সাধারণ ছাত্রনেত্রী থেকে বিজেপির শীর্ষে কীভাবে উত্থান হয়েছিল বিতর্কিত নুপুর শর্মার?

অনেকটা যেন সাপ লুডো খেলা। মইয়ে চড়ে তরতর করে এগোচ্ছিলেন বিজেপি নেত্রী নুপুর শর্মা। হঠাৎ আলটপকা মন্তব্য টিভিতে। তারপর সাপ বেয়ে হুড়হুড়িয়ে নেমে এলেন একেবারে নিচে। উত্থান থেকে যেন একেবারে রসাতলে। মাত্র একটা বিতর্ক। ২৭ মে টিভিতে হজরত মহম্মদকে নিয়ে নুপুরের 'দায়িত্বজ্ঞানহীন’ মন্তব্যে গোটা দেশে আগুন জ্বলেছে। তাঁকে দলের জাতীয় মুখপাত্রর পদ থেকে সরিয়েও বিজেপি সেই আগুন নেভাতে পারেনি। তাঁর গ্রেফতারের দাবিতে আওয়াজ ওঠে দেশের নানা প্রান্তে।

কেমন ছিল উত্থান-পর্ব
দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার আগে পর্যন্ত নুপুর ছিলেন বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের পক্ষে সাফাই গাইতে প্রায়ই তাঁকে দেখা যেত টেলিভিশন বিতর্কে। সেদিনও তেমনটাই হচ্ছিল। হঠাৎ 'আমরা হিন্দু', একথা প্রমাণ করতে নুপুর যেভাবে হজরত মহম্মদ নিয়ে মুসলমানদের আবেগে খোঁচা দিলেন তাতে সাপে সওয়ার হয়ে তাঁকে নেমে আসতে হল অনেকটা।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় নুপুর তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু করেন। সময়টা ২০০৮ সাল। হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-র ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে প্রবেশ করেন রাজনীতিতে।

আরও পড়ুন: নুপুর ইস্যুতে উত্তাল দেশ, বিক্ষোভের আঁচ কতটা গনগনে?

লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনে স্নাতকোত্তর করার পর ২০১১ সালে ভারতে ফিরে আসেন নুপুর। সেই থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে দ্রুত উত্থান।

স্পষ্টভাষী ও সুবক্তা নুপুর ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষায় দারুণ সাবলীল। দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর মতামতের পক্ষে যুক্তিজালে বিরোধীদের ঘায়েল করে বিজেপির কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির মিডিয়া কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে যান, ২০১৩ সালে।

দুই বছর পর নতুন নির্বাচনে আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের বিপক্ষে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন এই নুপুর।

ভোটে কেজরিওয়ালকে হারাতে না পারলেও প্রচারে নুপুরের উদ্দীপনামূলক ভাষণ তাঁকে দলে আরও সামনের সারিতে নিয়ে আসে। দিল্লিতে দলের সরকারি মুখপাত্র নিযুক্ত হন, ২০২০ সালে নুপুর হয়ে যান বিজেপির ‘জাতীয় মুখপাত্র’।

টেলিভিশনে পরিচিত মুখ
দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার হওয়ার আগে পর্যন্ত ৩৭ বছর বয়সি এই আইনজীবী ছিলেন 'বিজেপির সরকারি মুখপাত্র', যিনি ছিলেন দলের উঠতি এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন মুখপাত্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে এবং সরকারের পক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখার জন্য বারবার টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন তিনি।

গত কয়েক বছরে ভারতের টিভি দর্শকদের কাছে অতি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন নুপুর শর্মা। তবে দিনদশেক আগে বিজেপির এই নেত্রীর মন্তব্যের পরেই দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। ওই মন্তব্যর কারণেই উত্তরপ্রদেশে হিংসা ছড়ায় বলে অভিযোগ। সেই ঘটনায় একাধিক লোক জখম হয়েছেন। এরপরেই তাঁকে সাসপেন্ড করে দল। পদ থেকে ছাঁটলেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে ওই নেত্রীর। এদিকে বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য নুপুরের বিরুদ্ধে মহারাষ্ট্র, হায়দরাবাদে একাধিক এফআইআর হয়েছে ইতিমধ্যেই।

কেন পতন?
নুপুর শর্মা হজরত মহম্মদের বিয়ে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার পর থেকেই দেশের নানা প্রান্তে জ্বলে উঠেছে আগুন। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বাংলা, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, ঝাড়খণ্ড- বাদ যায়নি কোনও প্রান্ত। তাঁর বিতর্কিত মন্তব্যর জন্য একাধিক দেশ ভারতের সমালোচনায় যোগ দিয়েছে। অন্তত ১৫টি দেশ এই ইস্যুতে তাদের সমালোচনা জানিয়েছে। ভারতীয় কূটনীতিবিদদের ওইসব দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রক তলব করেছে। ইরাক, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্ক-সহ এক ডজনেরও বেশি মুসলিম রাষ্ট্র এই সমালোচনায় যোগ দিয়েছে। এর মাঝেই আল কায়দা জানিয়েছে, নবীর সম্মানের জন্য লড়াই করতে দিল্লি, মুম্বই, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাতে তারা আত্মঘাতী হামলা চালাবে।

মোদ্দাকথা হলো, নুপুরকে নিয়ে ঘরে-বাইরে বিজেপি হিমশিম খাচ্ছে। নুপুরকে সরিয়ে বিজেপি মোটেই আগুনে জল ঢালতে পারেনি। দায় ঝেড়ে ফেলেও ঘাড় থেকে দায় নামাতে পারেনি। দেশের যা পরিস্থিতি, তাতে আবার কবে নুপুর উত্থানের মুখ দেখবেন, তা হয়তো আগামীতে সাপ লুডো খেলার মতো বিধাতাই উত্তর দিতে পারবেন। কোনও দক্ষ রাজনীতিকও মাথা চুলকে হয়তো এর উত্তর খুঁজে পাবেন না।

জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে বিতর্ক
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দাবি করছে, পবিত্র বারাণসী শহরে এই মসজিদ বানানো হয় ষোড়শ শতাব্দীর এক হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর। তাদের দাবি, মন্দিরটি ১৬৬৯ সালে ধ্বংস করেছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব।

মসজিদের ভেতরে ভিডিওর মাধ্যমে একটি জরিপ চালানোর জন্য আদালতের একটি রায় নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। ওই ভিডিওতে পাথরের একটি স্তম্ভ দেখা যায়। আবেদনকারীরা দাবি করেন, এটি শিবলিঙ্গ (শিবের প্রতীক)। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষ জোর গলায় বলেছিল, এটি একটি জলের ফোয়ারা।

এই বিতর্ক নিয়ে শুনানি চলছে আদালতে। বিষয়টি নিয়ে টিভি চ্যানেলগুলোতে চলছে বিরামহীন বিতর্ক। এসব অনুষ্ঠানে হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতামতের প্রধান ও সোচ্চার বক্তা হয়ে ওঠেন নুপুর শর্মা।

কিন্তু ২৭ মে-র টিভি অনুষ্ঠানে তিনি মহানবীকে কটাক্ষ করে যেসব আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন, তা হজম করা বিজেপির পক্ষেও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিরশ্ছেদের হুমকি
সাংবাদিক মহম্মদ জুবায়ের যখন নুপুরের ওই অবমাননাকর মন্তব্য ট‍্যুইটারে শেয়ার করেন, তখন নুপুর পুলিশকে একটি ট‍্যু‌ইট করেন। সেখানে বলা হয়, "ধর্ষণের হুমকির বার্তা পাচ্ছি। শুধু তা-ই নয়, আমার বোন, মা এবং বাবাকে হত্যা ও শিরশ্ছেদের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।"

জুবায়েরের বিরুদ্ধে নুপুর অভিযোগ তোলেন, "মিথ্যা রটনা চালিয়ে পরিবেশ বিষাক্ত করছেন জুবায়ের, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছেন। আমাকে ও আমার পরিবারকে উদ্দেশ্য করে ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন।"

ট্যুইটে তিনি ট্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপির প্রেসিডেন্ট জেপি নাড্ডা-কেও।

কলেজবেলা থেকেই তরতরিয়ে এগোচ্ছিল তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার গ্রাফ। একটা বিতর্ক ঘাড় ধরে অনেকটা নামিয়ে দিল নুপুরকে। আবার তাঁর ভাগ্যে মই বেয়ে ওঠার সুযোগ আসবে? দেখা যাক।

More Articles

;