সেই শিক্ষকদের কথা মনে পড়লেই ভিতরে টের পাই আস্ত টাইম-মেশিন

Teachers' Day 2023: শত হাতের লেখা প্র‍্যাক্টিসেও দীর্ঘকাল যে হাতের লেখার উন্নতি হয়নি, পঞ্চম শ্রেণিতে বিশ্বনাথবাবুর হাতের লেখা অনুকরণ করে সেই হাতের লেখাই উতরে গিয়েছিল।

Spandan Kar
৪ মিনিট
সেই শিক্ষকদের কথা মনে পড়লেই ভিতরে টের পাই আস্ত টাইম-মেশিন

এখন তো বাজারনির্ভর সময়। বাগ্মীরা বাজার দাপাচ্ছেন। যারা ভালো কথা বলতে পারেন, দর্শক এখন তাঁদের। সর্বত্যাগী সাধু বা মুনাফাখোর সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, সব্বাই এখন মোটিভেশনাল স্পিকার৷ পাঞ্চলাইন নির্ভর কথা, অন্ত্যমিল নির্ভর কথা। এসব শুনে আমার এক শিক্ষকের বলা কথাটা মনে পড়ে যায়, "মনে রাখবে, জীবনের গুরত্বপূর্ণ কথাগুলো কিন্তু আসলে খুব সহজ কিছু কথা।" আর সহজ কথা বলা যে সহজ নয় সেটা তো আজকাল দিব্যি টের পাই। লোকে আজকাল বড়ো বেশি কথা বলে। বেশি কথা মিউটেট হয়ে যায় বাজে কথায়। কিন্তু তাঁদের কেউ শাসন করে পিনড্রপ সাইলেন্সের ভয় দেখায়না।

ভালোবাসা অনুকরণপ্রিয়। যাকে ভালোবাসি আমরা তার মতো হওয়ার চেষ্টা করি। শত হাতের লেখা প্র‍্যাক্টিসেও দীর্ঘকাল যে হাতের লেখার উন্নতি হয়নি, পঞ্চমশ্রেণীতে বিশ্বনাথবাবুর হাতের লেখা অনুকরণ করে সেই হাতের লেখাই উতরে গিয়েছিল। পরবর্তীতে যারা টিউশনি করেছি, তারা সবাই জানি, আমাদের পড়ানোর ধরন কত শিক্ষকের পড়ানোর ধরনের ব্যর্থ অনুকরণ মাত্র। পড়ানো হয়, তবু তাঁদের মতো ম্যাজিক তৈরি হয় না। চমৎকার উদাহরণ আসে না তাঁদের মতো। আসে না ওঁদের মতো মুদ্রাদোষ। আমরা বড্ড নিঁখুত। তাই আমাদের মিমিক্রিও সম্ভব নয় অফপিরিওডে৷

যে বয়সে শিক্ষাগুরুর ভালো-খারাপ নির্বাচন শুরু হয়, তখন কিন্তু পরিমাপের ফিতে হিসেবে একটা সহজ জিনিস থাকে, কে পরীক্ষায় কড়া গার্ড দেন আর কার গার্ডে আমরা একটু নিশ্চিন্ত থাকতে পারি। কিন্তু পরবর্তী জীবনে, কড়া গার্ড দেওয়া সেই সমস্ত ত্রাসদেরই বেশি মনে থাকে, দেখেছি।

শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভালোবাসা এমনই, যেখানে ভাগীদারের সংখ্যা বেশি। তাই কার ভাগে কতটা প্রশ্রয় আর ভালোবাসা পড়লো সেটাও মাপতাম আমরা। একবার হয়েছিল কী, এক ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নের উত্তরে আমায় ও আমার এক সহপাঠীকে শিক্ষক 'রাইট' দিয়েছেন। তারপর আমরা দু'জনে মিলিয়ে দেখেছি কার রাইট বেশি লম্বা। তাতেও নিশ্চিত হতে না পেরে স্কেল দিয়ে মেপে দেখেছি কে কত সেন্টিমিটার বেশি ভালোবাসা পেলো! স্কেল যে শুধু শিক্ষকদের নয়, ছাত্রদেরও অস্ত্র, সেই প্রথম বোঝা। তখন আমাদের শ্রেণীভেদ বলতে এক্সেলেন্ট, ভেরি গুড গুড আর ব্যাড। শ্রেণিসাম্য আসত অফ পিরিওডের বকবকে।

অফ পিরিওডের চিড়িয়াখানা সামলানোর জন্যও কিছু মাস্টার থুড়ি রিং-মাস্টারেরা থাকতেন। কোন ক্লাসকে কুইজে ব্যস্ত রাখতে হবে, কাদের জাদুকাঠি কবিতা-আবৃত্তি আর কাদেরই বা ডিমান্ড শরদিন্দু বা সত্যজিতের গল্প— সেই পালস বুঝতেন জয়ব্রতবাবু, গিরিবাবু, আশিকবাবু বা মিঠুম্যামদের মতো কিছু মানুষ। নিজের মতো করে কিছু বলতে বলা যে কতটা আত্মবিশ্বাস দেয় তা অনেক পরে বুঝেছিলাম। নিজেকে তুচ্ছ ভাবার কারণগুলিই যে আসলে তুচ্ছ, তা বুঝতে শেখা সেই ক্লাসগুলোতেই। মোড়ক খুলে বেরিয়ে আসার জন্য কারওর কারওর অফ পিরিওড লাগে। নইলে জানা যেত নাকি, চমৎকার উপপাদ্য করতে পারা ছেলেটি পদ্যতেও নেহাত মন্দ নয়?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্গতি হতে চলেছে প্রেসিডেন্সির মতোই

Jadavpur University Ragging : এ রাজ্যে কতদিন ধরে কলেজগুলির ছাত্র ইউনিয়নের ভোট হয়নি কেউ খেয়াল রেখেছেন?

আমাদের প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকা যেমন ছিল, তেমন তাঁদেরও প্রিয় ছাত্রছাত্রী থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। সেই প্রিয় হয়ে ওঠার ক্রাইটেরিয়ায় কেবল মেধা বিচার্য ছিলো না। যে ছেলেটা নিজের উদ্যোগেই রোজ ব্ল্যাকবোর্ড পরিস্কার করে রাখত, তালিকায় ছিল সে-ও। ক্লাসের কারওর হাত কেটে গেলে লাল ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া, ফুটবলের টিম তৈরি করা, সরস্বতী পুজোর উদ্যোগ নেওয়া কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রপ জোগাড় করে দেওয়া — প্রিয় হত তারাও। একটু আধটু পড়াশোনা করলে যেমনটা প্রশ্রয় পাওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে, তেমনটা আমিও পেয়েছিলাম। একটু বকবকের স্বাধীনতা, খানিকটা ফাজলামোর অধিকার — পেয়েছিলাম সবই। শুধু সেইসব শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়, বর্তমানে আমি যতটা যা হয়েছি, সেগুলো সেই প্রশ্রয়ের প্রতি ন্যায় বিচার তো? নাকি আরও কিছু হওয়ার ছিল? পেরোনোর ছিল আরও কিছু সেতু? জানা নেই!

আমরা তাঁদের যতটা মনে রেখেছি, তাঁরাও কি ততটাই মনে রাখেন আমাদের? আমাদের চল্লিশ-পঞ্চাশজনের বিভাগের জন্য একজন শিক্ষক থাকলেও, তাঁদের কাছে আমরা চল্লিশ-পঞ্চাশ জনই। তার মধ্যে এতগুলো শ্রেণি, এত বছর, এত কৃতি ছাত্রছাত্রী। সেখানে কলেজে কোনও কাজে গেলে অধ্যাপক যখন নাম পদবি সমেত চিনে নিতে পারেন, বলে দিতে পারেন কোনও নির্দিষ্ট দিনের ঘটনা, তখন মনে হয় কলেজ-জীবনে উৎপাত করে নিজের নামটা অন্তত স্থায়ী করে দিতে পেরেছি। কত ঘটনা কোনও স্যারের মুখে গল্প হয়ে বেঁচে থাকবে কলেজের করিডোরে। ধুলো মেখে পড়ে থাকবে বেঞ্চগুলোর পাশে, যেখানে বেঞ্চে খোদাই নিজের নামের ওপর নতুন রঙের প্রলেপ পড়বে সামনের বছর।

জীবনটা শপিং-অ্যাপের উইশলিস্ট নয়, যে শুধু প্রিয় জিনিসই থাকবে। অনেক অপ্রিয় শিক্ষকেরাও রয়েছেন। তাঁদের কথা বলাটাও দরকার৷ জোর করে নিজের কাছে প্রাইভেট টিউশন পড়তে বলা শিক্ষিকা, তার কাছে না পড়লে কম নম্বার দেওয়া শিক্ষিকা, তার কাছে পড়লে প্রশ্ন বলে দেওয়া শিক্ষক, তার কাছে ছাড়া অন্য কারোর কাছে পড়লে ঈর্ষাকাতর ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পড়া শিক্ষক, ভুল জিনিস রাইট দিয়ে দেওয়া শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীদের বেধড়ক পেটানো গৃহশিক্ষক, অশ্রাব্য গালাগালি দেওয়া গৃহশিক্ষক, উলঙ্গ করে বাইরে বের করে দেওয়া গৃহশিক্ষক, অপছন্দের ছাত্রছাত্রীদের উন্নতি সহ্য করতে না পারা শিক্ষক এবং সর্বোপরি সিলেবাস না জেনেও ভুলভাল পড়াতে থাকা শিক্ষক — তাঁরাও কিন্ত আমাদের কক্ষপথে এসেছেন। তাঁদেরকেও মনে রেখেছি। শিখতে পেরেছি কেমন হতে নেই। তাঁদেরকেও প্রণাম জানালাম।

বিদ্যালয়ের আয়ু কমে আসছে। কমে আসছে শিক্ষকদের সাথে কাটানো সময়ের দৈর্ঘ্য। অনলাইন ক্লাসে নানা প্রজন্ম মিশছে ঠিকই, সবাই কেমন টবের গাছ হয়ে যাচ্ছে। জমির গাছের মতো শিকড় নামছে না গভীরে। অফপিরিওড এর জায়গা নিচ্ছে অফলাইন। পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে না কেউ টিফিন পিরিওডে৷ খাওয়াচ্ছে না কেউ রিটায়ারমেন্টের দিনে। প্রেমিকার দেওয়া আদরনাম না-পেলেও শিক্ষকদের দেওয়া খ্যাপানো-নাম তো থাকতো হামেশাই৷ সেইসব নাম মনে পড়লে নিজের ভিতরে এক টাইম-মেশিন টের পাই।

লিখেছেন
Spandan Kar
Spandan Kar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।