গোটা দেশের সবেধন নীলমণি লাল টুকটুকে হিলম্যান      

ইংল্যান্ডে পাততাড়ি গুটিয়ে দেশে ফিরে আসছেন চিকিৎসক প্রশান্তকুমার বসু। তৈরি হচ্ছে লম্বা লিস্ট, কী সঙ্গে দেশে ফিরবে আর কী থেকে যাবে ইংল্যান্ডে। দেশে নিয়ে যাবার তালিকায় এক নম্বরে হিলম্যান সুপার ইম্প গাড়িটি। ছোট্ট এই গাড়িটি ডাক্তারবাবুর সর্বক্ষণের সঙ্গী। ১৯৬৫ আর ১৯৬৬ দু'বার হিলম্যান কন্টিনেন্ট ট্যুর করেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালির রাস্তায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে সে। একবার তো সুইজারল্যান্ড যাবার পথে রাস্তায় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। আকাশপাতাল ভাবছেন ডাক্তারবাবু। কী করবেন, কোথায় যাবেন, মেকানিক কোথায় পাওয়া যাবে, এদিকে ঘড়ি ছুটছে তরতর করে। ডাক্তারবাবু ভাবলেন দেখি চেষ্টা করে স্টার্ট নেয় কিনা। যেমন চেষ্টা করছেন ওমনিই স্টার্ট হয়ে গেল, আর সে এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে। আল্পসের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ডাক্তারবাবু আলতো হাতে স্টিয়ারিং ধরে রয়েছেন আর হিলম্যান পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অনায়াসে চলেছে।

১৯৬৯ সালে কলকাতা বন্দরে লন্ডন থেকে জাহাজে করে তিনি কলকাতায় এলেন। যত্ন করে নামানো হল হিলম্যানকে,  বাবু এসেছেন যাতে গায়ে কোনও আঁচড় না লাগে। জাহাজঘাটে হিলম্যানকে দেখতে ভিড় জমেছিল তার সৌন্দর্যের জন্য। কলকাতা থেকে বহু ছাত্র ইংল্যান্ডে এম.আর.সি.পি. বা এফ.আর.সি.এস করতে গেছেন এবং ওদেশে বেশ কিছুদিন বিভিন্ন হাসপাতালে কাজও করেছেন। এদের অনেকেই ইংল্যান্ডে গাড়ি কিনেছেন, চালিয়েছেন এবং দেশে ফেরার সময় গাড়িটিকে বিক্রি করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বিখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রভাস সেনগুপ্তর কথা। তিনি দেশে ফেরেন তাঁর প্রিয় মিনি অস্টিন গাড়িটিকে নিয়ে। কলকাতার রাস্তায় প্রায়ই এই ছোট্ট গাড়িটিকে দেখা যেত। ডা. সেনগুপ্ত অনেকদিন চলে গেছেন, হারিয়ে গেছে তাঁর মিনি অস্টিন।

সে যাই হোক, কলকাতায় ফিরে চিকিৎসক বসুর একমাত্র বাহন ছিল হিলম্যান সুপার ইম্প। ১৯৬৯ থেকে টানা প্রায় কুড়ি বছর ডাক্তারবাবু ব্যবহার করেছেন হিলম্যানকে। তারপর এক সময় অন্যান্য গাড়ি বাজারে এল, হিলম্যানের বয়স হয়েছে তারও ব্যবহার কমতে লাগল এবং একসময় সে বসে গেল। হিলম্যান সুপার ইম্প একসময় ব্রিটিশ পুলিশ ব্যবহার করত কারণ গাড়িটি অত্যন্ত শক্তপোক্ত এবং যে কোনও রাস্তায় ছুটতে সিদ্ধহস্ত। পিছনে ইঞ্জিন, অ্যালুমিনিয়াম হেড, এখনও এই গাড়ির রেস ইংল্যান্ডে হয়। আমাদের গল্পের গাড়িটি এ পর্যন্ত প্রায় ৯৯,০০০ মাইল চলেছে।

আরও পড়ুন-এই স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, এখন কেমন আছে নীলু?

হিলম্যান আর চলে না তাই ডাক্তারবাবু ঠিক করলেন ওকে বিক্রি করে দেবেন। শেষে আর বিক্রি করা হল না; জামাই প্রসূন হাজরাকে গাড়িটি দিয়ে দিলেন। গাড়িঅন্ত প্রাণ প্রসূনবাবু দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের অছি পরিষদের অন্যতম সদস্য। তিনি হাতে যখন হিলম্যানকে পেলেন ততদিন বহুদিন না ব্যবহারের ফলে সে চলবার ক্ষমতা হারিয়েছে।

শুরু হল হিলম্যানকে আবার স্বমহিমায় ফেরাবার পালা। এগিয়ে এলেন রাজীব অটো স্টোরের প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত গাড়ির কালেক্টার ও রেস্টোরার সঞ্জয় ঘোষ। সঞ্জয়বাবু চলে গেছেন কিছুদিন আগে এবং তার প্রয়াণে পূর্ব ভারতে পুরোনো গাড়িকে সারিয়ে, সাজিয়ে গুজিয়ে আবার চালু করার ক্ষেত্রে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

সঞ্জয়বাবু তাঁর ম্যান্ডেভিলা গার্ডেনের ওয়ার্কশপে শুরু করলেন হিলম্যানের নতুন প্রাণদানের লড়াই। একটু একটু করে কাজ শুরু হল। একদিন আবার তার ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল। সঞ্জয়বাবু প্রসূনকে বললেন আর চিন্তা নেই, এবার আবার পথে হিলম্যানকে দেখা যাবে। টুকটুকে লাল রঙে সেজে একদিন হিলম্যান সুপার ইম্প কলকাতার রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। যেখানেই সে যায় তাকে দেখতে ভিড় উপচে পড়ে। তার ছোট্ট চেহারা আকর্ষণ করে সবাইকে। এমন ইঞ্জিনিয়ারিং যে ছ’ ফুট উচ্চতার মানুষ অনায়াসে গাড়িটিতে বসে বেড়াতে যেতে পারেন। মাটি কামড়ে চলে সে। কলকাতার বহু গাড়ির ভিড়ে ওর মাননীয় উপস্থিতি অস্বীকার করা অসম্ভব। বর্তমানে তামাম ভারতবর্ষে হিলম্যান সুপার ইম্প মাত্র একটিই আছে।

গাড়িটির সঙ্গে প্রসূনবাবুর স্ত্রী শর্মিষ্ঠা দেবীর যোগ প্রায় তাঁর জন্ম থেকেই। ডা. বসু ছিলেন ওঁর পিসেমশাই। পিছনের সিট সরিয়ে রেখে ওখানে দোলনা লাগানো হত আর ছোট্ট শিশু শর্মিষ্ঠা দোলনায় দোল খেতে খেতে গাড়ি চড়তেন। সেই অনন্য অভিজ্ঞতার কথা আজও শর্মিষ্ঠা ভুলতে পারেননি।

প্রসূনবাবু একবার দক্ষিণেশ্বর মন্দির যাচ্ছেন হিলম্যান চেপে। ভোরবেলা, চারিদিকে কেউ নেই এমন সময় গাড়ির স্টার্ট গেল বন্ধ হয়ে, যেমনটা ডাঃ বসুর সঙ্গে হয়েছিল সুইজারল্যান্ড যাবার পথে। কিছুক্ষণ পরে দম নিয়ে আবার চলতে শুরু করে সুপার ইম্প।

 

এখন গাড়িটি চালায় প্রসূনবাবুর পুত্র প্রমিত। ওর হাতে সুপার ইম্প কথা বলে। বিভিন্ন গাড়ির প্রতিযোগিতা বা মেলাতে গিয়ে সকলের বাহবা কুড়োয় হিলম্যান। প্রায় পঞ্চাশ বছরের কাছে এসেও সে যুবক আর তার উপস্থিতি সকলের সম্ভ্রম কাড়ে। রাজভবনের বিশাল দরজার সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে যেন মুকুটহীন রাজা। আবার দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গনেও সে দাঁড়িয়ে ভক্তের মতো দীনহীন ভাবে। কলকাতার রাস্তাতে হিলম্যান সুপার ইম্পকে দেখলে মনে হয় সে এক বিরাট ইতিহাসের সাক্ষী, প্রবাহমান কালের গতিকে সে বহন করে নিয়ে চলেছে।

More Articles

;