কখনও দক্ষিণা, কখনও শ্মশান, কখনও আবার রক্ষাকালী, কেন ভিন্ন ভিন্ন নামে পূজিতা হন দেবী?

Goddess Kali : কিন্তু একই দেবীর কেন ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়? কেনই বা সেই নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বদলে বদলে যায় আরাধনার নিয়ম? এই সব প্রশ্নের জট পাকিয়ে যায়, তৈরি হয় নতুন কোনও মিথ।

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
কখনও দক্ষিণা, কখনও শ্মশান, কখনও আবার রক্ষাকালী, কেন ভিন্ন ভিন্ন নামে পূজিতা হন দেবী?

ভক্তি অথবা শক্তি, কালী মাহাত্ম্য নিয়ে হিন্দুদের মধ্যে চর্চার শেষ নেই। বছরের ওই একটা রাতের পুজো দিয়েই তাই সেই চর্চা শেষ হয়ে যায় না। সারা বছর ধরেই বিভিন্ন রূপে পূজিতা হন দেবী। কলকাতা শহর তো বটেই, এমনকী সারা বাংলা জুড়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র কালী মন্দিরের ইতিহাস। কালী বলতেই একটা চিরাচরিত ভাবনার আমাদের মাথায় আসে। কৃষ্ণ বর্ণের শরীর, পায়ের নীচে শায়িত মহাদেব। এবং দেবীর জিভ কাটা। কিন্তু একই দেবীর কেন ভিন্ন ভিন্ন নাম হয়? কেনই বা সেই নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বদলে বদলে যায় আরাধনার নিয়ম? এই সব প্রশ্নের জট পাকিয়ে যায়, তৈরি হয় নতুন কোনও মিথ।

পণ্ডিতেরা বলেন দেবী কালী মূলত ৮টি ভিন্ন ভিন্ন রূপে এবং ভিন্ন নামে পূজিতা হন। যথা - দক্ষিণাকালিকা, সিদ্ধকালিকা, গুহ্যকালিকা, শ্রীকালিকা, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালিকা, শ্মশানকালিকা ও মহাকালী। আবার অন্য একটি মতে, ৯ প্রকার কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যথা - দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, কালকালী, গুহ্যকালী, কামকলাকালী, ধণকালিকা, সিদ্ধকালী, চণ্ডিকালিকা। এছাড়াও স্থান বিশেষে আরও বেশ কিছু নামে পূজিতা হন দেবী কালী। আসুন জেনে নেওয়া আদলে কী তফাৎ এই প্রতিটি রূপের মধ্যে।

দক্ষিণাকালী - কালীর এতো রূপের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হল এই দক্ষিণাকালী রূপটি। দক্ষিণ দিকের অধিপতি যম। তবে সেই যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তাঁরই নাম দক্ষিণাকালী। দেবীর এই রূপের বৈশিষ্ট্য হল, গলায় থাকে মুণ্ডমালার হার, কানে দুই ভয়ানক শবরূপী কর্ণাবতংস, কটিদেশে নরহস্তের কটিবাস। এই কালীও ত্রিনয়নী এবং মহাদেবের বুকে দাঁড়িয়ে থাকার দারুণ জিভ কাটা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সময় পেরলেও মরচে পড়েনি এতটুকুও, ভারতের এই মন্দিরে আজও রয়েছে পরশুরামের কুঠার

Tanginath Dham Parshuram Axe : সিঁদুর, ফুল লাগানো এই লোহার অস্ত্রটি নাকি হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই এই জায়গায় রয়েছে। মরচে পড়েনি এতটুকুও।

ভদ্রকালী - মৃত্যুর সময় যে কালী মঙ্গলময়ী বার্তা দেন, তিনিই ভদ্রকালী। যদিও এই ভদ্রকালী রূপেরও আবার দুটি ভিন্ন প্রকারভেদ লক্ষ্য করা যায় এই বাংলায়। শাস্ত্র মতে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অন্য নাম হিসেবেও উল্লেখ পাওয়া যায় ভদ্রকালী নামটির। তবে কালিকাপুরাণ অনুযায়ী, ভদ্রকালীর গায়ের রং অতসীপুষ্পের মতো, মাথায় জটাজুট, কপালে অর্ধচন্দ্র এবং গলায় কণ্ঠহার। কিন্তু এই দুই রূপের বাইরেও ভদ্রকালী রূপের আরও একটি প্রকারভেদ পাওয়া যায় এই বাংলাতেই। তিনি আবার কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, মাথার চুল খোলা। দেবীর এই রূপ যেন সবসময় ক্ষুধিতা, জগৎকে গ্রাস করতে উদ্যত যেন। তন্ত্রমতেই উল্লেখ মেলে এই রূপের।

গুহ্যকালী - গুহ্যকালী বা আকালী হিন্দু দেবী কালীর একটি বিশেষ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ মতে, তিনি দেবী শতাক্ষীর শরীর থেকে উৎপন্না অন্যতমা মহাশক্তি। এই কালী মূলত সাধকদের আরাধ্য।গায়ের রং গাঢ় মেঘের মতো। তিনি দ্বিভূজা, গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা, কটিতে ক্ষুদ্র কৃষ্ণবস্ত্র, মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র, কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার। এছাড়াও তাঁর বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ বিরাজমান। তিনি নব রত্ন ভূষিতা। তিনি নিয়মিত শবমাংস খান। তবে গৃহস্থের নিকট এই রূপ "অপ্রকাশ্য"। গুহ্যকালী কালীর এক অতি ভয়ংকরী রূপ।

সিদ্ধকালী - সিদ্ধকালী গৃহস্থ নয়, দেবীর এই রুপের পুজোর অধিকার কেবলমাত্র সাধকদের। তুলনামূলকভাবে অপরিচিত রূপ এটি। কালীতন্ত্রে তাঁকে দ্বিভূজা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তার ডান হাতে থাকে খড়্গ, যে খড়্গ দিয়ে তিনি চাঁদে আঘাত হানেন। পরি নামে চাঁদ থেকে যে অমৃত রস ক্ষরিত হয় তা বাম হাতে ধরে থাকা একটি মরার খুলিতে করে পান করেন দেবী। সিদ্ধকালী সালংকারা, মনোহর বসনে শোভিতা। তাঁর ডান পা শিবের বুকে এবং বাম পা শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে স্থাপিত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাছ ছাড়া ভাত খান না স্বয়ং কালী, লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গিয়েছে বাংলার এই শক্তিপীঠ

Kiriteswari Shakti Peeth Temple : নবাবি আমলের স্থাপত্য আজও রক্ষিত রয়েছে এই মন্দিরের পরতে পরতে। জাতি-ধর্ম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এখানে।

চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা - চামুণ্ডা হলেন আদ্যাশক্তি, আবার তিনিই ভগবতী দুর্গা। দেবী দুর্গার ভ্রুকুটি থেকে এই দেবীর সৃষ্টি হয়েছে এই রূপ বলেই জানা যায়। দেবী ভাগবত পুরাণ এবং মারকেন্ডিয় পুরাণ অনুসারে, চণ্ড ও মুণ্ড নামে দুই অসুরকে বধ করে তিনি পরিচিত হন 'চামুণ্ডা' নামে। চামুণ্ডাকে দেবী কালীর অপর রূপ মনে করা হয়। পার্বতী, চণ্ডী, দুর্গা, চামুণ্ডা ও কালী এক ও অভিন্ন। ভাগবত পুরাণ অনুসারে এই দেবী ব্যাঘ্র চর্ম পরে থাকেন এবং দেবী অস্তিচর্মসার।

মহাকালী - হিন্দু পুরাণ অনুসারে, তিনি মহাকালের তথা শিবের সঙ্গিনী। তিনি চেতনা দেবী এবং বাস্তবতা ও অস্তিত্বের ভিত্তি। সংস্কৃত ভাষায় মহাকালী হলেন মহাকালের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ। দেবী কালী এবং তার অন্য সব রূপই হলো মহাকালীর বিভিন্ন প্রকাশ। তন্ত্রসার গ্রন্থমতে মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবীকে আদ্যাশক্তি, দশভূজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দশ হাতে রয়েছে খড়্গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ।

শ্মশান কালী - কলকাতা তথা পার্শ্ববর্তী জেলায় বিভিন্ন শ্মশান নিকটবর্তী অঞ্চলে পুজো হয় এই দেবীর। অর্থাৎ শ্মশানে বাস থেকে এসেছে এই নাম। সিদ্ধকালীর মতো এই কালীর পুজোও গৃহস্থ বাড়িতে হয় না। শোনা যায় প্রাচীনকালে কোনও কোন ডাকাতও নাকি এই কালীর আরাধনা করতো। এখানে দেবীর প্রকাশ বিভৎস। তিনি বসনহীনা। গলায় মুন্ডমালা। চতুর্ভুজা দেবী মহাদেবের বুকের ওপর দন্ডায়মান।

রক্ষাকালী - রক্ষাকালীকে দক্ষিণাকালীরই একটি নাগরিক রুপ হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন কালে নগর বা লোকালয়ের রক্ষার জন্য এই দেবীর পুজা করা হতো। এই দেবীর পুজা মন্ত্রও ভিন্ন। স্থানভেদে রক্ষাকালীর বাহন সিংহ। দেবী দ্বিভুজা।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।