চিপকো আন্দোলনের নারীরা আজও পরিবেশ আন্দোলনের মুখ

ভারতের অরণ্য দীর্ঘকাল ধরে দেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সম্পদগুলির মধ্যে অন্যতম, যা বনে বসবাসকারী গ্রামীণ সম্প্রদায়ের জীবিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও বজায় রাখে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে, দু'টি আইন প্রবর্তন করা হয়েছিল, যা ১৮৭৮ এবং ১৯২৭ সালের ভারতীয় বন আইন হিসেবে পরিচিত। এই আইনের দ্বারা সরকারকে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ পরিচালনা করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই আইনগুলি রাষ্ট্রকে বনের নির্দিষ্ট এলাকা ব্যবহারের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অধিকারও প্রদান করে।

বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ে পরিবেশ আন্দোলন এখন পৃথিবীজুড়েই হচ্ছে। তবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। এই যাত্রার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল চিপকো আন্দোলন। গাছ ও বন রক্ষার জন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে যে অহিংস আন্দোলন হয়েছিল সাতের দশকে, তা-ই চিপকো আন্দোলন নামে পরিচিত। আন্দোলনটি হয়েছিল ভারতের উত্তরাখণ্ডে। সিনেমায় হামেশাই দেখা যায়, ভিলেন মারতে এলে নায়িকা নায়ককে বাঁচানোর জন্য তাকে জড়িয়ে ধরে। এ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য অনেকটাই যেন সেরকম, গাছ কাটা বন্ধের জন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের গ্রামবাসীরা।

চিপকো আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালে পাহাড়ে গাছ কাটা বন্ধের দাবিতে। গাছকে জড়িয়ে ধরে কুঠারাঘাত থেকে বাঁচাতে। কিন্তু আমরা যদি এই গাছ জড়িয়ে ধরার ইতিহাসকে কাছ থেকে লক্ষ করি, তবে দেখা যাবে, এই আন্দোলনটি ঠিক গাছ কাটার বিরুদ্ধে নয়, গাছ কাটার, গাছকে, অরণ্যকে বাঁচিয়ে গাছ কাটার জন্মগত অধিকার যাঁদের, তাঁদের অধিকারের সংগ্রাম। এই আন্দোলনের অন্যতম দাবি পাহাড়ের সম্পদ ব্যবহারে স্থানীয়দের অধিকার প্রতিষ্ঠা। মানে বনবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ঘটনা ছিল, গাড়োয়াল অঞ্চলের এই বনজ সম্পদ লুঠ করত তখনকার উত্তরপ্রদেশের সমতলের কাঠশিকারিরা। এরা ঠিকাদারের মোড়কে নানা রকম কৌশল করে এই গাছ কাটার ঠিকা পেত আর দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক অরণ্য লুটে নিত। চিপকো আন্দোলনের জন্ম এই লুটেরা-ঠিকাদারদের হাত থেকে অরণ্যভূমিকে রক্ষা করতে ও গাছ কাটার অধিকার স্থানীয় মানুষদের হাতে রাখতে। এই দিক থেকে চিপকো আন্দোলন নিছক পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন নয়, একটি আর্থ-সামাজিক আন্দোলন।

আরও পড়ুন: অরণ্য রক্ষা করতে রুখে দাঁড়িয়েছিল মানুষ! কেরলের সাইলেন্ট ভ্যালির আন্দোলন কেন আজও জরুরি

পটভূমি
চিপকো আন্দোলনের ভিত্তি রচিত হয় আরও দুই শতাব্দী আগেই। তখন ১৭৩০ সাল। রাজস্থানের প্রত্যন্ত অঞ্চল খেজারিলি গ্রামে একটি রাজপ্রাসাদ গড়ার পরিকল্পনা করলেন তৎকালীন মেওয়ারের রাজা। রাজার নাম অভয় সিং। রাজার নেতৃত্বেই শুরু হয় গাছ কাটা কর্মসূচি। আর এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তিন সন্তানের মা অমৃতা দেবী। সেসময় তার সঙ্গে যোগ দেন গ্রামের বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষও। তাদের একটাই উদ্দেশ্য, যে করেই হোক গ্রামের খেজরি গাছগুলোকে বাঁচাতে হবে। আর সেজন্য গাছের সঙ্গে নিজেকে আটকে রেখে শুরু হয় এই আন্দোলনের প্রথম প্রতিবাদ। আর এভাবেই গাছকে জড়িয়ে ধরে রাখা অবস্থাতেই রাজার সৈন্যদের হাতে তাঁদের প্রাণ দিতে হয়েছিল। এই আন্দোলনে প্রায় ৩৬৩ জন নিহত হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে গাছ বাঁচাতে গাছকে জড়িয়ে ধরার ধারণা আসে বিষ্ণোই আন্দোলন থেকে।

এরপর ১৯৬৩ সালে চিন-ভারত যুদ্ধের অবসানের পর ভারতের উত্তরাখণ্ডে এই আন্দোলন আবার শুরু হয়। তখন উত্তরাঞ্চলের, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলগুলো ব্যাপক উন্নয়ন করে। বিশেষ করে যুদ্ধের জন্য নির্মিত রাস্তাগুলো বিদেশি সংস্থাদের বেশ নজর কাড়ছিল। সংস্থাগুলো চেয়েছিল, ওই অঞ্চলের বনজ সম্পদ দখল করতে। সরকারের অনুমতি পেলে শুরু হয়ে যায় বৃক্ষনিধন। অথচ জীবনধারণের জন্য বনজ সম্পদের ১০ শতাংশও ভোগ করতে দেওয়া হতো না অঞ্চলের আদিবাসীদের। বাণিজ্যিক কারণে এভাবে বৃক্ষনিধনের ফলে কৃষির ফলন কমে যাচ্ছিল, মাটি ক্ষয়, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল সমগ্র অঞ্চলটির ওপর।

পরবর্তী ইতিহাস
হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল ভারতের জনসম্পদ ও অরণ্যসম্পদের প্রধান উৎস। কিন্তু বিগত ৫০-৬০ বছর ধরে হিমালয়ে অরণ্য ভূমি ব্যাপক হারে ধ্বংস করা হচ্ছে। গঙ্গা ও তার পার্বত্য উপনদীগুলির অববাহিকার প্রায় ১৬,০০০ হেক্টর অঞ্চলে প্রচুর গাছ কাটা হয়েছে। ফলে অধিকাংশ উপত্যকায় ভূমিক্ষয়, ধ্বস, খরা ও বন্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবের পরিণতি হল ১৯৭০-এর জুলাই মাসে অলকানন্দা ভয়াবহ বন্যা।

হিন্দিতে ‘চিপকো’ শব্দটির অর্থ ‘জড়িয়ে ধরা’ বা ‘আটকে থাকা’। আর গাছকে জড়িয়ে ধরার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল বলে এর নাম ‘চিপকো আন্দোলন’। আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন ভারতের উত্তরাখণ্ডে এই আন্দোলনটি শুরু হয়। উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল ও কুমায়ুন হিমালয়ের অন্তর্গত চামোলি জেলায় চিপকো আন্দোলনের সূচনা।

অনেকের মতে, কারখানা স্থাপনের জন্য তৎকালীন আমলারা ১০০টি গাছ কাটতে উদ্যোগী হন। এবং এই কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ান গ্রামের দুই যুবক- সুন্দরলাল বহুগুনা ও চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট। গাছকে জড়িয়ে ধরে তাঁরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের একটাই লক্ষ্য; যেভাবে হোক গাছ ও বন নিধন বন্ধ করে পরিবেশকে রক্ষা করা। চিপকো আন্দোলনকে কৃষকদের আন্দোলন বা মহিলাদের আন্দোলন যা হিসেবেই অনুমান করা হোক না কেন, এটি ছিল ভারতের প্রথম সংগঠিত পরিবেশ আন্দোলন।

আবার অনেকের ধারণা, উত্তরাখণ্ডের স্থানীয় সংস্থা, Dashauli Gram Swarajya Sangh (DGSS), ১৯৭৩ সালে স্থানীয় মানুষদের কৃষি সরঞ্জাম তৈরির জন্য বনদপ্তরের কাছে ১০টি করে ছাই-বৃক্ষ প্রদানের অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু বন দপ্তর সেই অনুরোধ অগ্রাহ্য করেন‌। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা বিদেশি সাইমন্ড কোম্পানিকে ৩০০টি ছাই-বৃক্ষ প্রদানের অনুমতি প্রদান করে, যা স্থানীয় মানুষদের মধ্যে অসন্তোষের উদ্ভব ঘটায়। তারপর ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সাইমন্ড কোম্পানির কিছু কর্মচারী তাদের বরাদ্দ ৩০০ বৃক্ষ কাটতে এলে স্থানীয় মানুষজন ড্রাম বাজিয়ে, লোকগীত গেয়ে তাদের বিরোধিতা করেন। গোপেশ্বরের দাসোহলি গ্রাম স্বরাজ্য মণ্ডল সংগঠনের নেতা চন্ডীপ্রসাদ ভট্ট গাছ বাঁচাতে বিষ্ণোই আন্দোলনের মতো গাছকে আলিঙ্গন করার বুদ্ধি নিয়ে আসেন। এইভাবে গাছ জড়িয়ে ধরে গাছ কাটায় বাধা দিয়ে অরণ্য রক্ষার এই অভিনব পদ্ধতি চিপকো আন্দোলন নামে ধীরে ধীরে পরিচিতি পায়।

আন্দোলনটির প্রথম সূত্রপাত উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় হলেও, পরে তা দ্রুত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। গান্ধীবাদী সমাজকর্মী চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট ১৯৬৪ সালে স্থানীয় গ্রামবাসীদের জন্য দশোলী গ্রাম্য স্বরাজ্য সংঘ (ডিজিএসএম) নামে একটি ক্ষুদ্র সমবায় সংস্থা গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালে উত্তরপ্রদেশ থেকে এই আন্দোলন কঠোর রূপ ধারণ করে। ১৯৭৪ সালে সরকার কর্তৃক ২,০০০ গাছ কাটা হলে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং সুন্দরলাল বহুগুনা গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারী, পুরুষ, ছাত্রদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। ১৯৭২-'৭৯ সালের মধ্যে দেড়শতাধিক গ্রাম চিপকো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল। উত্তরাখণ্ডে ১২টি বড় ও ছোটখাটো অনেক বিক্ষোভ হয়ে থাকে। চিপকো আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল নারী গ্রামবাসীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। এই অঞ্চলের কৃষির সঙ্গে নারীরা যুক্ত থাকায় তাঁরা এই বিক্ষোভে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গৌড়া দেবী, সুদেশা দেবী, বাচ্চনি দেবী, চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট, ধুম সিং নেজি, শমসের সিং, গোবিন্দ সিং রাওয়াত প্রমুখ।

নারীদের অবদান
ভারতের মতো দেশে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যেখানে ঘরের বাইরের সব কাজ প্রধানত পুরুষই করে থাকে, সেখানে এই আন্দোলনে অভাবনীয় অবদান রাখে নারীসমাজ। তাদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, নারীরা কোনও অংশে কম নয় এবং প্রয়োজনে তারা সকল কাজই করতে পারে, চিপকো আন্দোলন তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। সর্বপ্রথম এই আন্দোলন শুরু হয় একজন নারী অমৃতা দেবীর হাত ধরেই। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তী সময়ে এই নারীরা তাঁদের স্থানীয় বন রক্ষার্থে সমবায় সংগঠন গড়ে তোলেন। পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি‌ও শুরু করেন তাঁরা। উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদে সরকার থেকে করাতকল মালিকদের ওপর গাছ কাটার আদেশ আসার পর সেই অঞ্চলের আদিবাসী গৌড়া দেবী তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে প্রতিবাদ করেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই এই আন্দোলনের সঙ্গে শামিল হন।

চিপকো আন্দোলন এরপর তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের (বর্তমানে উত্তরাখণ্ড রাজ্য) অন্যান্য পার্বত্য জেলা, যেমন– রেনি, তেহরি, কুমায়ুন ও বৈদ্যগড়ে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে যখন রেনি অরণ্য অঞ্চলে ২০০০ মতো গাছ কাটা পরার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন DGSM-এর নেতা চন্ডীপ্রসাদ ভাটের নির্দেশমতো উক্ত অঞ্চলের গ্রামীণ মহিলারা গৌড়া দেবীর নেতৃত্বে গাছগুলোকে আলিঙ্গন করে বৃক্ষচ্ছেদন থেকে রক্ষা করেন। এর ফলে উত্তরপ্রদেশ সরকার বাধ্য হন উচ্চপদস্থ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করতে এবং এই কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী দশ বছরের জন্য অলকানন্দার উচ্চ অববাহিকায় সম্পূর্ণরূপে বৃক্ষচ্ছেদন বন্ধ হয়।

প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম, সুন্দরলাল বহুগুণাও ছিলেন চিপকো আন্দোলনের সমর্থক। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, এই আন্দোলেনর গোড়ায় তিনি ছিলেন না। ছিলেন তাঁর স্ত্রী বিমলা। এবার বিমলার নেতৃত্বে মাড়োরা গ্রামের মেয়েরা গাছ জড়িয়ে ধরে চিপকো শুরু করেন। সুন্দরলাল বিশ্বস্ত স্বামী হিসেবে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ান। পরিচিত গান্ধীবাদী জনমত সংগঠিত করতেও সক্ষম হন। নির্বিচারে বৃক্ষ কোতল যে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করবে, এই চেতনা থেকে হিমালয়ের বিপন্ন পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন সংগঠিত করতে আড়াই বছর ধরে সাত হাজার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে হাজার হাজার প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলেন সুন্দরলাল বহুগুণা। সেই প্রতিবাদ ও আন্দোলন এবং হিমালয়ের পাহাড়ি গ্রামের বার্তা নিয়ে সুন্দরলাল পৌঁছে গিয়েছিলেন রাজধানী দিল্লিতে। দিল্লি দরবারে, খোদ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। তাঁর আর্জি মেনে ১৯৮০ সালে পাহাড়ে গাছ কাটায় ১৫ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ইন্দিরা গান্ধী।

এইভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে চিপকো আন্দোলনের সফলতা। চিপকো আন্দোলন সম্প্রসারিত করেছিল পরিবেশ আন্দোলনকে। সবুজকে বাঁচাতে গাছের সঙ্গে নিজেকে আটকে রেখে যাঁরা রক্ত ঝরিয়েছেন, তাঁদের মনে রাখবে সকল পরিবেশবিদ। তাঁদের এই আত্মত্যাগ ও সাহস প্রেরণা যোগাবে ভবিষ্যৎ আন্দোলনকারীদের। ইংরেজিতে যাকে বলে 'বেঞ্চমার্ক', পরিবেশ আন্দোলনের ক্ষেত্রে চিপকো আন্দোলন তাই।

 

 

 

More Articles

;