পাপের পথ থেকে সরিয়ে এনে নৈতিকতার খোঁজ! যে কারণে আবিষ্কার হয়েছিল নাগরদোলা

Roller Coasters: জুয়ো, মদ-নেশার মতো নৈতিক দুর্বলতা ছেঁকে ধরছিল তখনকার মানুষকে। আর সেই সব কিছু থেকে মানুষের মন সরিয়ে আনার জন্য়ই নাকি তৈরি হয়েছিল রোলার কোস্টার।

Sohini Das
৩ মিনিট
পাপের পথ থেকে সরিয়ে এনে নৈতিকতার খোঁজ! যে কারণে আবিষ্কার হয়েছিল নাগরদোলা

জীবন ঘূর্নিপাক। তাতে রং বদলায়, রূপ বদলায়। তবু জীবনকে ওই বার্ডস ভিউ থেকে দেখতে মন্দ লাগে না। আম-জীবনে আদতে এক নস্টালজিয়ার নাম নাগরদোলা। ছোটবেলার মেলার মাঠে কাঠের ছোটো নাগরদোলায় চড়া ছিল এক অনাবিল আনন্দের নাম। তার পরে একটু বড় হয়ে ইলেকট্রিক নাগরদোলা। সেখান থেকে বিনোদন পার্কের রোলার কোস্টার। সলিল চৌধুরি দেখেছিলেন, ঘুরন্ত নাগরদোলার দুরন্ত ঘূর্ণি কীভাবে কখনও কাঁদায়, কখনও ভোলায়। আরও পরে আধুনিক গায়ক শিলাজিৎ গাইলেন, 'নাগরদোলা দিচ্ছে পাক, পাকের তালে ঘুরতে থাক...' ঘুরতে ঘুরতে পোড়ার কথা বললেন গায়ক। আসলেই কি নাগরদোলা পোড়ায়? শূন্যে তুলে মুহূর্তে দিকভুল, ঠিকভুলকে চিনিয়ে দেওয়াই যার স্বভাব, সে-ও কি পোড়ায়। কিন্তু ইতিহাস বলছে অন্য কথা। নাগরদোলা, যা এখন নাকি শুধুমাত্র বিনোদনপার্কের অতি পরিচিত 'রাইড' বা মেলার আকর্ষণ হিসেবেই পরিচিত, সেই নাগরদোলা এককালে মানুষের জীবনকে নতুন দিশা দেখাত। যা 'জ্বলন্ত রৌরব'-র শাস্তি থেকে এককালে বাঁচিয়ে এনেছে অসংখ্য মার্কিনকে।

প্রায় সমস্ত সংস্কৃতিতেই পাপের ধারণা যেমন ছিল, পাপস্খলনের রাস্তাও ছিল। যাকে বলে প্রায়ঃশ্চিত্য। উনিশ শতক পরবর্তী সময়ে নাকি এই রোলারকোস্টার ছিল পাপবোধ থেকে নিস্তার পাওয়ার একটি নতুন মাধ্যম। উনিশ শতকের শেষের দিকটা ছিস সার্বিক ভাবে বদলের সময়। আমেরিকার সভ্যতা, সংস্কৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল সে সময়। সভ্যতার সঙ্গে ডাল-পালা বিস্তার করছিল মানবিক অবক্ষয়। জুয়ো, মদ-নেশার মতো নৈতিক দুর্বলতা ছেঁকে ধরছিল তখনকার মানুষকে। আর সেই সব কিছু থেকে মানুষের মন সরিয়ে আনার জন্য়ই নাকি তৈরি হয়েছিল রোলার কোস্টার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অটূট সম্পর্কের টানে গাছে পরানো হয় তালা, যে কারণে বিখ্যাত রাশিয়ার প্যাডলক ট্রি পার্ক

Padlock Trees Park, Russia: সম্পর্ক যাতে চিরকালীন হয়, তার জন্যে সম্পর্কে রীতিমতো তালাচাবি মেরে তাকে ফেলে আসেন এক আশ্চর্য গাছের কাছে।

লামার্কাস অ্যাডনা থম্পসন। রোলার কোস্টারের ভাবনার নেপথ্যে ছিলেন মার্কিন এই ব্যবসায়ী। নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দায়ী নানা ধরনের বিনোদনের হাত থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে নতুন এক ধরনের বিনোদনের হদিস দিলেন থম্পসন। ১৮৮৪ সালে প্রথমবার বিশ্বের সামনে রোলারকোস্টার এনে হাজির করলেন তিনি। নিউ ইয়র্কের কোনি আইল্যান্ডে বসল সেই রোলার কোস্টার, নাম হল সুইচব্যাক রেইলওয়ে। শুধু ব্যবসা করাই নয়, নিজের কাজের মাধ্যমে সমাজে এক ধরনের স্থায়ী প্রভাব ফেলার ইচ্ছা ছিল থম্পসনের। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই রোলারকোস্টারের মতো বিনোদন তৈরি করলেন তিনি। যা মদ-জুয়ো-নেশার মতো সামাজিক কুপথ থেকে মানুষকে সরিয়ে এনে দেবে এক অন্যতর আনন্দের খোঁজ।

আসলে থম্পসন বড় হয়েছিলেন এক ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান পরিবারে। ফলে ভিতরে ভিতরে কোথাও সেই ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা শিকড়ে বসেছিল থম্পসনের। সেই ধর্মবোধেরও কোনও অংশে কমতি ছিল না তার ভিতরে। এদিকে শিল্পোন্নয়ন এ নগরায়নের ছোঁয়ায় খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছিল সমাজটা। বদলে যাচ্ছিল তার নীতিবোধ, আদর্শ। যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না থম্পসনের পক্ষে। আশপাশে তখন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্যালোঁ, বিভিন্ন জুয়ো খেলার আসর। অর্থাৎ কিনা সব মিলিয়ে ঘুন ধরে গিয়েছে নৈতিক সমাজের কাঠামোয়। কিন্তু খ্রিস্টান বিশ্বাস থম্পসনকে ভাবতে বাধ্য করেছিল যে এর থেকে উত্থানের রাস্তা আছে। আর সেই রাস্তাটাই খোঁজা শুরু করেন থম্পসন।

কী হতে পারত এই সব নৈতিক অবক্ষয় থেকে উত্থানের রাস্তা? যা মানুষের নৈতিক বোধ, পরিবারের সঙ্গে একাত্মবোধের মতো জায়গাগুলোকে ফিরিয়ে আনবে। মানুষকে আনন্দ দেবে। সেখান থেকেই এল বিনোদনপার্কের ভাবনা, যেখানে মানুষ বসে নির্ভেজাল আনন্দ পেতে পারে পরিবার, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী চোখ এর ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির অঙ্কটাও ভালোই বুঝতে পারছিল বেশ। যেভাবে ক্রমশ সুইচব্যাক রেলওয়ে বিনোদন পার্কের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল মার্কিনদের মধ্যে, তাতে বেশ আশার আলো দেখতে পাচ্ছিলেন থম্পসন। অবশেষে ওই রোলারকোস্টার ডিজাইনের পেটেন্ট পান থম্পসন এবং এল এ থম্পসন সিনিক রেলওয়ে কোম্পানি বলে একটি সংস্থা তৈরি করেন। ক্রমশ দেশ জুড়ে বাড়তে থাকে বিনোদন পার্কের চাহিদা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জানেন, এত ঢ্যাঙা গলা নিয়ে কীভাবে ঘুমোয় জিরাফরা?

How Do Giraffes Sleep: এখন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জিরাফ ডিসকোকেরিক্স সিয়েঝি তার মাথা ব্যবহার করে মেষের মতো লড়াই করত।

প্রাথমিক ভাবে রোলারকোস্টার বা নাগরদোলা তৈরি হয়েছিল কাঠ দিয়ে। যত দিন গেল উন্নত হতে লাগল তার কাঠামো। কাঠের জায়গায় এল স্টিল, আরও নানা প্রযুক্তিগত বদল শরীরে আয়ত্ত করতে লাগল নাগরদোলা। আরও বিনোদন, আরও আনন্দের খোঁজে ক্রমশ এগোতে লাগল সেদিনের রোলারকোস্টার। এমনকী ঘূর্ণনের গতি, দিক- সব ব্যাপারেই ব্যাপক ভাবে বদল আসতে লাগল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। শুধু বিনোদন পার্কই নয়, জন্ম হল থিম পার্কের। আর নতুন নতুন দিশায় এগোতে লাগল আধুনিক নাগরদোলা।

কিন্তু সমাজ কি বদলালো! তার উত্তর অবশ্যই হ্যাঁ। কিছুটা হলেও সেসময় বদল আনতে পেরেছিল এই নাগরদোলা। মদ-জুয়োর মতো সর্বনাশা নেশার থেকে বেরিয়ে অন্য আনন্দের খোঁজে বারবার এইসব বিনোদন পার্কে ঢুঁ মারতে লাগলেন মানুষ। বাড়ল পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের টান। আসলে এই অদ্ভুত রাইডে চড়ে শিশুর মতোই নির্মল আনন্দ পাচ্ছিলেন মানুষ। হয়তো অন্তরের যে নিষ্পাপ শিশুমন তাকেই পুনরায় জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল এই রোলার কোস্টার, যা অবক্ষয়ী সমাজের মুখে অ্যান্টিডোটের মতো।

এককালে যা ছিল পাপ থেকে বাঁচার পথ, তা ক্রমশ নির্ভেজাল আনন্দের রূপ নিল। সেই নৈতিক দায়িত্বের গুরুভার আর তার কাঁধে রইল না। বরং শুধু এবং শুধুমাত্র আনন্দ, উত্তেজনা আর হুল্লোড়ের চাবিকাঠি হয়ে রইল নাগরদোলা। আর আমাদের মতো অনেকে, যাঁরা ক্রমশ শহরের দাপটে মফস্বলের বৈশাখী-পৌষ মেলাকে পিছনে ফেলে এসেছেন অনেকটাই, তাঁদের কাছে আজও শুধুমাত্র নস্টালজিয়ার অন্য নাম এই নাগরদোলা।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।