অত্যাচারীদের যম, গরিবের ভগবান || বাংলার এই ডাকাতকে নিয়ে প্রচলিত যে কিংবদন্তি

অত্যাচারী জমিদার-মহাজনদের ত্রাস হয়ে ওঠে রঘু। শুধু নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়াই নয়, ছোটবড় যে-কোনও শোষণযন্ত্রের কাছেই রঘু ডাকাত ছিল মূর্তিমান যম।

tiasa gupta
৪ মিনিট
অত্যাচারীদের যম, গরিবের ভগবান || বাংলার এই ডাকাতকে নিয়ে প্রচলিত যে কিংবদন্তি

হাতে লাঠি, মাথায় ঝাকড়া চুল

কানে তাদের গোঁজা জবার ফুল।

আমি বলি, ‘দাঁড়া, খবরদার!

এক পা আগে আসিস যদি আর-

এই চেয়ে দেখ আমার তলোয়ার...

একটা সময় রাত নামলেই বাংলার আনাচকানাচে নেমে আসত ডাকাতের ভয়। ডাকাতদের এরকম চেহারার বর্ণনা পাওয়া যায় কাব্যে-সাহিত্যে। সেকালের ডাকাতদের বেশ একটা নায়কোচিত ব্যাপার ছিল। বাড়ির গৃহকর্তাকে আগাম চিঠি পাঠিয়ে, নরবলি দিয়ে, কালীপুজো করে, মাথায় লাল ফেট্টি বেঁধে, কপালে রক্তবর্ণের তিলক এঁকে, রণপা চড়ে, সদলবলে ডাকাতি করতে আসত তারা।

দেড়শো-দুশো বছর আগের কথা। সেই যুগে বাংলার বেশিরভাগ এলাকা ছিল বন-জঙ্গলে ঘেরা। বন্য পশুর ভয় যেমন ছিল, তেমনই ছিল ডাকাতের ভয়। দস্তুরমতো নামকরা, দাপুটে ডাকাতরা ছিল সেই আমলে। তাদের ভয়ে যে সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে থাকতেন তা নয়, ব্রিটিশ সরকার রীতিমতো অস্থির হয়ে থাকতেন ডাকাতির উপদ্রবে। বাংলা সাহিত্যে এ-বিষয়ে দু'টি বিখ্যাত বই আছে। দু'টি বইয়ের নামই 'বাংলার ডাকাত’। একটির লেখক খগেন্দ্রনাথ মিত্র। অপরটির লেখক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত।

বাংলার বিখ্যাত (না কি কুখ্যাত!) ডাকাতরা কিংবদন্তি হয়ে আছে। ডাকাতকুলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত, নিন্দিত এবং নন্দিত 'রঘু ডাকাত’। তাঁকে নিয়ে বাংলার জনমানসে অসংখ্য মিথ। যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত রঘু ওরফে রোঘো ডাকাত সম্পর্কে লিখছেন, "রঘু ডাকাতের নামে লোকে এক সময়ে ভয়ে ভয়ে দিন কাটাইত। রঘু ডাকাতের বাড়ি কোথায় ছিল, কেহ ঠিক করিয়া বলিতে পারিত না। কেহ বলিত নদীয়া জেলায়, কেহ বলিত হুগলী, কেহ বলিত চন্দননগর।… রঘুর এভাবে থাকিবার প্রধান কারণ ছিল ধরা পড়িবার ভয়।… গভর্নমেন্ট সে-সময়ে রঘু ডাকাতকে ধরিবার জন্য অনেক টাকা পুরস্কার ঘোষণা করিয়াছিলেন।”

গল্পগাছা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সিঙ্গুরের ডাকাত কালী, ৫৫০ বছর পেরিয়ে আজও জেগে আছে ভয়াল এক ইতিহাস

Singur Dakat kali: পরদিন সকালে এলাকার মানুষজন মন্দিরের সামনে এসে  দেখলেন রক্তারক্তি কাণ্ড। সারি সারি ডাকাতের মৃতদেহ পড়ে মন্দিরের চাতালে।

কথিত আছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে বাগহাটির জয়পুরের বাসিন্দা বিধুভূষণ ঘোষ ও তার ভাই রঘু ঘোষ ঘন জঙ্গলের মধ্যে হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের মায়ের মূর্তি স্থাপন করে। দিনের বেলায় দুই ভাই দিনমজুরের কাজ করলেও রাতে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়িতে ডাকাতি করত। ডাকাতি করে আনা জিনিসপত্র এলাকার গরিব মানুষের মধ্যে বিলি করত। কিংবদন্তি আছে, কারও বাড়িতে ডাকাতি করার আগে রঘু ডাকাত চিঠি দিয়ে বাড়ির গৃহকর্তাকে জানিয়ে দিত। সন্ধের পর পুরোহিতকে ডেকে এনে ঢাকঢোল বাজিয়ে নরবলি ও ল্যাটা মাছের পুজো দিত। তারপর মহাপ্রসাদ খেয়ে ডাকাতি করতে বের হত।

ডাকাত দলের ভয়ে দুপুরের পর থেকে রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত না। শোনা যায়, সাধক কবি রামপ্রসাদ কোনও এক সময়ে এই রাস্তা ধরে ত্রিবেণী ফেরিঘাটে ফিরছিলেন। ওই সময়ে রঘু ডাকাতের দলবল তাঁকে নরবলি দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখে। রাতে রামপ্রসাদকে বলি দেওয়ার জন্য সমস্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলার পর ঘটে অদ্ভুত ঘটনা। বলি দেওয়ার আগের মুহূর্তে রামপ্রসাদ মাকে একটি গান শোনানোর আর্জি করেন। সেই আর্জি মেনে রঘু ডাকাত গান শোনানোর অনুমতি দিলে রামপ্রসাদ ‘তিলেক দাঁড়া ওরে শমন বদন ভরে মাকে ডাকি’ বলে একটি গান ধরেন। তারপরেই রঘু ডাকাত বলির হাঁড়িকাঠে রামপ্রসাদের পরিবর্তে মাকে দেখতে পান। এরপর থেকে রঘু ডাকাত বলি বন্ধ করে রামপ্রসাদের সেবার ব্যবস্থা করে। শুধু তাই নয়, পরের দিন সকালে নৌকোয় করে রামপ্রসাদকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে।

লোকমুখে কথিত আছে, রঘু ডাকাত ও তার দলবল কোনও দিন ডাকাতি করতে গিয়ে মহিলাদের ওপর কখনও অত্যাচার করত না। মা সম্বোধন করে গায়ের গয়না ও অলংকার খুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করত। ডাকাতি করে আনা জিনিসপত্র গরিব মানুষকে বিলিয়ে দিত বলে এলাকার মানুষের কাছে রঘু ডাকাত ভগবানের মতো ছিল।

বাংলার রবিনহুড

অত্যাচারী রাজা আর সামন্তপ্রভুদের সর্বস্ব কেড়ে দরিদ্র ভিখিরিদের বিলিয়ে দেওয়াই ছিল ডাকাত রবিনহুডের নেশা। কিন্তু জানেন কী, এই বাংলাদেশের বুকেও একদা দাপিয়ে বেড়াত আর এক 'রবিনহুড'। মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে লুঠতরাজ নয়, দিনে-দুপুরেও তার হা-রে-রে-রে ডাক শুনে ভয়ে রক্ত হিম হয়ে যেত বড়লোক জমিদার আর শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের। ডাকাতি, খুনজখম তো ছিলই, তার পাশাপাশি তিথি মেনে আরাধ্যা দেবীর সামনে নরবলিও চড়াতেন তিনি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার-মহাজনরা তার সামনে দাঁড়িয়ে বলির পাঁঠার মতো ঠকঠক করে কাঁপতেন। বাংলার সেই কিংবদন্তি দস্যুসর্দার রঘু ডাকাত।

ঝাঁকড়া চুল, মাথায় লাল ফেট্টি, কপালে ইয়া তিলক, রক্তজবার মতো চোখ- দল বেঁধে হা-রে-রে-রে করে গৃহস্থের বাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যে যে ‘গ্ল্যামার’ অনেক বেশি, সেকথা অস্বীকার করা যাবে না। রঘু ডাকাত বাংলার সেই ‘টিপিক্যাল’ ডাকাতদের এক চূড়ান্ত প্রতিনিধি।

নীলকর সাহেবদের ত্রাস

শোনা যায়, রঘু ডাকাতের বাবাও ছিলেন একজন সাধারণ চাষি। নীল চাষে রাজি না হওয়ায় নীলকরের পেয়াদা এক রাতে তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। সাহেবকুঠিতে ভয়ংকর অত্যাচারে অসহায়ভাবে মারা যান রঘুর বাবা।

বাবার এই নির্যাতন আর অন্যায় মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি তরুণ রঘু। এই হত্যার বদলা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। ছেলেবেলা থেকেই লাঠিখেলায় বেশ পোক্ত ছিলেন রঘু। নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের সামনে সেই লাঠিকেই অস্ত্র হিসেবে তুলে নিলেন তিনি। তাঁর পাশে এসে দাঁড়াল একরোখা আরও একদল মানুষ। গড়ে উঠল লাঠিয়াল-বাহিনী। যাদের প্রথম কাজই ছিল, নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।

দলবল নিয়ে একের পর এক নীলকুঠিতে চড়াও হয় রঘু ঘোষ। লুটপাট চালায়, জ্বালিয়ে দেয় নীলকরদের ঘরবাড়ি। ধীরে ধীরে এলাকার অত্যাচারী জমিদার-মহাজনদের ত্রাস হয়ে ওঠে রঘু। শুধু নীলকরদের অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়াই নয়, ছোটবড় যে-কোনও শোষণযন্ত্রের কাছেই রঘু ডাকাত ছিল মূর্তিমান যম। তাই আজও রঘু ডাকাত মানেই সেই আমলের বাংলার শাসকের যম, শোষিতের রোবিনহুড। তাকে নিয়ে বাংলায় নির্মিত হচ্ছে একটি সিনেমাও। তারকা দেব থাকছেন নামভূমিকায়, পরিচালনায় ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়। সব ঠিক থাকলে এই বছরের দুর্গাপুজোর সময় মুক্তি পাবে এই ছবি।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।