রবীন্দ্রনাথ থেকে নেতাজি সুভাষ, উপন্যাসের পাতায় পাতায় ধরা পড়েন এক অন্য রোদ্দুর রায়

অনির্বাণ রায় সম্পর্কে একটি বাক্যে যা বলা যায়, তা হলো: বহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক স্তরের কনশাসনেস সায়েন্সের স্বীকৃত গবেষক ও বক্তা, নেচার অ্যাক্টিভিস্ট ও ইউটিউবার। এহেন অনির্বাণ একটি চরিত্রের ভূমিকায় অভিনয় করে, তার নাম রোদ্দুর রায়। রোদ্দুর একটি ফিকশনাল চরিত্র।

রোদ্দুরকে আমি চিনি একজন ভয়েস অ্যানার্কিস্ট আর্টিস্ট হিসেবে। বেশ কয়েক বছর ধরে ওর শব্দ আর স্বর নিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্টাল ভিডিও দেখে বা শুনে আসছি। যেগুলো দেখে বোঝা যায়, ওর একটি নির্দিষ্ট রাজনীতি আছে, যেটাকে আমার মনে হয় অ্যানার্কিজম। রোদ্দুর অপশব্দ ব্যবহার করে গান গেয়ে এবং পারফর্ম করে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে। এক সময় রোদ্দুর ডিজে-র কাজ করেছে, সে শুধু গিটারিস্ট নয়, গায়ক এবং লেখকও । ২০১৫ সালে রোদ্দুরের একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল, নাম, ‘পরম ক্যাওড়া কাব্যগ্রন্থ’। সেই বইতে ব্যাঙ্গ, খিস্তি ও নানারকম ক্যাওড়ামোর মধ্যে একটি কবিতার অংশ ‘এখনো আমার নিজের কবিতা- বই আধোঘুমে দেয় হঠাৎ হঠাৎ দেখা / এখনো কখনো মিছিলের মেঘ দেখে / মনে পড়ে কোনো পুজো বা ইদের কথা / আমিও সহিনু শতেক যাতনা কতো / সহিতে হইল হাড়গোড় ভাঙা ক্ষত / এখনো তোমার রাস্তা বাড়ির নীচে / মোর কঙ্কাল মোড়া আছে কালো পিচে'। ['কেলিয়ে গিয়েছি ফেঁসে']

রবীন্দ্রনাথের ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’ গানের অন্তরার লাইনটিতে ‘যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে'-র পরে একটি অপশব্দ বসিয়ে গানটি গেয়েছিল ইউটিউবে। সেই গান মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। সেবার তার সমর্থন ও বিরোধিতায় দ্বিধাবিভক্ত ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার জেন-ওয়াইরা। ওই অপশব্দ সহযোগেই খোদ বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথের ওই গানের রোদ্দুর-সংস্করণ গেয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিল কিছু ছাত্রছাত্রী। একই সঙ্গে ওই বছরই বসন্ত উৎসবে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের পিঠে আবির দিয়ে রোদ্দুরের গানের বিতর্কিত লাইনটি লিখেছিল কিছু মেয়ে, সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। এই নিয়ে বিরোধিতা চরমে গিয়েছিল সুশীল সমাজে এবং সম্ভবত সেই সময়ও সাইবার ক্রাইমে রোদ্দুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। এটা ২০২০ সালের মার্চ মাসের ঘটনা।

আরও পড়ুন: আসলে কে এই রোদ্দুর রায়, কেন এই ভূমিকায়! পরিচয় জানলে চমকে উঠতে হবে

ইউটিউবার রোদ্দুর রায় বেশ কয়েক বছর ধরে এই কাজটা করে আসছে, এই মুহূর্তে সেটা ভারতে আর কত জন করছে আমি জানি না, আর বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের কাজ আগে করেছেন হাংরি জেনারেশনের লেখকরা, পরে সুবিমল মিশ্র আর নবারুণ ভট্টাচার্য। প্রসঙ্গত, রোদ্দুর নিজেকে নবারুণ ভট্টাচার্যর ভাবশিষ্য বলে মনে করে। এই যে মেনস্ট্রিম কালচার বা পলিটিক্সকে অনবরত সাবভার্ট করে যাওয়া, এটার একটা সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট ফেলতে রোদ্দুর সক্ষম হয়েছে। এমনকী, তার নিজের নামের বানানটাও সে ‘দ্দূ’ লেখে।

আজ ফেসবুকে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯১ হাজারের মতো‌। রোদ্দুরের কোনও কোনও পোস্টে আমি ১৫০০-র বেশি রিঅ্যাকশনও দেখেছি। ওর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩ লক্ষ ২৮ হাজার। রোদ্দুরের ভিডিওগুলোর কোনও কপিরাইট থাকে না। তার মানে ও কপিলেফট আন্দোলনে বিশ্বাস করে। এই রকম একটা ভার্চুয়াল রিয়‍্যালিটি তৈরি করা সহজ নয়। সবাই যে ওর প্রশংসা করে তা নয়, অনেকেই ওকে খিস্তি করে। আমার ধারণা, ও সেটা এনজয় করে, না করলে ও এই জিনিসটা চালিয়ে যেতে পারত না, ও এক ধরনের সাদো-ম্যাসোকিস্ট প্লেজার ট্রিপে থাকে। রোদ্দুরের দর্শন হল মোক্সাবাদ, সংস্কৃত ‘মোক্ষ’ শব্দ থেকে এসেছে মোক্সা। মোক্ষর অর্থ আত্মার মুক্তি। রোদ্দুরের ভাষায়, ‘আমি বলতে চেয়েছি, মোক্সা হলো স্বাধীনতা। নাগরিক মানুষের জন্য স্বাধীনতা, প্রেম ও শান্তি। আমি একজন সন্তের জীবনযাপন করি। আমি বেশিরভাগ সময় ভাবসমাধিতে থাকি।' রোদ্দুরের দাবি, সে পোস্টমর্ডানিজম, ডিকস্ট্রাকশন ও ভারতীয় অদ্বৈতবাদের মিশ্রণ ঘটিয়েছে তার মোক্সা আর্টে। সে মনোবিজ্ঞানের ওপর একটি বই লিখেছে, নাম ‘অ্যান্ড স্টেলা টার্নস এ মম’। নৃত্যশিল্পী থাঙ্কোমণি কুট্টির সঙ্গে সে লেখক হিসেবে কাজও করেছে।

রোদ্দুরের কথায়, ‘আমি বিশ্বাস করি, শিল্পে এই ভালো আর মন্দের মাঝামাঝি কিছু জায়গা থাকবে। কিছু ফাজি লজিক থাকবে। শিল্প-সাহিত্যে আমি যখন একটা এক্সপ্রেশন নিয়ে আসছি, তখন কোনও সংজ্ঞায় আটকে থাকাটাকে আমি মানি না। সংজ্ঞা থাকা উচিত এক্সপ্রেশনের। কোনও একটা ফ্রেম না থাকলে এক্সপ্রেস করা যায় না। আমি ছোটবেলা থেকে নিজেকে ব্রডকাস্ট করার চেষ্টা করেছি, আমি কোনও মাধ্যম পাইনি, আমি ইউটিউব চ্যানেলের বাণী দেখেছি, সেটা হচ্ছে, ব্রডকাস্ট ইওরসেল্ফ। তো আমি ব্রডকাস্ট করতে শুরু করলাম, এখনও করে যাচ্ছি।'
প্রসঙ্গত রোদ্দুর ২০১২ থেকে ইউটিউবে চ্যানেলে ব্রডকাস্ট করছে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুকুমার– এঁদেরকে সে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে দেখে না। রোদ্দুর বলে, ‘তাঁদের আত্মার যে প্রতিফলন তাঁদের কাজে পড়েছে, সেই কাজগুলো আমাকে স্পর্শ করেছে। আমি এঁদের অসম্ভব ভক্ত। এঁদের কাজের সঙ্গে আমার আত্মাকে আমি জুড়তে পেরেছি। সেই জায়গা থেকে একটা মূল্যবোধ চলে এসেছে। সেটাকে আমি ধরার চেষ্টা করেছি‌।' ব্যক্তিগত আলাপের সূত্রে জানি, রোদ্দুর বাহুল্যবর্জিত সাধারণ জীবনযাপন করে, স্বপাক আহার করে আর নিজেকে নিয়েও ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যায়।

ফিকশানাল চরিত্র তৈরি করার ঐতিহ্য আমাদের বাংলায় সেই উনিশ শতক থেকে আছে। কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম প্যাঁচা’ নামে নকশা লিখতেন তৎকালীন বাংলা কথ্য ভাষায়, এমনটাই ধারণা ইতিহাসবেত্তাদের। সেই নকশায় শহরের মান্যগণ্যদের নাম না করে যথেচ্ছ কুৎসা করা হয়েছে। আবার যখন তিনি কালীপ্রসন্ন সিংহ, তখন তিনি সংস্কৃত পণ্ডিতদের সঙ্গে বসে মহাভারত সম্পাদনা ও অনুবাদ করছেন।

রোদ্দুরের উপন্যাস ‘মোক্সা রেনেসাঁ’ বাঙালির উনিশ শতকী নবজাগরণের একটি অদ্ভুত রসের কল্পঘটনা, যা স্ট্রিম অফ কনশাসনেসের ফর্মে লেখা। এটি উৎসর্গ করা নবারুণ ভট্টাচার্যকে আর এই উপন্যাসের ভূমিকা লিখেছে ফিল্মমেকার কিউ। এটি পড়ার অভিজ্ঞতা আমার কাছে অ্যাসিড ট্রিপের মতো। উপন্যাসের পরিচ্ছদগুলোর নাম বাংলার উনিশ শতকের রেনেসাঁর চরিত্রদের উক্তি বা লেখা থেকে। শুধু উনিশ কেন? বিশ শতকের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জগদীশচন্দ্র এবং আরও অনেকে আছেন। কয়েকটি পরিচ্ছেদের নাম, ১. জানি বন্ধু জানি, তোমার আছে তো হাতখানি [রবীন্দ্রগানের লাইন] ২. মহাশয়, আপনার কি কুলির প্রয়োজন? [বিদ্যাসাগরের সেই বিখ্যাত প্রশ্ন] ৩. হে ভারত! ভুলিও না [বিবেকানন্দের উক্তি], ৪. দাঁড়াও পথিকবর! [মাইকেল মধুসূদনের এপিটাফের লাইন] ৫. নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ [জগদীশচন্দ্র বসুর উক্তি] ইত্যাদি। যে পরিচ্ছদের নাম, ‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কর রে লোপাট’, সেই পরিচ্ছদে বর্তমান সমাজের অন্যায় ও দুর্নীতি দেখে ক্রুদ্ধ নজরুল গভীর রাতে ফেসবুক লাইভে এসে নিজের যাবতীয় ক্রোধ উগরে দেন। এই উপন্যাসে আছেন নিবেদিতা, সারদা, রামকৃষ্ণ, নরেন, বিনোদিনী, গিরিশ, সুভাষ। যদিও এঁরা কেউ স্বনামে নেই, কিন্তু চিনতে অসুবিধে হয় না তাঁদের। উপন্যাসের সুবার্স্ট, কলকাতা বিমানবন্দরে নেমে স্বগতোক্তি করেন, ‘যাক, এই বিমানটা আর বার্স্ট করল না। আরে এয়ারপোর্টটা আমার নামে! শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে নিজের মূর্তি দেখে ক্রোধে ফেটে পড়ে সুবার্স্ট'... ইত্যাদি।

বাঙালির নবজাগরণের আইকনদের নিয়ে এটা একটা সাইকেডেলিক জার্নি। ফ্রয়েডিয়ান ফ্যালাসের প্রতীকী ব্যবহার, টাইম ট্র‍্যাভেলের ছলে বাংলার এক ঝাঁক রেনেসাঁ ব্যক্তিত্বর সঙ্গে প্রোটাগনিস্ট গজেনের এক অলৌকিক যাত্রা। উপন্যাসটিতে এক ধরনের রিপিটেশন আছে, যে রিপিটেশন ইডিএম বা ইলেকট্রনিক ডান্স মিউজিকে আছে, কিন্তু সেই রিপিটেশন শ্রোতাকে বা এখানে পাঠককে একটা ট্রান্সে নিয়ে যায়। আর উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে পাঠক একটা শারীরিক যন্ত্রণাও অনুভব করবেন। রোদ্দুরের গান, লেখা, পারফরম্যান্স তার পাঠক বা দর্শককে স্বস্তি দেয় না। সে বিশ্বাস করে শকিংয়ে, সে মনে করে, এখন আর্টের একমাত্র কাজ শক দেওয়া।

More Articles

;