নাইটক্লাবে রাহুলের ছবিকে হাতিয়ার করে কী আড়াল করছে বিজেপি?

pampii adhikari
৪ মিনিট
নাইটক্লাবে রাহুলের ছবিকে হাতিয়ার করে কী আড়াল করছে বিজেপি?

পারিবারিক ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, এর বাইরে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা এখনও গড়ে তুলতে পারেননি তিনি। প্রতিপক্ষ হিসেবে ইদানীংকালে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না। তার পরেও উত্তম, মধ্যম, অধমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বারবার উঠে আসে তাঁর নাম। কংগ্রেস (Congress) সাংসদ রাহুল গান্ধীকে (Rahul Gandhi) নিয়ে সেই রীতিই বজায় রাখল শাসক দল বিজেপি (BJP)। মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় কাবু অর্থনীতির পরিবর্তে নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে যখন বিদেশ সফরকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠছে, সেই সময় ফের একবার রাহুলের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’ এবং ‘অক্ষমতা’-র আখ্যানই তুলে ধরতে দেখা গেল বিজেপি-কে।

মোদির বিদেশ সফর নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই দিল্লিতে রাহুলের অনুপস্থিতি নিয়ে আগেই প্রশ্নবাণ দেগে রেখেছিল বিজেপি। কিন্তু আক্রমণের তীব্রতা বাড়ানোর জুতসই রসদ মিলছিল না কিছুতেই। পদমর্যাদা সার্থক করে মঙ্গলবার সেই কাজটি করে দেখান দলের আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্য। একেবারে টাটকা ভিডিও তুলে এনে চোখে আঙুল দিযে দেখিয়ে দেন, প্রাধনমন্ত্রীর বিদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন তুলছে যে কংগ্রেস, তাদের নেতা নিজে নেপালের নাইট ক্লাবে নৈশযাপনে মগ্ন। মালব্য যে একেবারে সঠিক জায়গায় আঘাত হেনেছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ তাতেই পড়িমড়ি করে ড্যামেজ কন্ট্রোলে ছুটে আসতে হয় কংগ্রেস নেতৃত্বকে। বিজেপি-র অভিযোগ, অস্তিত্ব সংকটে মধ্যে দলকে ফেলে রেখে ফূর্তি করছেন রাহুল। যদিও কংগ্রেস নেতৃত্ব জানিয়েছেন, বন্ধুর বিয়েতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছেন রাহুল।

রাহুলের হয়ে সাফাই দিতে গিয়ে ২০১৫ সালে মোদির পাকিস্তান সফর এবং তার পরবর্তী পাঠানকোট হামলার প্রসঙ্গও টেনে আনেন তাঁরা। তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ের বিয়েতে মোদির হাজির হওয়াকে কটাক্ষ করে কংগ্রেস নেতৃত্ব যুক্তি দেন যে, আমন্ত্রণ ছাড়াই শরিফের বাড়িতে কেক কাটতে গিয়েছিলেন মোদি। রাহুল তা করেননি। আমন্ত্রণ পেয়ে বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়েছেন। তাই রাহুলের নেপাল সফল মোদির পাক সফরের থেকে কম সাংঘাতিক বলে বিবৃতি দেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। এরপরেই দু’পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

একদিকে, মোদির পাক সফর কূটনৈতিক প্রকৌশল, রাহুলের নৈশযাপন তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, পাশ্চাত্যপ্রীতির পরিচয় বলে আক্রমণ শানাতে থাকেন বিজেপি নেতৃত্ব এবং দলের সুবিশাল সোশ্যাল মিডিয়া ফৌজ। তার মোকাবিলায় তরল পানীয় হাতে অটলবিহারী বাজপেয়ী, মোদির প্রাক্তন মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরের ছবি তুলে ধরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন তুলে ধরতে দেখা যায় বিজেপি-র একচ্ছত্র আধিপত্যের সামনে টিমটিম করতে জ্বলতে থাকা কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া টিম এবং গুটিকয়েক আঞ্চলিক নেতাকে।

ভিডিওতে রাহুলের সঙ্গে থাকা তরুণীর পরিচয় নিয়েও শুরু হয় আকচাআকচি। রাহুলকে ‘দেশদ্রোহী’ প্রমাণে নাইটক্লাবে তাঁর সঙ্গিনী তরুণীর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে গেরুয়া শিবির। তিনি কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত, ভারতের বিরুদ্ধে নেপালকে উস্কানি দেওয়ায় যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করে তারা। তাই ওই তরুণীর সঙ্গে রাহুলের কী সম্পর্ক, তা খতিয়ে দেখতে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিও তোলা হয়। যদিও সত্যতা যাচাইয়ে উঠে আসে যে, দিল্লিতে মোতায়েন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর সাংবাদিক সুমনিমা উদাস রাহুলের বান্ধবী। তাঁর বিয়েতেই নিমন্ত্রণ গিয়েছেন রাহুল।

সুমনিমা আবার মায়ানমারে নেপালের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভীম উদাসের কন্যা। ভিডিওর ওই তরুণী সুমনিমার বান্ধবী। নিমা মার্টিন শেরপার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন সুমনিমা। বিবাহপূর্ব অনুষ্ঠান থেকে ৩ মে বিয়ের অনুষ্ঠান এবং ৫ মে রিসেপশন পর্যন্ত নিমন্ত্রিত রাহুল। শুধু তাই নয়, কাঠমান্ডুর ওই নাইটক্লাবে বর-কনের তরফে সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, রাহুল সেখানে আধঘণ্টামতোই ছিলেন, কোনও চিনা রাষ্ট্রদূত বা প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না বলে বিবৃতি দিতে হয় সেখানকার কর্তৃপক্ষকেও।

তাই বান্ধবীর বিয়েতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়া আদৌ অপরাধ কি না, প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। সংখ্যালঘু হলেও, রাহুলের সমর্থনে সোশ্যাল মিডিয়ায় এগিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের। রাজনীতি করেন বলে কি রাহুলের ব্যক্তিগত জীবন নেই, প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। কিন্তু এখানেই আরও একটি প্রশ্ন উঠে আসছে। তা হল, যে নেহরু-গাঁধী পরিবারের সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে রয়েছেন রাহুল, দেশের প্রাচীনতম যে রাজনৈতিক দলের অলিখিত সর্ব্বেসর্বা তিনি, তার গরিমা রক্ষার কি কোনও দায় নেই তাঁর!

একের পর এক রাজ্যে জমি হারাতে হারাতে একেবারে কিনারায় এসে পৌঁছেছে কংগ্রেস। নির্বাচনী রাজনীতিতে মারকাটারি রেকর্ড সত্ত্বেও কংগ্রেসকে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিতে চাননি প্রশান্ত কিশোর। এই আবহে মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকে নেতা সকলকে আশ্বাস জোগাবেন, তৃণমূল স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে মাঠঘাট চষে ফেলবেন, সাধারণত এমনটাই কাম্য রাজনীতিকদের কাছ থেকে। কিন্তু কয়েক দশক রাজনীতিতে কাটালেও, জীবনের ৫০টি বসন্ত পার করলেও, রাহুল আদৌ রাজনীতিক হতে পেরেছেন কি না, বর্তমান রাজনৈতিক পটচিত্রে তিনি মানানসই কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

ভুল সময়ে, ভুল জায়গায় উপস্থিত থাকার অভ্যাসকে আক্ষরিক অর্থেই শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন রাহুল। নিজের দায়বদ্ধতার প্রতি তাঁর উদাসীনতাকেও এর জন্য দায় করেন অনেকে। তাঁদের মতে, গাঁধী-নেহরু পরিবারে জন্মানোর দায় বইতে হচ্ছে রাহুলকে। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা বজায় রাখতে গিয়ে খাঁচায় বন্দি হয়ে গিয়েছেন তিনি, যা ভেঙে বেরনোর জন্য ছটফট করতে থাকেন। আসলে তিনি উচ্চবিত্ত শ্রেণির সেই মানুষদের মধ্যে পড়েন তিনি, মোটা টাকার কর্পোরেট চাকরি, সপ্তাহান্তে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা-ডিনার, শরীরচর্চা, সময় পেলে ছুটি কাটাতে বেরিয়ে পড়ার জীবনে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন যাঁরা।

রাহুল নিজেও সেই নিয়ে কখনও রাখঢাক করেননি। বরং রাজনীতির প্রতি বরাবরই অনীহা ছিল তাঁর। তাই কেমব্রিজে এমফিল সেরে লন্ডনে একটি ম্যানেজমেন্ট সংস্থায় তিন বছর কাজ করেন তিনি। দেশে ফিরেও প্রথমেই রাজনীতিতে যোগ দিতে ছোটেননি। বরং বাণিজ্যনগরীতে নিজের প্রযুক্তি সংস্থা খুলে বসেন। অর্থাৎ, রাজনীতি বরাবরই তাঁর কাছে অপশন হয়ে থেকেছে। বিজেপি নেতৃত্বও রাজনীতির প্রতি রাহুলের এই উদাসীনতা সম্পর্কে ভালো ভাবেই অবগত। কিন্তু রাহুলকে ছাড়া তাদেরও চলবে না। নিজেদের ভারতীয়ত্ব, সেবাপরায়ণতার প্রমাণ দিতে পরিবারতন্ত্র, পাশ্চাত্য শিক্ষার ফসল রাহুলকে প্রতি পদে প্রয়োজন তাদের। আবার নীতি, আদর্শ এবং পারিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে রাহুলের পক্ষেও রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

লিখেছেন
pampii adhikari
pampii adhikari
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।