের প্রতি আসক্তি অনেক বেশি।ফলে এদের পক্ষে ধূমপান ত্যাগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নিকোটিন কমবয়সি তরুণ ও কিশোরদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং কার্যক্ষমতা হ্রাস করে ।

 

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কমবয়সি ধূমপানকারীদের ৬০ শতাংশই মেন্থল সিগারেট খায়। কালো চামড়ার তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। প্রতি বছর মেন্থল সিগারেটের কারণে নিয়মিত ধূমপায়ীদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। পাশাপাশি তামাকের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলোও লক্ষ করা যায় ধুমপায়ীদের মধ্যে। এর ফলে আমেরিকায় অল্পবয়সিদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যানসার, হার্টের ক্যানসারের মতো রোগ বেড়ে চলেছে। শুধু তাই নয়, রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে শেষ ৪০ বছরে আমেরিকায় কমবয়সিদের মধ্যে ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী এই মেন্থল সিগারেট। সাধারণভাবে, ধূমপানের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর সিগারেট ৪,৮০,০০০-এরও বেশি মৃত্যুর জন্য দায়ী, যার মধ্যে প্যাসিভ ধূমপানের কারণে ৪১,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

 

নিষেধাজ্ঞার ফলাফল
এফডিএ মনে করছে, মেন্থল সিগারেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়িত হলে ৪০ বছরের মধ্যে ধূমপানের পরিমাণ ১৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো এবং ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দু'টি বৃহত্তম তামাক কোম্পানি বলেছে যে, তারা খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয় এ-ব্যাপারে এবং এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হতে কয়েক বছর সময় লাগবে বলে তারা মনে করছে।

 

এফডিএ আরও জানিয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কমবয়সিদের মধ্যে অকালমৃত্যু এবং রোগের পরিমাণ হ্রাস পাবে। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্যই হল তরুণ ও কিশোরদের ধূমপান থেকে বিরত রাখা। এই প্রসঙ্গে হেলথ এবং হিউম্যান সার্ভিসেস সেক্রেটারি জাভেরি বেকেরা বলেছেন, "এই নিষেধাজ্ঞার ফলে আমেরিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধূমপান থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে এবং প্রাপ্তবয়স্করাও ধূমপান ত্যাগ করবেন।"

 

একই নিষেধাজ্ঞা কি ভারতে ধূমপান কমাতে সাহায্য করবে?
যদি ভারতে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়, তাহলে প্রভাব সীমিত হতে পারে। কারণ তামাকজাত পদার্থ খাওয়া এবং সিগারেট এখানে তামাক ব্যবহারের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। 'দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস'-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সি ২৬.৭ কোটি তামাক ব্যবহারকারী রয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া 'গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভেট' (GATS 2016-17) অনুসারে, ভারতের জনসংখ্যার ১৮ শতাংশ মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করে, ৭ শতাংশ ধূমপানের মাধ্যমে এবং ৪ শতাংশ মানুষ উভয়ই ব্যবহার করেন।

 

চিকিৎসকদের একাংশ মনে করেন যে, স্বাদযুক্ত সিগারেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলে যাঁরা নতুন, তাঁদের অনেককেই তামাকের গন্ধ লুকোনোর জন্য সমস্যায় পড়তে হবে। ফলে নতুন প্রজন্মের কিছু মানুষকে ধূমপান থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে।

 

একই সুর শোনা গেছে পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের ভারতীয় অধিকর্তা মনিকা অরোরার গলায়। তিনি বলেছেন, "মেন্থল সিগারেটের মতো স্বাদযুক্ত সিগারেট মূলত তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করে। এরা অনেকক্ষেত্রেই পরবর্তী সময়ে নিয়মিত সিগারেট খেতে শুরু করে। তাই মেন্থল সিগারেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে অনেক তরুণকেই ধূমপান থেকে দূরে রাখা যাবে।"

 

যদিও ভারতের কাছে কোনও নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই যে, কত মানুষ এই স্বাদযুক্ত সিগারেট নিয়মিত খান। তবে যত সময় গড়িয়েছে, বাজারে ততই নতুন স্বাদের সিগারেট এসেছে।

 

 

 

 

More Articles

;