শুধু উদ্ভাবন নয়, চাই সমান সুযোগ— অর্থনীতির নোবেল যে বার্তা দিল

Nobel in Economic: ২০২৫ সালের অর্থনীতির নোবেল একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে— উদ্ভাবন অর্থনীতির ইঞ্জিন হতে পারে, কিন্তু সেটি চালানোর জন্য দরকার শিক্ষা, নীতি ও ন্যায়বোধ।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
শুধু উদ্ভাবন নয়, চাই সমান সুযোগ— অর্থনীতির নোবেল যে বার্তা দিল

২০২৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ— ফিলিপ ক্যানিয়ন (Philippe Aghion), পিটার হাউইট (Peter Howitt) এবং জোয়েল মোকির (Joel Mokyr)। প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবন কী ভাবে অর্থনৈতিক বিকাশে সহায়ক হতে পারে তার দিশা দেখিয়েই তিন গবেষক নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এই পুরস্কার এসেছে এমন এক সময়ে, যখন গোটা বিশ্বের অর্থনীতি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মতো বা দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আগামী দিনের অর্থনৈতিক ছবি এখনও পরিষ্কার নয়। কোথায় বিনিয়োগ বাড়বে, কতটা নতুন চাকরি তৈরি হবে, প্রযুক্তির পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে— এসবের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।

আগিওন ও হাউইট তাঁদের গবেষণার ব্যাখ্যা দেখিয়েছেন, অর্থনৈতিক উন্নতি সহজ নয়। এটি অনেকটা ‘মান উন্নয়নের সিঁড়ি’ (quality ladder)-এর মতো। সমাজ ধাপে ধাপে এগোয়— প্রতিযোগিতা, নতুন ভাবনা আর পরিবর্তনের মাধ্যমে। সমাজ তখনই এগোয়, যখন পুরনোকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন চিন্তা সামনে আসে। তবে এই উন্নতির সুফল সবাই সমান ভাবে পায় না। যাদের শিক্ষার সুযোগ বা প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই, তারা স্বাভাবিক ভাবেই তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। ফলে সমাজে বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা বাড়ে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জেন জেডের বিনিয়োগ ঝড়ে বদলাচ্ছে ভারতীয় অর্থনীতি?

GEN-Z's FINANCIAL INFLUENCE AND HABITS: আউটলুক বিজনেস-এর তথ্য বলছে, নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ৫৬.২% ছিল ৩০ বছরের নিচে অর্থাৎ অনভিজ্ঞ বিনিয়োগকারীর অংশীদারিত্ব দ্রুত বাড়ছে।

১৯৯২ সালে ফিলিপ আগিওন এবং পিটার হাউইট একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা উপস্থাপন করেন, যাকে বলা হয় সৃজনশীল ধ্বংস (Creative Destruction)। এর অর্থ হলো, যখন নতুন ও উন্নত পণ্য বাজারে আসে, তখন পুরনো পণ্য বিক্রি করা কোম্পানিগুলির লোকসান হয়। নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে পুরনো সিস্টেম ধীরে ধীরে চলে যায়, আর বাজারে স্থান পায় নতুন শক্তি ও নতুন ব্যবসা।

জোয়েল মোকির দেখিয়েছেন, ইতিহাসে যেসব সমাজে মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন করার অধিকার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিবেশ ছিল, সেখানেই বড় উদ্ভাবন হয়েছে। তাঁর মতে, কেবল প্রযুক্তি থাকলেই চলবে না। সমাজে এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং মুক্ত চিন্তা বিকশিত হতে পারে। উদ্ভাবন টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সরকারের নীতিতেও মুক্ত ভাবনার জায়গা থাকতে হবে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
তাঁর আবিষ্কারেই বিশ্বজয় বিজ্ঞানীদের! কেন নোবেল পেলেন না সত্যেন্দ্রনাথ?

Centenary of Boson Particle: অজানা, অচেনা এক বিজ্ঞানীর কাছ থেকে পত্র পেয়ে আইনস্টাইন বিব্রত হননি, বরং অভিভূত হয়েছিলেন সত্যেন বোসের চিন্তা করার ধরন দেখে

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নতি খুব দ্রুত ঘটছে। কিন্তু এর সুফল সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু কাজ ও আয়ের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। উদ্ভাবন যেমন অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তেমনি যদি তার সঙ্গে সামাজিক ও প্রতিষ্ঠানগত প্রস্তুতি না থাকে, তা নতুন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, চাকরি হারানো, আয়ের বৈষম্য বা মধ্যবিত্তের সংকট।

ভারতের মতো দেশে তথ্যপ্রযুক্তি ও অটোমেশন ক্রমে বাড়ছে। কিন্তু এর ফলে নতুন চাকরির সুযোগ যতটা তৈরি হচ্ছে, তার চেয়ে দ্রুত কমছে প্রচলিত কাজের সংখ্যা। তাই শুধু উদ্ভাবন নয়, দরকার এমন নীতি, যা মানুষকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

এই নোবেল পুরস্কার আবারও মনে করিয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নতি কেবল প্রযুক্তি বা নতুন উদ্ভাবনের উপর নির্ভর করে না। একটি দেশের অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন সমাজের ভিত্তি মজবুত, নিয়ম-কানুন ন্যায়সঙ্গত এবং মানুষ দক্ষ হয়। সরকারের কাজ হবে মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে এগোতে উৎসাহ দেওয়া, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার নয়। শিক্ষায় ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করতে হবে, নতুন কোম্পানি ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে হবে এবং চাকরি হারানো মানুষের জন্য নতুন দক্ষতা শেখার সুযোগ দিতে হবে তবেই আসবে আর্থিক উন্নতি।

২০২৫ সালের অর্থনীতির নোবেল একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে— উদ্ভাবন অর্থনীতির ইঞ্জিন হতে পারে, কিন্তু সেটি চালানোর জন্য দরকার শিক্ষা, নীতি ও ন্যায়বোধ। শুধু পরিবর্তনের দৌড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেই হবে না, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানকেও সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতও করতে হবে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।