ভারতের এই গ্রামে বিচার হয় স্বয়ং দেবতাদের! কড়া শাস্তি পান দেবদেবীরা

Bhangaram Devi Mandir: রায় ঘোষণা করা হলে সেই দেবী বা দেবতার মূর্তিকে মন্দির থেকে বের করে এনে একটি খোলা জায়গায় নির্বাসনে রাখা হয়।

Arunava Nag Roy
৪ মিনিট
ভারতের এই গ্রামে বিচার হয় স্বয়ং দেবতাদের! কড়া শাস্তি পান দেবদেবীরা

নানা ধর্মের, নানা সংস্কৃতির, নানা মানুষের মিলনক্ষেত্র ভারতবর্ষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক সংস্কৃতি থাকে, এমন অনেক লোকাচার থাকে যা সম্বন্ধে সেই অঞ্চলের মানুষ ছাড়া বাইরের মানুষ খুব একটা জানেন না। কয়েকদিন আগে আপনাদের এমনই একটি সংস্কৃতির কথা বলেছিলাম, অসুর পুজো! দুর্গাপুজোর সময় অসুরের বংশধররা অসুরের শোকসভা পালন করে থাকেন। সেই সময় তাঁরা বাড়ি থেকে বের হতে চান না পাছে তাঁদের অনিষ্ট হয়। যদিও সময় এখন পাল্টেছে, তাঁরাও লেখাপড়া শিখেছেন, আধুনিক হয়েছেন। ফলত সেই পূর্ববর্তী ছুৎমার্গ এখন আর নেই। তাঁরাও আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই পুজোর আনন্দ করেন। আজও এমন আরেকটি লোকাচারের কথাই বলব যা অনেকেই আগে কোনদিনও শোনেননি।

আজও যখন দু’পক্ষের মধ্যে বিবাদ হয় কোনও বিষয় নিয়ে, কোনও এক পক্ষকে মাঝেমধ্যেই বলতে শোনা যায়, কোর্টে দেখে নেব। কোর্ট বা আদালতের কাজ বিচার করা এবং ন্যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া। কোর্টে মূলত মানুষে মানুষেই মামলা-মোকদ্দমা হয়। বিচারও হয় মানুষেরই। কিন্তু কখনও কি শুনেছেন আদালতে ভগবানের বিচার হচ্ছে? ভগবানের আবার বিচার হয় নাকি? আজ্ঞে হ্যাঁ, হয়, আমাদের ভারতেই হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সারা কালনা অন্ধকারে ডুবিয়ে নিরঞ্জন হয় প্রতিমার! অবাক করবে মহিষমর্দিনীর ঐতিহ্য

Mahishamardini Puja: আগে পুজোর সময় এই ঘাটে হোরমিলার কোম্পানির স্টিমারে করে আসত বেলোয়ারি ঝাড় লণ্ঠন। তাই দিয়েই আটচালা সাজানো হতো।

ছত্তিশগড়ের একটি জেলা দান্তেওয়াড়া। মাওবাদী কার্যকলাপের জন্য প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে থাকে এই জেলা। এই দান্তেওয়াড়ার কাছেই আরেকটি জেলা হল বাস্তার। বাস্তার জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে খারকাই নদী যা নিজের মধ্যে সোনা বহন করে নিয়ে চলে। বাস্তারের একটি ছোট্ট গ্রাম কেশকাল নগর। এই গ্রামেই রয়েছে ভাঙ্গারাম দেবীর মন্দির। আশেপাশের পঞ্চান্নটি গ্রামে পূজিত হন এই দেবী। স্থানীয়দের মতে খুবই জাগ্রত তিনি। প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহে এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় যাত্রা। আশেপাশের নয়টি পরগনার মোট পঞ্চান্নটি গ্রামের থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন এই যাত্রা দেখতে। যাত্রার পর সারারাত ধরে চলে দেবীর বিচার সভা। তারপর সকালবেলা ঘোষণা করা হয় রায়। কখনও দেবতারা বেকসুর খালাস পেয়ে যান, কখনও আবার তাদের ভাগ্যে জোটে শাস্তি।

এই উৎসবে আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ আসেন এবং পুজো দেন। এরপর দেবীর কাছে গিয়ে এক এক করে দেবী দেবতাদের বিরুদ্ধে নিজেদের অভিযোগ জানান। কেমন অভিযোগ? ধরা যাক, কেউ অসুস্থ হয়েছেন। তার বাড়ির লোক দেবতার কাছে প্রার্থনা করেছেন মানুষটিকে সুস্থ করে দেওয়ার জন্য। ঠাকুর যদি তাকে সুস্থ না করেন তাহলে ঠাকুরের বিরুদ্ধে বিচার হয় ওই উৎসবে। শুধু তাই নয়, ভাল চাষবাস না হলে, বা দেবতা কোনও মনস্কামনা পূর্ণ না করলেও সেই দেবতার বিরুদ্ধে নালিশ করা হয় ভাঙ্গারাম দেবীর কাছে। স্থানীয়দের কথায়, ভাঙ্গারাম দেবীর মন্দিরের পুরোহিতের মধ্যে দেবী প্রবেশ করেন। এরপরই দেবী রায় ঘোষণা করেন। অপরাধের উপর নির্ভর করে হয় শাস্তির প্রকারভেদ। কখনও মন্দির থেকে ছয় মাসের নির্বাসন তো কখনও বা অনন্তকালের জন্য নির্বাসন, আবার কখনও নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ারও নিদান দেওয়া হয়। দেবী যেরকম নির্দেশ দেন সেরকমই পালন করেন ভক্তরা। নির্বাসনের রায় ঘোষণা করা হলে সেই দেবী বা দেবতার মূর্তিকে মন্দির থেকে বের করে এনে একটি খোলা জায়গায় নির্বাসনে রাখা হয়। সেক্ষেত্রে মূর্তির গায়ের থেকে গয়না সব খুলে মন্দির কর্তৃপক্ষ নিজের কাছেই রাখে এবং ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্বাসন দেওয়া হয় ওই দেবী বা দেবতাকে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দশমীর দিন পালিত হয় অরন্ধন, এই পুজোয় পান্তাভাত আর কচু শাকের ভোগেই সন্তুষ্ট দুর্গা

Durgapuja 2022: দশমীর দিন ভোগ দেওয়া হয় পান্তা ভাত, কচু শাক। কারণ, দশমীর দিন অরন্ধন হিসেবে পালিত হয়। সে দিন রান্না হয় না।

নির্বাসনের মেয়াদ শেষ হলে ঠাকুরকে আবার মন্দিরে স্থাপন করা হয়। এরপর দেব-দেবীদের নিজেদের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিলেই মন্দিরে প্রবেশ করানো হয় তাদের। এবার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে দেবী বা দেবতা কীভাবে প্রতিশ্রুতি দেবেন সাধারণ মানুষকে? মনে করা হয় ভাঙ্গারাম দেবীর মন্দিরের পুরোহিতের স্বপ্নে এসে ঠাকুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান। গ্রামবাসীরা বিশ্বাস করেন, ওই মন্দিরের পুরোহিতের মধ্যে দৈব ক্ষমতা রয়েছে। যে কোনও সমস্যার সমাধানের জন্য গ্রামবাসীরা সর্বপ্রথম মন্দিরের পুরোহিতের পরামর্শই নেন। প্রতিদিন ওই মন্দিরে হাজার হাজার ভক্ত নিজেদের সমস্যা নিয়ে আসেন এবং সমাধানের জন্য পুরোহিতদের সাহায্য নেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহে ভাঙ্গারাম দেবীর মন্দিরে এই যে যাত্রা এবং বিচারসভা অনুষ্ঠিত হয়, এখানে নারীদের প্রবেশ নিষেধ। এমনকি এই পুজোর প্রসাদও নাকি নারীদের খেতে নেই, এমনটাই নিয়ম।

ভাঙ্গারাম দেবীর মন্দির নিয়ে একটি লোককথা প্রচলিত আছে স্থানীয় এলাকায়। শোনা যায়, বাস্তারের রাজার স্বপ্নে দেবী দৈবাদেশ দিয়েছিলেন। দেবী রাজাকে বলেছিলেন যে তিনি তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করতে চান। এই স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাজা তাঁর প্রজা সমেত গেলেন গ্রামের সীমান্তে দেবীকে বরণ করে আনতে। কিন্তু এই সময়ে হঠাৎ প্রবল ঝড়ের উদয় হয়। ঝড়ের মধ্যেই দেখা যায় একজন ব্যক্তি ঘোড়ায় চেপে আসছেন। মনে করা হয়, দেবী প্রথমে ঘোড়ায় চড়ে একজন পুরুষের রূপে আবির্ভূত হন এবং তারপরে একজন নারীর রূপ ধারণ করেন। কেশকাল গ্রামের এই উপত্যকায় যেখানে দেবী প্রথম আবির্ভূত হয়েছিলেন সেখানেই তৈরি করা হয় দেবীর এই মন্দিরটি।

এক্ষেত্রে ছত্রিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী ভূপেশ বাঘেলের কাছে আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। ভুলেও ভাববেন না যে তার সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক রয়েছে বা সাক্ষাৎ হয়েছে কখনও। সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলে ইন্টারভিউয়ের সময় তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় ছত্তিশগড়ের এমন একটি দিক গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে যা ছত্তিশগড়বাসী ছাড়া আর কেউ জানেন না। তখনই তিনি এই সম্পূর্ণ ঘটনাটির কথা উল্লেখ করেন এবং সেখান থেকেই এই লেখার জন্ম।

লিখেছেন
Arunava Nag Roy
Arunava Nag Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।