জিনোমিক্সের দৌড়ে নামছে ভারতীয় ক্রীড়াবিশ্ব, কোচ নন, ডিএনএ-এই শেষ কথা বলবে?

Sports Genomics: ভারতের মতো দেশে, যেখানে আর্থিক সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পরিকাঠামো সমান নয়, সেখানে জিনের পরীক্ষা হয়তো এক নতুন সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।

Manisha Ghosh
৩ মিনিট
জিনোমিক্সের দৌড়ে নামছে ভারতীয় ক্রীড়াবিশ্ব, কোচ নন, ডিএনএ-এই শেষ কথা বলবে?

মাঠের পাশে থেকে হঠাৎ রতনদা বলে ওঠে , “ওই ছেলেটাকে দেখেছিস - প্রশিক্ষণ নেই, ব্যায়াম নেই কিন্তু দৌড়টা ওর জিনেই আছে!” কথাটা শুনে হাসির রোল উঠলেও অনেকের মুখ চুপসে যায়। যাঁরা উদয়স্ত ঘাম ঝরাচ্ছে বিষয়টা খুবই উদ্বেগের তাঁদের জন্য। অনেকেই বলেন এই কথাগুলো, অমুকের রক্তে খেলা আছে, ওর বাপ-ঠাকুরদাও নাকি খেলোয়াড় ছিল! সব গুণ নাকি রক্তের শিল্প, খেলা, লেখাপড়া, এই যা হয় আর কী!

কিন্তু আজ, ঠাট্টা, রসিকতা গুলোই ল্যাবরেটরির আলোয় প্রমাণিত সত্য। বাদ যাচ্ছে না ক্রীড়াবিশ্বও। খেলোয়াড়ি মনের পাশাপাশি শরীরেও আছে খেলাধুলার ছাপ।

যে জিন ঠিক করে দেয় কার বেশি শক্তি, কে দ্রুত ছুটবে আর কে দৌড়ের মাঝে হাঁপাবে, সেই জিনের মানচিত্র এখন খুলে ফেলেছেন ভারতীয় ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, খেলোয়াড়ের প্রতিভা বা দুর্বলতা সবই লেখা আছে তার ডিএনএ-তে। আর সেই সূত্র ধরেই ভারতীয় খেলায় ঢুকছে এক নতুন বিজ্ঞান “স্পোর্টস জিনোমিক্স”।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রূপান্তরকামী মহিলারা ক্রিকেট খেললে মহিলাদের অধিকার কমে যায়?

Pride Month: ক্রিকেটের মতো স্পোর্টসে আমরা কোনওদিন মেয়েদের কৃতিত্ব স্বীকারই করলাম না। অথচ তাতে ট্রান্সউইমেনদের অন্তর্ভুক্তি মেয়েদের প্রতি ইনজাস্টিস আর অসাম্যের পৃষ্ঠপোষক হবে বলে কেন ভাবছি আমরা?

আজকের দিনে পেশাদার খেলোয়াড় তৈরি মানেই শুধু শারীরিক পরিশ্রম নয়। তাঁদের পেশির গঠন, ফুসফুসের ক্ষমতা, সহনশক্তি সবই এখন বিজ্ঞানের মাপজোখে। কিন্তু, কেউ যদি বলত এই সব তথ্য তাঁর জন্মের সময়ই শরীরে লেখা ছিল? তখন হয়তো সবাই হাসত। আজ সেই হাসি থেমে যাচ্ছে, কারণ বিজ্ঞান বলছে - একজন অ্যাথলিটদের ক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করে তাঁর জিনের উপর। এসিটিএন৩ (ACTN3) বা এসিই (ACE) নামের দুটি জিনই নাকি ঠিক করে দেয় কে স্প্রিন্টে দ্রুত ছুটবেন, না কি ম্যারাথনে দীর্ঘপথের যোদ্ধা হবেন, কে কত সময়ে সুস্থ হয়ে উঠবেন, কার হাড়ের ক্ষমতা কত।

আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, এবং চিন— বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলোর ক্রীড়া প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে জিনোমিক্সের ব্যবহার ছিল আগে থেকেই। ভারতও এখন সেই দৌড়ে নিজের নাম লিখিয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফাতিমা সানা: পুরুষতান্ত্রিক পাকিস্তানে মহিলা ক্রিকেট বিপ্লবী

Fatima Sana: আশেপাশের লোকজন অবাক হয়ে দেখত, আবার কেউ ঠাট্টা করত, মেয়ে মানুষ হয়ে ক্রিকেট? সীমিত সুযোগ আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাধা পেরিয়ে, বাবা-মায়ের ছত্রছায়ায় নিজের এক আলাদা আকাশ বানিয়েছেন তিনি।

ইতোমধ্যেই কিছু বেসরকারি স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট জিন টেস্ট শুরু করেছে। প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই তাঁরা জানাতে চান, কোন খেলোয়াড়ের শরীর কোন ধরনের খেলায় মানাবে। এক অর্থে, এটা যেন ভবিষ্যতের প্রতিভা মানচিত্র তৈরি করছে। খেলোয়াড়ের বিশেষত লিগামেন্ট এর স্বাস্থ্যের জন্য এটা যাচাই করে নেওয়াটা খুব জরুরি। এখানেই প্রশ্ন, আগামী দিনে খেলোয়াড় কি তৈরি করা হবে, না শুধু খুঁজে নেওয়া হবে?

ভারতের মতো দেশে, যেখানে আর্থিক সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পরিকাঠামো সমান নয়, সেখানে জিনের পরীক্ষা হয়তো এক নতুন সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে। বিত্তবানরাই হয়তো প্রযুক্তির সুবিধা পাবে, আর দরিদ্র প্রতিভারা সুযোগ হারাবে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন জিন একা কিছু করতে পারে না। পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক শক্তি সবই গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, কারও জিনে ‘দৌড়বিদ’ লেখা থাকলেও, পরিশ্রম ছাড়া সে মাঠে নামতে পারবে না। সব কিছুরই সুফল আর কুফল এই ক্ষেত্রেও রয়েছে, খেলোয়াড়ের জিনগত তথ্য যদি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়—তাহলে সেটি বায়োলজিকাল প্রোফাইলিং-এর শামিল। একজন ভালো কিশোর বা কিশোরী খেলোয়াড় যদি জানেন, তাঁর জিনে ‘দুর্বলতা’ আছে তাহলে কি অচিরেই তাঁর আত্মবিশ্বাসের মিনার ভেঙে পড়বে না? হয়তো এই ভয়টা থেকেই যাবে বা কখনও জিনের কারণে আগেভাগেই পরাজয় শিকার করে নেবে সে।

সব মিলিয়ে স্পোর্টস জিনোমিক্স এখন এক অদ্ভুত দ্বিধার মুখে দাঁড় করাচ্ছে খেলাধুলোর বাস্তুতন্ত্রকে। একদিকে এটি প্রশিক্ষণ আর ফিটনেস প্রোগ্রামকে নিখুঁত করে তুলতে যেমন পারেঅন্যদিকে এটি প্রতিভার মানবিক দিকটিকে “ডেটা” বানিয়ে ফেলতেও দেরি করবে না। যে খেলোয়াড় একসময় নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে বিশ্বজয় করতেন, তাঁর জায়গা নিচ্ছে ডিএনএ রিপোর্ট কার্ড। প্রশ্ন একটাই - এই রিপোর্ট কি স্বপ্ন দেখতে শেখাবে, না স্বপ্নকে মাপতে বসবে?

লিখেছেন
Manisha Ghosh
Manisha Ghosh
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।