ইউরেনাসের একাধিক চাঁদে রয়েছে মহাসাগর, যে-তথ্য পালটে দিচ্ছে সৌরজগতের হিসেবনিকেশ

Voyager 2 and Uranus: ইউরেনাসের প্রতিটি ঋতু প্রায় কুড়ি বছর স্থায়ী হয়। গ্রহটির দীর্ঘ ঋতুচক্রের কারণে এর শক্তিস্তরেও পরিবর্তন ঘটে, যা ভয়েজার ২-এর সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণে ধরা সম্ভব ছিল না।

Abhinandan B
৩ মিনিট
ইউরেনাসের একাধিক চাঁদে রয়েছে মহাসাগর, যে-তথ্য পালটে দিচ্ছে সৌরজগতের হিসেবনিকেশ

অবশেষে, সৌরজগতের অনেক দিনের একটা ধাঁধার সমাধান করলেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি জানা গেছে, ইউরেনাস গ্রহের অভ্যন্তরেও রয়েছে নিজস্ব তাপের উৎস। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, এই গ্রহটি ভেতর থেকে সম্পূর্ণ শীতল; কিন্তু হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি নতুন সমীক্ষা সেই ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। গবেষণাপত্রটি জানাচ্ছে, ইউরেনাস সূর্য থেকে যে পরিমাণ শক্তি পায়, তার থেকে প্রায় ১২.৫% বেশি তাপ সে মহাকাশে বিকিরণ করে। এই আবিষ্কারটি নাসার ভয়েজার ২ মহাকাশযানের পাঠানো প্রায় ৩৮ বছরের পুরনো পর্যবেক্ষণকে ভুল প্রমাণ করেছে।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি গ্রহবিজ্ঞানের একটি মৌলিক দ্বন্দ্বের সমাধান করল। সৌরজগতের অন্যান্য গ্যাস-নির্মিত গ্রহ, যেমন বৃহস্পতি, শনি এবং নেপচুন, সূর্য থেকে প্রাপ্ত শক্তির চেয়ে অনেক বেশি তাপ উৎপন্ন ও বিকিরণ করে। কিছু ক্ষেত্রে এই পরিমাণ একশো শতাংশেরও বেশি। কিন্তু ১৯৮৬ সালে ভয়েজার ২ যখন ইউরেনাসের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, সে-সময় তার পাঠানো তথ্য এক ভিন্ন চিত্র বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরে। সেই তথ্য অনুযায়ী, ইউরেনাসের কোনও অভ্যন্তরীণ তাপের উৎস ছিল না। তাহলে কি ভয়েজার ২ ভুল তথ্য পাঠিয়েছিল?

১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে, ভয়েজার ২ ইউরেনাসের পাশ দিয়ে উড়ে যায়। তখন থেকে এখনও পর্যন্ত এটিই একমাত্র মহাকাশযান যা এই গ্রহটিকে এত কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিল। মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণে, ভয়েজার ২ ইউরেনাসের দশটি নতুন চাঁদ এবং দুটি নতুন বলয় আবিষ্কার করে। কিন্তু একই সঙ্গে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যও ভয়েজার ২ পৃথিবীতে পাঠায়, যার মধ্যে অন্যতম হল ইউরেনাসে অভ্যন্তরীণ তাপের অনুপস্থিতির তথ্য।

ভয়েজার ২

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আলোকে জমিয়ে ফেলা সম্ভব! বিজ্ঞান গবেষণায় যে ধরনের পরিবর্তন অনিবার্য

Scientists freeze light: সাংবাদিক সম্মেলনে এই আবিস্কারের ঘোষণা করার সময় ইতালীয় গবেষকরা এই অদ্ভুত ঘটনাটিকে 'কোয়ান্টাম থিয়েটারের' সঙ্গে তুলনা করেছেন।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ভয়েজার ২-এর এই ভুল পর্যবেক্ষণটি ছিল এক মহাজাগতিক কাকতালীয় ঘটনার ফল। নাসার বিজ্ঞানী এমি সাইমনের কথায়,

ভয়েজার ২-এর ফ্লাইবাইয়ের পর থেকে সকলেই বলে এসেছেন যে ইউরেনাসের কোনও অভ্যন্তরীণ তাপ নেই। কিন্তু কেন এমন হবে, তা ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন ছিল, বিশেষ করে যখন আমরা অন্য দৈত্যাকার গ্রহগুলির সঙ্গে এর তুলনা করি।

গবেষকরা এখন বিশ্বাস করেন যে ভয়েজার ২ মহাকাশযানটি যখন ইউরেনাসের কাছে পৌঁছয়, তখন গ্রহটিতে গ্রীষ্মকালীন সৌরস্থিতি (summer solstice) চলছিল। ঠিক সেই সময়েই একটি অস্বাভাবিক সৌর ঝড় শুরু হয়, যা গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রকে (magnetosphere) সংকুচিত করে দেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এ এক অত্যন্ত বিরল আকাশঘটনা। এই সৌরঝড় (হারিকেন) ইউরেনাসের চৌম্বকীয় বুদবুদকে এতটাই চেপে দিয়েছিল যে এর ফলে গ্রহের চারপাশের পরিবেশ এবং ভয়েজারের শক্তি পরিমাপের যন্ত্রের পাঠ-ও প্রভাবিত হয়ে গিয়েছিল। এখানে এ-কথাও বলে রাখা উচিত, ভয়েজার ২ তার সংক্ষিপ্ত যাত্রাপথে গ্রহটির শুধুমাত্র একটি গোলার্ধ-ই পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিল।

ইউরেনাসের কেন্দ্র অংশ

এই গবেষণার প্রধান ড. শিনইউ ওয়াং বলেন,

এর অর্থ হল, গ্রহটি এখনও তার প্রাথমিক স্থিতি থেকে প্রাপ্ত অবশিষ্ট তাপ ধীরে-ধীরে হারাচ্ছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, যা আমাদের পৃথিবীর উৎস এবং সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে এর পরিবর্তন বুঝতে সাহায্য করে।

এই আবিষ্কারটি ইউরেনাসের আরও কিছু অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের উপর নতুন আলোকপাত করেছে। যেমন, গ্রহটি তার অক্ষের উপর প্রায় ৯৮ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকে এবং উল্টো দিকে ঘোরে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, গ্রহের অভ্যন্তরীণ তাপের অবস্থানের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে। প্রসঙ্গত জানাই, ইউরেনাসের প্রতিটি ঋতু প্রায় কুড়ি বছর স্থায়ী হয়। গ্রহটির দীর্ঘ ঋতুচক্রের কারণে এর শক্তিস্তরেও পরিবর্তন ঘটে, যা ভয়েজার ২-এর সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণে ধরা সম্ভব ছিল না।

আগের পর্যবেক্ষণে, ইউরেনাসের চৌম্বক ক্ষেত্রটিকে প্রায় শূন্য বলে মনে করা হয়েছিল, যে-কারণে ইউরেনাসের পাঁচটি প্রধান চাঁদকেও ভূতাত্ত্বিকভাবে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই চাঁদগুলি ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় হতে পারে এবং তাদের মধ্যে মহাসাগরও থাকতে পারে। ইউরেনাস সম্পর্কে এই সাম্প্রতিক গবেষণা-তথ্য সৌরজগতের গ্রহগুলির গঠন এবং বিবর্তন সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এবং এর থেকে এ-কথাও আরেকবার প্রমাণিত হল যে, একটি মহাকাশযানের একটিমাত্র পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য সবসময় সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণই মহাজাগতিক বস্তুর আসল প্রকৃতি উন্মোচন করতে পারে।

লিখেছেন
Abhinandan B
Abhinandan B
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।