“শ্মশানে কাজ! কেউ বিয়ে করবে না”, যেভাবে সমাজকে জবাব দিয়েছেন ‘ডোম’ টুম্পা দাস

Dom Tumpa Das: আশেপাশের লোকেরা বলেছিল, শ্মশানের কাজ করলে বিয়ে হবে না। ডোমের মেয়েকে কেউ ঘরে নেবে না। কিন্তু মা পাশে ছিলেন। প্রথমের দিকে শ্মশানে কাজ করতে যাওয়ার সময় মা সঙ্গে যেতেন।

Sangita Ghorai
৩ মিনিট
“শ্মশানে কাজ! কেউ বিয়ে করবে না”, যেভাবে সমাজকে জবাব দিয়েছেন ‘ডোম’ টুম্পা দাস

“যে পথ দিয়ে চলতাম, লোকে সে পথ দিয়ে চলত না। রাতের অন্ধকারে কেঁদেছি, কিন্তু আমার কষ্টটা কাওকে জানতে দিইনি। সকালে শ্মশানের কাজ শুরু করি হাসিমুখেই। কারণ আমি জানি, আমাকে লড়তে হবে।” কথাগুলো বলছিলেন টুম্পা দাস, বাংলার একমাত্র মহিলা ডোম বলে তিনি পরিচিত। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বারুইপুরের পূরন্দরপুর শ্মশানে দশ বছর ধরে শবদাহের কাজ করে চলেছেন। মাধ্যমিক পাস করে টেলারিং শিখেছিলেন। তারপর নার্সিং শিখে সেই কাজ করছিলেন। কিন্তু বেতন খুব বেশি ছিল না সেকাজে। অগত্যা অন্য পেশায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত।

কল্যাণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পুরন্দরপুর শ্মশানে প্রথমে কাজ করতেন টুম্পা দাসের বাবা। তিনি এই এলাকার জামাই বলে জানান উপ-পুরপ্রধান সুরজিৎ পুরকাইত। টুম্পার মামাবাড়ির পরিবারেরই এক সদস্য আগে সেই শ্মশানে কাজ করতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর টুম্পার বাবা সেই কাজের দায়িত্ব নেই। কিন্তু শরীর ভালো থাকতো না তাঁর, তাই টুম্পা বাবাকে সাহায্য করতে আসত। তখন ছিল কাঠের চুল্লি। বলছিলেন কল্যাণপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপ-পুরপ্রধান সুরজিৎ পুরকাইত।

২০১৪ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর টুম্পা বুঝতে পারছিলেন না কী ভাবে সংসার চলবে। একদিকে বাবার মৃত্যুতে মা ভেঙে পড়েছিলেন, বোন গর্ভবতী এবং ডিভোর্স হয়েছে, ভাইও ছোট। সুতরাং তাঁর কাজ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সেসময় উপ-পুরপ্রধান তাঁকে শ্মশানের কাজটা করার জন্য বলেন। ২০১৫ সাল থেকে শুরু, তখন ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে হতো, কাঠের চুল্লিতে। এখন তো তিনি ভাবতেই পারেন না, কী ভাবে দশটা বছর এই পেশায় কাটিয়ে ফেললেন। ইনস্ক্রিপ্টের সঙ্গে কথপোকথনে বলছিলেন টুম্পা দাস।

টুম্পা দাস, পুরন্দরপুর শ্মশানকর্মী

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
লিঙ্গবৈষম্যের মুখে সপাট জবাব! দেশ ভুলেছে প্রথম মহিলা চিত্রসাংবাদিক হোমাই ভ্যারাওয়ালাকে

Homai Vyarawalla, India's First Female Photojournalist: প্রায়শই কাঁধে ক্যামেরা বেঁধে রাজধানীর রাস্তায় সাইকেল চালাতে দেখা যেত তাঁকে, তা-ও আবার শাড়ি পরেই।

আশেপাশের লোকেরা বলেছিল, শ্মশানের কাজ করলে বিয়ে হবে না। ডোমের মেয়েকে কেউ ঘরে নেবে না। কিন্তু মা পাশে ছিলেন। প্রথমের দিকে শ্মশানে কাজ করতে যাওয়ার সময় মা সঙ্গে যেতেন। রাত-বিরেতে শবদাহ করতে এলে চিন্তা তো থেকেই যায়। উপ-পুরপ্রধান ইনস্ক্রিপ্টকে জানান, ক্লাবের লোককে বলা থাকে। নানা ধরনের মানুষ আসেন শ্মশানে। কেউ ঝামেলা করলে ক্লাবের ছেলেরা সামলায়। তাছাড়া টুম্পাও বেশ কড়া মেজাজে পরিস্থিতি সামাল দেন বলে জানান। প্রয়োজনে বকাও দেন।

টুম্পা দাস, পুরন্দরপুর শ্মশানকর্মী

শুরুর দিনগুলোর কথা স্মৃতিচারণ করে টুম্পা বলেন, লোকে বলেছিল, অন্য কাজ করতে। মেয়ে হয়ে ভারী কাঠ কী ভাবে তুলবে! কোদাল কী ভাবে চালাবে? প্রশ্ন করেছিল সমাজ। "শবদাহ করাতে এসে মানুষজন জিজ্ঞেস করেছে, তুমি দাহ করবে? পারবে তো? আবার কাজ শেষে তারাই ভালভাবে কথা বলেছে, আশীর্বাদ করেছে। কাজ করার সময় হাসিমুখে থাকি। আপনজনকে হারিয়ে শোকাহত মানুষরা আসেন, যতক্ষণ আমার কাছে থাকে তাঁদের হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করি।"

টুম্পা দাস, পুরন্দরপুর শ্মশানকর্মী

প্রথমের দিকে একাজ করতে খুব খারাপ লাগত বলে জানান টুম্পা। বিশেষত কম বয়সে কেউ মারা গেলে তার আফসোস হয়। তাঁর কথায়, "ছোট ছোট বাচ্চারা দুনিয়ার কি বা দেখল! পূর্ণ জীবন কাটিয়ে মারা গেলে অতটা কষ্ট হয় না। কিন্তু এটাই ভবিতব্য। আমিও বাবাকে হারিয়েছি। কষ্ট হয়েছে, কিন্তু নিজেকে সামলাতে হয়েছে সংসার চালাতে। তখন শুধু একটাই কথা মাথায় ছিল, আমাকে পরিবারকে দেখতে হবে। লোকে কত কথা বলেছে। যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতাম, সে রাস্তা বদলে নিত মানুষ। আমাকে ছুঁলে নাকি স্নান করতে হবে। রাতের অন্ধকারে কেঁদেছি, তারপর হাসিমুখে সকালে শ্মশানে গেছি।"

টুম্পা দাস, পুরন্দরপুর শ্মশানকর্মী

২০১৯ সাল থেকে ইলেকট্রিক চুল্লি হওয়ার পর ডিউটির সময় কমেছে টুম্পার। এখন আর ভারী কাঠ তোলার কষ্টটা হয় না। তবে আগুনের কাছে এতটা সময় কাজ করে শরীরে ছাপ তো পরেই। ছুটি পেলে একটু ঘুরতে যায়, সাজগোজ করেন বলে জানান টুম্পা। এইভাবেই এক অন্য প্রতীক, অন্য দুর্গা হয়ে উঠেছেন বাংলার মেয়ে টুম্পা দাস। তাঁর কথায়, এই বেশ ভাল আছেন তিনি। কেউ যদি বিয়ে করে, তাঁকে শ্মশানের কাজ করতে দিলেই হবে। আর এই কাজ যদি ছাড়তে হয়, বিয়েই করবেন না।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।