কালো জলের কুয়োর নিশির ডাক! দিল্লির এই প্রাচীন স্থাপত‍্য ঘিরে আজও দানা বাঁধে রহস্য

Agrasen ki Baoli: আধুনিকতার মোড়কের আড়ালে চুপিসারে দাঁড়িয়ে রয়েছে 'অগ্রসেন কি বাওলি' নামে এই ধাপ-কুয়ো।

Raktim Dey
৪ মিনিট
কালো জলের কুয়োর নিশির ডাক! দিল্লির এই প্রাচীন স্থাপত‍্য ঘিরে আজও দানা বাঁধে রহস্য

রাজধানীর অভিজাত এলাকার উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর আড়ালে প্রায় লুকিয়ে রয়েছে একটি ধাপ-কুয়ো। কুয়োটি বহু পুরনো এবং সেটা কে তৈরি করেছিল, তা নিয়ে আজও মানুষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। শোনা যায় যে, এককালে কুয়োটি স্বচ্ছ কালো জলে পূর্ণ ছিল। কালো জল শুনে আপাতভাবে অপরিষ্কার জল মনে হলেও তা সত্যি নয়। কুয়োর জলের রংটাই কালো ছিল, কিন্তু সেই জল বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের উপযোগী ছিল। যদিও মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া বহু গল্পে এই কুয়োর চরিত্র আসলে তার জলের রঙের মতোই কালো। সেইসব গল্প অনুযায়ী কুয়োর কালো জলে এবং তার আশপাশে এমন কিছু বসবাস করত, যা এই জগতের নয়। কুয়োর জল যেন মানুষের গল্পে পড়া নিশির ডাকের মতো একাকী সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করত। মানুষ সেই আকর্ষণ উপেক্ষা করতে না পেরে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেত।

বর্তমানে সেই ধাপ-কুয়োতে কোনও জল নেই। কালো জলের সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে মানুষের সেই গল্পকথা। বহু মানুষ প্রত্যহ এখানে ঘুরতে আসে। এই কুয়োর সিঁড়িতে বসে গল্প করে। বলিউডের সিনেমা, বিদেশি টিভি শো থেকে ফর্মুলা ওয়ান-এর ফোটোশুট অবধি নানা ক্ষেত্রে পর্দায় এই ধাপ-কুয়োকে দেখা গিয়েছে বহুবার। মানুষের কাছে এই ধাপ-কুয়ো অগ্রসেন কি বাওলি নামে পরিচিত।

দিল্লি-র কনট প্লেসের নাম শুনলেই মানুষের মনে আসবে নামী-দামি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন জিনিসের দোকান, ঝাঁ-চকচকে উঁচু উঁচু বাড়ি। যদিও এই আধুনিকতার মোড়কের আড়ালে চুপিসারে দাঁড়িয়ে রয়েছে 'অগ্রসেন কি বাওলি' নামে এই ধাপ-কুয়ো। 'বাওলি' শব্দ কিন্তু বাঙালির মুখে মুখে ঘোরা 'বাওয়ালি' শব্দের সঙ্গে কোনও ভাবেই যুক্ত নয়। বাওলি মানে ধাপ-কুয়ো। ধাপ-কুয়োর অস্তিত্ব সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই রয়েছে। ধাপ-কুয়ো আসলে এক ধরনের জলাধার, যার তিনদিক আবদ্ধ এবং একদিকে পরপর সিঁড়ি গভীর জলের মধ্যে নেমে গিয়েছে। যারা কোনও দিন ধাপ-কুয়ো দেখেনি, তাদের কাছে এই জলাধার অনেকটা পাতকুয়ো এবং বাঁধানো ঘাটযুক্ত পুকুরের মিশ্রণ মনে হতে পারে। যদিও এই ক্ষেত্রে সিঁড়ি ছাড়া বাকি তিনটে আবদ্ধ দিকের বিভিন্ন রকমের কারুকার্য এবং বসার জায়গা ওপরের প্রথম সিঁড়ি থেকে গভীর জলের মধ্যে অনেকটা অবধি বিস্তৃত রয়েছে। গভীরতার ক্ষেত্রে সাধারণ পুকুরের থেকে ধাপ-কুয়ো অনেক বেশি গভীর হয়। অগ্রসেন কি বাওলি নামে পরিচিত এই ধাপ-কুয়োতে একশোর বেশি সিঁড়ি রয়েছে। এই সংখ্যা থেকেই কুয়োর গভীরতা সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়। যদিও ধাপ-কুয়োতে কখনওই ওপরের প্রথম সিঁড়ি থেকে জল থাকে না; বরং মোট সিঁড়ির প্রায় অর্ধেক অথবা তার বেশি কখনও কখনও জলের ওপরে থাকে। দিল্লি এবং সমগ্র উত্তর পশ্চিম ভারতে বহু ধাপ-কুয়ো দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত, এইসব এলাকায় বৃষ্টির অভাব দেখা দিলে জলের কষ্ট থেকে বাঁচতে এই ধাপ কুয়োগুলি তৈরি করা হয়েছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তিলোত্তমা কলকাতাকে নাকি বলা হত 'ব্ল্যাক টাউন'! নেপথ্যে কোন কারণ

The Black Town: ১৮৪৫ সালে গভর্নর এক কমিটি বসিয়েছিলেন শহরের অবস্থা সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য। তাঁরা জানিয়েছিলেন, ব্ল্যাক টাউনে নাকে রুমাল গুঁজে পায়ে হেঁটে চলতে হয়েছে তাঁদের।

অগ্রসেন কি বাওলি-র নামকরণের পিছনে প্রধানত দুটো কাহিনি রয়েছে। প্রথম কাহিনি অনুসারে মহাভারতের সময়কালে সূর্যবংশের রাজা অগ্রসেন (মতান্তরে উগ্রসেন) এই ধাপ-কুয়ো নির্মাণ করিয়েছিলেন। তিনি অগ্র (মতান্তরে অগ্রহ) রাজ্য স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে চতুর্দশ শতাব্দীতে ওই এলাকায় বসবাসকারী আগরওয়াল সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই ধাপ-কুয়োর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয় কাহিনী অনুযায়ী চতুর্দশ শতাব্দীতে নিকটবর্তী এলাকায় বসবাসকারী আগরওয়াল সম্প্রদায়ের মানুষরাই এই কুয়োর নির্মাণ এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন। এই ধাপ-কুয়োর বর্তমান স্থাপত্যের সঙ্গে চতুর্দশ শতাব্দীর অন্যান্য স্থাপত্যের অনেক মিল পাওয়া যায়। যদিও অগ্রসেন আসলে মহাভারতের সময়কালের কোনও রাজা না কি আগরওয়াল সম্প্রদায়ের কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তি, সেই নিয়ে আজও মতভেদ রয়ে গিয়েছে।

অগ্রসেন কি বাওলি নিয়ে মানুষের মধ্যে যেসব গল্প ছড়িয়ে পড়েছে, তার মধ্যে প্রায় সব গল্পই অশরীরী-সংক্রান্ত। বলা হয়, এই কুয়োর কালো জল একাকী মানুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করত। বহু মানুষ সেই আকর্ষণ উপেক্ষা না করে জলে ঝাঁপ দিত। জলে ঝাঁপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হতো এবং মৃত্যুর সংবাদ জানাতেই যেন সেই কালো জল লালচে কালো বর্ণ ধরে সিঁড়িতে ছড়িয়ে পড়ত। যদিও এই ঘটনার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিভিন্ন নথিপত্র ঘাঁটলে কেবলমাত্র একটি আত্মহত্যার ঘটনা জানা যায়। যদিও সেই আত্মহত্যার সঙ্গে কোনও অশরীরী যোগসাজশের কথা জানা যায় না। সেই কালো জল না-থাকার কারণে একদিকে যেমন কোনও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি, অন্যদিকে সেই জলের সঙ্গে কোনও অশরীরী যোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বহু মানুষ এই ধাপ-কুয়োতে ঘুরতে এসে বলেন যে, তাদের মনে হয়, কেউ তাদের পিছু নিয়েছে।

এই ধরনের ঘটনার খুব সহজ একটা কারণ থাকতে পারে। একশোর বেশি সিঁড়ি এবং আশপাশের ফাঁকা অথচ বদ্ধ প্রকোষ্ঠ থাকায় অনেক সময় মানুষের নিজের পায়ের আওয়াজের প্রতিধ্বনি হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় শান্ত পরিবেশে হঠাৎ পায়রার ডাক অথবা বাদুড়ের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ এবং এই পরিস্থিতিতে ধাপ-কুয়োর অশরীরী সংক্রান্ত কোনও ঘটনা মনে এলে নিজের পিছনে কারও থাকার কথা মনে হতে পারে। যদিও বহু মানুষ রোজ সকাল ন'টা থেকে বিকেল পাঁচটার মধ্যে এই ধাপ কুয়োতে ঘুরতে আসে এবং তাদের মধ্যে বহু মানুষ কোনওরকম ভয়াল অভিজ্ঞতা ছাড়াই এখানে সময় কাটাতে পারে। কুয়োর এই সিঁড়িগুলোতে বহু সিনেমার শুটিং হয়েছে। আমির খান, সুশান্ত সিং রাজপুত এবং অনুষ্কা শর্মা অভিনীত 'পিকে' সিনেমায় আমির খানের অভিনীত চরিত্রটি বলে যে, সে এই ধাপকুয়োতে রাতে থাকে। সলমন খান, রণদীপ হুডা, অনুষ্কা শর্মা-অভিনীত 'সুলতান' সিনেমায় একটি গানের দৃশ্যে সলমন খান এবং রণদীপ হুডার অভিনীত চরিত্রদু'টিকে এই কুয়োর সিঁড়িতে দেখা যায়।

মানুষের মধ্যে এই ধাপ-কুয়োর নামকরণ থেকে কুয়োর জলের মতো রহস্য ঘিরে বহু গল্প থাকলেও আর্কিওলজিক‍্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র তত্ত্বাবধানে থাকা এই ধাপ-কুয়োর আকার থেকে স্থাপত্য মানুষের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

তথ্য ঋণ: দিল্লি ট্যুরিজম, থার্ড আই ট্রাভেলার

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।