সন্ত্রাসের নার্সারি, কাসভকে প্রশিক্ষণ! কেন মুরিদকের মারকাজেই প্রত্যাঘাত ভারতের?

Operation Sindoor Muridke Markaz: মারকাজ-ই-তৈবা নামে পরিচিত লস্কর-ই-তৈবার এই সদর দফতরটি জামাত-উদ-দাওয়ার নামে একটি দাতব্য সংস্থার ছদ্মবেশে পরিচালিত হয়।

inscript
৩ মিনিট
সন্ত্রাসের নার্সারি, কাসভকে প্রশিক্ষণ! কেন মুরিদকের মারকাজেই প্রত্যাঘাত ভারতের?

বুধবার ভোরে অতর্কিতে সামরিক অভিযানে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী বদলা নিল গত ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের সন্ত্রাসী হামলার। পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের নয়টি সন্ত্রাসী-সংশ্লিষ্ট স্থানে হামলা চালাল ভারত। হামলার সময় ও স্থান যে ভারত নিজের ইচ্ছেমতো বেছে নেবে সেই বার্তা আগেই দিয়েছিল দেশ। সেই মতোই চালানো হলো অপারেশন সিঁদুর। তবে এই হামলাগুলি কোথায় চালানো হবে সেই স্থান নির্বাচনের পিছনে রয়েছে ভারতের সুনির্দিষ্ট মতামত। ভারত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রক নিশ্চিত করেছে যে, যে জায়গাগুলিতে হামলা চালানো হয়েছে তার মধ্যে আছে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ এবং লস্কর-ই-তৈবার ব্যবহৃত কিছু আস্তানা। এর মধ্যে সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল নিশানা ছিল পাকিস্তানের পঞ্জাব প্রদেশের লাহোরের কাছে মুরিদকেতে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ চত্বর। মসজিদ ওয়া মারকাজ তৈবা হচ্ছে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈবার মতাদর্শিক এবং স্নায়ু কেন্দ্র।

ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডে লাহোর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, মুরিদকে লস্কর-ই-তৈবার সদর দফতর অবস্থিত। মারকাজ-ই-তৈবা নামে পরিচিত লস্কর-ই-তৈবার এই সদর দফতরটি জামাত-উদ-দাওয়ার নামে একটি দাতব্য সংস্থার ছদ্মবেশে পরিচালিত হয়। ৮২ একর জুড়ে বিস্তৃত এই মসজিদ চত্বরকে পাকিস্তানের 'সন্ত্রাসের নার্সারি" বলা হয়। ভারতীয় ভূমিতে হামলার ষড়যন্ত্র করা এবং বা মদত জোগানোর অভিযোগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজরে ছিল মারকাজ তৈবা মসজিদ চত্বর। কেন এই জায়গাটি এত গুরুত্বপূর্ণ পাক জঙ্গিদের একাংশের কাছে?

১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে আফগান জেহাদকে সমর্থন করার জন্য মারকাজ মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে তখন এর এমন রূপ ছিল না। সোভিয়েতরা পিছু হটার পর, এটি ভারত-বিরোধী অভিযানের ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ৯/১১ হামলার পর পাকিস্তান যখন লস্কর-ই-তৈবাকে নিষিদ্ধ করে, তখন মারকাজকে জামাত-উদ-দাওয়া নামে একটি মাদ্রাসার রূপ দেওয়া হয় কিন্তু, আড়ালে এটি লস্করের লক্ষ্যপূরণই করতে থাকে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদ মারকাজ তৈবা। বলা হয়, আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন এই মসজিদের টাকা পয়সার বেশ খানিকটা জোগান দিতেন। তাঁর মদতে পরিচালিত মারকাজ তৈবা ছিল হাফিজ সাঈদের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী সংগঠন লস্কর-ই-তৈবার কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। এই স্থানে লস্করের প্রচার কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একটি মাদ্রাসা, আবাসিকদের আবাসন এবং ধর্মীয় শিক্ষা, অস্ত্র প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও এখানে আছে হাসপাতাল, অফিস, ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শাখা। যেন শহরের মধ্যে আস্ত এক শহর।

ভারতীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বারবার স্থানীয় এবং বিদেশি দুই ধরনের যুবকদের মৌলবাদী করে তোলার ক্ষেত্রে এই এলাকার ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। বছরে আনুমানিক ১,০০০ শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তি হয়। এই চত্বরে নিযুক্ত হওয়া পুরুষদের জন্য আছে সুফা আকাডেমি। নিযুক্ত মহিলাদের জন্যও একটি পৃথক শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। এটি লস্কর-ই-তৈবার উঁচুতলার নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।

সূত্রের খবর, ২০০৮ সালের মুম্বই হামলায় জড়িত সন্ত্রাসবাদীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মারকাজ ব্যবহার করা হয়েছিল। এদের মধ্যেই ছিল আজমল কাসভ। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নির্দেশনায় গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ (দৌরা-ই-রিব্বাফ) পেয়েছিল কাসভ।

লস্কর-ই-তৈবার জন্মস্থান ছিল আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশ। ১৯৯০ সালের দিকে আল-কায়েদার অর্থ সাহায্যে তৈরি হয় লস্কর।লস্কর-ই-তৈবা স্পষ্ট ভাষায় একটি সালাফি-জিহাদি সংগঠন। এর প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থাৎ জৈশ-ই-মহম্মদ আবার দেওবন্দি মতাদর্শে অনুপ্রাণিত। অনেক জঙ্গি সংগঠনই কাশ্মীরের স্বাধীনতার লক্ষ্যে কাজ করলেও লস্করের লক্ষ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করা। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য লস্কর-ই-তৈবা সহ-প্রতিষ্ঠা করে হাফিজ মুহাম্মদ সাঈদ, জাফর ইকবাল এবং আবদুল্লাহ আজ্জাম। এর মূল গোষ্ঠী, মারকাজ-উদ-দাওয়া-ওয়াল-ইরশাদ (MDI), ছিল একটি সুন্নি মিশনারি সংগঠন যা ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলামের সবচেয়ে গোঁড়া রূপ সালাফিবাদ প্রচারের জন্য।

এই সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীটি জম্মু ও কাশ্মীরে ফিঁদায়ে হামলার মতলব নিয়ে আসে, অর্থাৎ অভীষ্টের লক্ষ্যে আত্মঘাতী হামলা। ১৯৯৩ সালে, লস্কর-ই-তৈবার সন্ত্রাসীরা আইএসআই এবং উপত্যকার বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলির সাহায্যে ভারতে প্রবেশ করতে শুরু করে। ১৯৯৬ সালে ১৬ জন হিন্দুকে হত্যা করেছিল এই গোষ্ঠী।

নয়াদিল্লির দাবি, মুরিদকেতে হামলা পহেলগাঁওয়ে পর্যটন কেন্দ্র বৈসরনে হামলার এক যথাযোগ্য প্রতিশোধ। লস্কর-ই-তৈবার ছায়া সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট পহেলগাঁও হামলার দায় স্বীকার করেছিল। ফলে লস্করের এই ঘাঁটিতে আক্রমণ ছিল ভারতের কাছে অত্যাবশ্যিক। মারকাজকে লক্ষ্য করে এই হামলা লস্কর-ই-তৈবার সন্ত্রাসবাদকেই এক মোক্ষম জবাব দেওয়া।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।