একদিন আমিও স্মৃতি মন্ধনা হব

Smriti Mandhana: ওয়ান ডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হোক বা টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা টেস্ট ক্রিকেট, স্মৃতির রেকর্ড সর্বত্র। তিন ফরম্যাটেই তাঁর নাম জড়িয়ে আছে একাধিক বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গে।

Manisha Ghosh
৩ মিনিট
একদিন আমিও স্মৃতি মন্ধনা হব

সূর্য তখন মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে ঢলে পড়ছে। স্ট্যান্ডে হাজার মুখ আর বাতাসে উত্তাপ। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতীয় মেয়েদের স্কোরবোর্ডে তখন শূন্য উইকেটে ১৯০ রান। মাঠের মাঝে এক শান্ত, স্থির চোখ, মুখে আত্মবিশ্বাস। বোলার দৌড়ে এসে বল ছুঁড়তেই গ্যালারিতে গর্জে উঠল একটা নাম। ঠিক যেমনটা হত সচিন ব্যাট হাতে ক্রিজে দাঁড়ালে। মহারাষ্ট্রের ছোট শহর সাংলির ধুলো মাখা মাঠ থেকে এই মাইলফলকে পা দেওয়া সেই আত্মবিশ্বাসী মেয়েই স্মৃতি, স্মৃতি মন্ধনা।

১৯৯৬ সালের ১৮ জুলাই মুম্বইতে জন্ম হলেও বেড়ে ওঠা মহারাষ্ট্রের সাংলিতে। বাবা শ্রীনিবাস মান্ধানা ছিলেন জেলা স্তরের ক্রিকেটার, ভাই শ্রবণও খেলতেন। বাড়ির উঠোনেই চলত অনুশীলন,বাবা বল করতেন, ভাই কিপিং, আর মাঝখানে বাম হাতে ব্যাট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত ছোট্ট স্মৃতি। নয় বছর বয়সে অনূর্ধ্ব–১৫, এগারো বছরেই অনূর্ধ্ব–১৯ দলে ডাক পান তিনি। এক ধরনের নীরব জেদ, ততোধিক লুকনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে চালিত করত। খেলার প্রতি এই টানই ক্রমশ তাঁকে পৌঁছে দেয় জাতীয় দলে। ২০১৩ সাল। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভারতের জার্সিতে প্রথম আন্তর্জাতিক অভিষেক। সেই বছরেই গুজরাটের বিরুদ্ধে ঘরোয়া একদিনের ম্যাচে ১৫০ বলে ২২৪ রান,ভারতের প্রথম মহিলা হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি। ক্রিকেট মহল চমকে গিয়েছিল। এক অচেনা সকালে গোটা দেশের ক্রীড়ামন এক নতুন নাম চিনল, স্মৃতি মন্ধানা।

সেই থেকেই শুরু স্বপ্নযাত্রার । ২০১৭ সালের বিশ্বকাপে তাঁর ৯০ রানের ইনিংস ভারতকে পৌঁছে দেয় ফাইনালে। ২০১৮-তে আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটার, ২০১৯-এ নিউজিল্যান্ডের মাটিতে শতরান, ২০২১-এ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাটিংয়ের নৈপুণ্যে অপরাজেয় দৃঢ়তা। ২০২৩ সালে জায়গা পেলেন আইসিসি উইমেনস টি-টোয়েন্টি টিম অব দ্য ইয়ারে। আর ২০২৪ এ নিজের নেতৃত্বে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে এনে দিলেন প্রথম উইমেন প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি। অধিনায়িকা হিসেবে তিনি যেন ক্রিকেটের বুদ্ধ । তরুণ ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন, “খেলো নিজের ছন্দে, ভয় পেও না।” তাঁর নেতৃত্বের ভিতর মিতালি রাজের মতো স্থিরতা ছিল, ছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো হৃদয় নিংড়ে লড়ে যাওয়ার মনোভাব।

২০২৫ সালে উইজডেনের বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মহিলা ক্রিকেটার খেতাব আসে মন্ধনার ঝুলিতে। চোট, ব্যর্থতা আর কঠিন সময়ের মধ্যেও কখনও হার মানেননি তিনি। ভারতের ওপেনিং ব্যাটিংকে নতুন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছেন। স্মৃতির ব্যাট যেন প্রতিবারই বলে, “আমি এখনও এখানে আছি, আরও উঁচুতে উঠব।”

ওয়ান ডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হোক বা টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা টেস্ট ক্রিকেট, স্মৃতির রেকর্ড সর্বত্র। তিন ফরম্যাটেই তাঁর নাম জড়িয়ে আছে একাধিক বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গে।

যেদিন সূর্য মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে ঢলে পড়ছে। গ্যালারি জুড়ে গর্জে উঠল স্মৃতি, স্মৃতি, স্মৃতি। এক অসাধারণ শতক। তাঁর ৯৫ বলে ১০৯ রানের ইনিংস যেন ইতিহাসের অধ্যায়। প্রীতিকা রাওয়ালের সঙ্গে গড়া ২১২ রানের উদ্বোধনী জুটি নতুন ভারতের ক্রিকেট স্বপ্নের প্রতীক। সেই দিনেই তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে পার করেন ৫,১৮৬ রান, আর বছরের শেষে ১,২৫৯ রানে করে উঠে আসেন বিশ্বের এক নম্বর ওপেনার হিসেবে।

সংখ্যা কাহিনির সবটুকু বলে না। স্মৃতির আসল শক্তি তাঁর ধৈর্যে, তাঁর প্রত্যাবর্তনে, তাঁর বিশ্বাসে। চোট, ব্যর্থতা, ক্লান্তি— প্রতিটি অধ্যায় থেকে তিনি ফিরে এসেছেন আরও উজ্জ্বল হয়ে। প্রাক্তন অধিনায়ক মিতালি রাজ একবার বলেন, “স্মৃতি শুধু রান করে না, সে দলে আত্মবিশ্বাস ঢেলে দেয়।” ছোট শহরের মেয়ের এই আত্মবিশ্বাস আজ ভারতের মহিলা ক্রিকেটকে নতুন দিগন্ত দিয়েছে। প্রতিটি ইনিংস, প্রতিটি স্ট্রোক যেন বলছে— স্বপ্ন কখনো ছোট হয় না, চেষ্টা থাকলে সব সম্ভব।

বাঁ-হাতি এই ব্যাটারের ব্যাটে শুধু বলের শব্দ নয়, বাজে এক সুর, যা স্বপ্নের, পরিশ্রমের, চেষ্টার গল্প বলে। প্রতিটি বাউন্ডারি যেন মেয়েদের মনে নতুন আশা জাগায়। তিনি চান মেয়েরা ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে ভাবুক। শুধু রান নয়, সেই বিশ্বাসটাই দিতে চান তিনি। প্রতিটি ভোরে প্র্যাকটিসের জন্য উঠে যাওয়া, তরুণ খেলোয়াড়দের শেখানো, দলের পাশে থাকা— এই সবই প্রমাণ করে তিনি শুধু খেলোয়াড় নন, তিনি এক প্রজন্মের আস্থা, এক প্রজন্মের প্রেরণা। যে মাঠে শুরু হয়েছিল ধুলো-মাখা ব্যাটিং, আজ সেই একই মাঠে জ্বলছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আলো, আর সেই আলোয় অনুপ্রাণিত হচ্ছে অসংখ্য মেয়েরা, যারা বলছে—“একদিন আমিও স্মৃতি মন্ধনা হব।”

লিখেছেন
Manisha Ghosh
Manisha Ghosh
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।