একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামের আখড়া, আজ কলকাতার রাজপথে অবহেলিত হয়ে দাঁড়িয়ে এই বাড়ি

৪৮ নম্বর বিধান সরণির বাড়িটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুঃখের বিষয় হলো এই যে, এত বড় কর্মকাণ্ডর সঙ্গে জড়িত বাড়িটা মানুষের কাছে সেইরকম গুরুত্ব এবং সন্মান পায়নি, যা তার প্রাপ্য ছিল।

Raktim Dey
৩ মিনিট
একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামের আখড়া, আজ কলকাতার রাজপথে অবহেলিত হয়ে দাঁড়িয়ে এই বাড়ি

স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের বহু অধ্যায় ইতিহাসের পাতায় শুধু কয়েকটা লাইন হয়েই রয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তাদের আখড়ার বহু অজানা ইতিহাস আমাদের চোখের সামনে রয়েছে। সাধারণ মানুষের অবহেলা সহ্য করে তারা আমাদের চারপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের অবদান আমরা কয়েকটা লাইন লিখে এবং ইতিহাস বইতে পড়ে শান্তি পেলেও তাদের বহু অজানা গল্প শুনতে চাই না।

১৯০২ সালে কলকাতায় গড়ে উঠেছিল অনুশীলন সমিতি। প্রমথনাথ মিত্র, ঋষি অরবিন্দ ঘোষ এবং বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এই সমিতির গঠন, প্রসার এবং কার্যকলাপে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ এবং সাধারণ মানুষের জন্য অনুশীলন সমিতি শরীরচর্চার কেন্দ্র ছিল। যদিও শরীরচর্চার কেন্দ্রের আড়ালে এই সমিতি হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ-বিরোধী সহিংস আন্দোলনে জড়িত বিপ্লবীদের সংগঠন। সময়ের সঙ্গে অবিভক্ত বাংলায় বিভিন্ন এলাকায় অনুশীলন সমিতি নিজেদের শাখা ছড়াতে শুরু করেছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকার অনুশীলন সমিতি। স্কুলশিক্ষক পুলিনবিহারী দাস এই শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯০৬ সালে অনুশীলন সমিতির বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এবং অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য 'যুগান্তর' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। এই পত্রিকার মূল কাজ ছিল, অনুশীলন সমিতির চিন্তাধারা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা। এই পত্রিকায় লেখার কারণে বহু বিপ্লবী গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে 'যুগান্তর' নামে বিপ্লবীদের একটি সংগঠন তৈরি হয়, যাঁরা সহিংস আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আত্মহত্যা না খুন? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও রহস্যে মোড়া প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যু

প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেছিলেন- প্রচলিত এই কথাটি আজও কি বিনা সংশয়ে মেনে নেবে দেশ? তাঁর দেহে হত্যার লক্ষণই প্রকট। সঙ্গে নির্যাতন।

১৯০৭ সাল থেকে অনুশীলন সমিতি বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশদের ওপর আক্রমণ শুরু করেছিল। সেই বছর ডিসেম্বর মাসে তিনটি ঘটনার ফলে অনুশীলন সমিতি ব্রিটিশদের কালোতালিকাভুক্ত হয়। ৬ ডিসেম্বর বঙ্গভঙ্গের ফলে তৈরি হওয়া নতুন পূর্ববঙ্গ এবং আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের ট্রেনে হামলার প্রচেষ্টা, ২৩ ডিসেম্বর ঢাকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যার পরিকল্পনা এবং ৩০ ডিসেম্বর কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা। এক মাসের মধ্যেই তিনবার ব্রিটিশদের ওপর আক্রমণ তারা সহজে মেনে নিতে পারেনি। হাওড়া ব্রিজের কাছে গঙ্গার ধারে কুস্তির আখড়া অথবা কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের একটা শরীরচর্চার কেন্দ্র থেকে যে আসলে ক্ষুদিরাম বসু অথবা প্রফুল্ল চাকী বেরিয়ে আসতে পারেন, সেই কথা হয়তো ব্রিটিশরা ভাবতে পারেনি। তাদের প্রিয় কলকাতায় এইরকম এক সহিংস আন্দোলনের সমিতির সূচনা এবং মাছ-ভাত খেয়ে মৌখিক বিরোধিতা করা মানুষগুলো হঠাৎ বন্দুক, বোমা নিয়ে তাদের ওপর হামলা করছে দেখে ব্রিটিশরা যে খুশি হতে পারেনি, সেটা বলাই বাহুল্য। নিজেদের ওপর আক্রমণ হতেই ধরপাকড় শুরু হয়েছিল। সেই সূত্র ধরেই ব্রিটিশরা মুরারিপুকুরের কাছে এক বাগানবাড়িতে বোমা তৈরির কারখানার হদিশ পেয়েছিল। এই ঘটনার ফলে শুরু হয় বিখ্যাত আলিপুর বোমার মামলা।

আলিপুর বোমা মামলার ফলে কলকাতায় অনুশীলন সমিতির কার্যকলাপ কিছুটা থমকে যায়। পুলিশ গুপ্তচর সমিতির সদস্যদের ওপর নজর রাখতে শুরু করেছিল। সেই সময়ে শিরোনামে উঠে এসেছিল ঢাকার অনুশীলন সমিতি। অনুশীলন সমিতি বিভিন্ন জায়গায় থাকলেও তারা নিজেদের মধ্যে স্বতন্ত্র ছিল। যদিও তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। কথিত আছে যে, কলকাতায় অনুশীলন সমিতি পুলিনবিহারী দাসকে আশ্রয় দিত। বহুবার বিভিন্ন সমিতির একসঙ্গে তৈরি করা পরিকল্পনার কথা জানা যায়। পুলিনবিহারী দাস এবং ভূপেশচন্দ্র নাগ ঢাকার অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠা এবং প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়েছিলেন। তাদের পরে ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী এবং প্রতুলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় অনুশীলন সমিতি গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৯৩২ সালের মধ্যে ঢাকা এবং তার আশপাশের এলাকায় পাঁচশোর কাছাকাছি অনুশীলন সমিতি গড়ে উঠেছিল। যুগান্তর এবং ঢাকা অনুশীলন সমিতির সদস্য ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। তাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ, ইউরোপীয় ক্লাবে হামলা এবং জালালাবাদের লড়াইয়ের কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা রয়েছে। মাস্টারদার মৃত্যুর পরে সমিতির তরফে এই ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমান উত্তর কলকাতার বিধান সরণির একটি বাড়ি থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া অনুশীলন সমিতির কার্যকলাপ চলত। সেই ৪৮ নম্বর বিধান সরণির বাড়িটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুঃখের বিষয় হলো এই যে, এত বড় কর্মকাণ্ডর সঙ্গে জড়িত বাড়িটা মানুষের কাছে সেইরকম গুরুত্ব এবং সন্মান পায়নি, যা তার প্রাপ্য ছিল। তাতে হয়তো তার কিছুই আসে না। হাজার হোক, বিপ্লবীদের আখড়া বলে কথা। বিপ্লবীদের মতোই স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের যোগদানের পরে সে চুপ করেই রয়েছে। সেই চুপ করে দাঁড়িয়ে হয়তো সে তার দেশভাগ এবং স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরের অবস্থা দেখছে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।