যেখানে সেখানে কেন এত তীব্র হয়ে যায় চুমু খাওয়ার ইচ্ছা?

Kissing in Public: পুরুষের লালায় অধিক পরিমাণে টেস্টোটেরন থাকে, যা যৌন তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করে, দোসর হিসেবে জোটে ডোপামিন ও সেরোটোনিন।

Shamim Haque Mondal
৩ মিনিট
যেখানে সেখানে কেন এত তীব্র হয়ে যায় চুমু খাওয়ার ইচ্ছা?

সম্প্রতি কালীঘাট মেট্রোতে এক যুগলকে চুম্বনরত অবস্থায় দেখা গেছে। সেই নিয়ে রে-রে করে উঠেছেন নেটিজেনরা। আসলে ‘পাবলিক ডিসপ্লে অফ অ‍্যাফেকশান’ বা ‘পিডিএ’ সব ক্ষেত্রে সমাজ অনুমোদন করে না। মা যখন সন্তানকে আদর করার জন্য চুমু খান, সে হাটেবাজারে যেখানেই হোক, মানুষজন বিশেষ আপত্তি করেন না কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক লোকজনকে এইভাবে ভালোবাসার আদানপ্রদান করতে দেখলেই অধিকাংশই চোখ টাটান। কোনটা উচিত, কোনটা অনুচিত— সেই পর্যালোচনা করে দিস্তে দিস্তে প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, হবেও। কিন্তু এর পিছনে বিজ্ঞানটা কী? ঠিক কোন রসায়ন কাজ করে, যে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে কাছের মানুষকে পাশে পেলেই কেউ কেউ হারিয়ে যান অন্য রাজ্যে? এত কেন তীব্র হয় চুম্বনের বাসনা? কেন এত টান অনুভব করেন মানুষ?

অন‍্য আর পাঁচটা প্রাণীর মধ্যে মানুষই কেন এভাবে নিবিড় চুমু খায়? আসলে এর ভিতরে লুকিয়ে আছে শরীর ও মনের এক গভীর যোগাযোগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক গর্ডন গ্যালাপ জুনিয়রের মতে, প্রাচীনকালে মা শক্ত খাবার মুখে চিবিয়ে নরম করে বাচ্চাকে খাইয়ে দিতেন, সেই থেকেই চুম্বনের উৎপত্তি। বিশিষ্ট জৈব-নৃতাত্ত্বিক হেলেন ফিশার মনে করেন, মানুষের বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সঙ্গী বেছে নেওয়া ও প্রজনন, আর চুম্বন তারই উৎস।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জোর করে ঠোঁটে চুমু খান নায়ক, বাধ্য হতে হয় নগ্ন চরিত্রে, কানন দেবী এক অজানা 'বনফুল'

Kanan Debi: অভিভাবকহীন নিচু ঘরের মেয়ে হওয়ায় তাঁকে টাকা-পয়সার লোভ দেখিয়ে নগ্ন দৃশ্যে বাধ্য করা হয়। এ রকম একটি ছবি হলো ‘বাসবদত্তা’।

মানুষের ঠোঁটের প্রান্তভাগ অজস্র স্নায়ুর মিলনক্ষেত্র, চুম্বনের সময় সেগুলি সক্রিয় হয়ে মস্তিষ্কে সুখানুভূতির সংকেত পাঠায়। গ্যালাপ মনে করেন, অনেক মানুষই প্রথম যৌন সম্পর্কের কথা ভুলে গেলেও, জীবনের প্রথম চুম্বনের কথা কখনই ভুলতে পারেন না। চুম্বনের ফলে মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোনগুলি ক্ষরিত হয়, ফিশার এটিকেই প্রেমের তাড়না বলে মনে করেন। বিষয়টা অনেকটা পন্ডারমোটিভ ফোর্সের মতো। আসলে, ডোপামিনের সঙ্গে ভালোবাসার অনুভূতির এক নাড়ির যোগ আছে!

ফিশারের মতে, মানুষের প্রজনন সম্পর্কিত তিনটি আলাদা আলাদা স্তর আছে— যৌন অনুভূতি পরিচালনা, তীব্র প্রেমের অনুভূতি ও গভীর আকর্ষণের তাড়না। পুরুষের লালায় অধিক পরিমাণে টেস্টোটেরন থাকে, যা যৌন তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করে, দোসর হিসেবে জোটে ডোপামিন ও সেরোটোনিন। ফলে তাড়না আর যায় কোথায়! এইসময় আবার মস্তিষ্কে কাজ শুরু করে অক্সিটোসিন, শারীরবিদ‍্যায় যার পোশাকি নাম ‘কাডল হরমোন’। ফিশার তাঁর গবেষণায় দাবি করেছেন, অক্সিটোসিন কেবল মানসিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতিই তীব্র করে না, শরীরের স্ট্রেস বা চাপের জন্য দায়ী কর্টিসল হরমোনের মাত্রাও কমিয়ে দেয়। পার্ক বা সিনেমাহলের আলোছায়ার মাঝে হরদম চুম্বনে লিপ্ত সঙ্গী বা সঙ্গিনীরা যদি জানতেন চুমুর এই মেকানিজম! মনে পড়ে গ্যালাপের সেই বিখ্যাত স্বীকারোক্তি,

"এটি একটি অচেতন মিথস্ক্রিয়া…যে সম্বন্ধে বেশিরভাগ লোকের কোনও ধারণা নেই।"

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কেন এত জনপ্রিয় ফরাসি চুম্বন?

History of French Kiss: কীভাবে শুরু হবে চুমুপ্রথা? দেখা হলে বা বিদায়বেলায় কেবল দু'কথায় সম্মতি অর্জন- আমরা কি চুমু দিতে পারি?

আসলে কেবল শারীরবৃত্তীয় তাড়নার জন্য মানুষ চুম্বনে লিপ্ত হয় না। এর পিছনে অনেক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। টেস্টোস্টেরন ও ইস্ট্রোজেনের প্রভাব ছাড়াও কেউ যখন অন‍্য কারও প্রতি প্রবল ভাবে শারীরিক বা মানসিকভাবে আকৃষ্ট হন, তখন মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসরিত হয়। তাছাড়াও ঘনিষ্ঠতা, বিশ্বাস এবং স্নেহের মতো অনুভূতিগুলিও অনেক সময় চুম্বনের ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে। কারণ চুম্বন হরেকরকম আবেগ প্রকাশের অন‍্যতম এক মাধ‍্যম। যেমন আমেরিকা, কানাডাসহ পাশ্চাত্যর অনেক দেশেই চুম্বন স্নেহ, ভালোবাসা বা রোম্যান্টিসিজম দেখানোর একটা সামাজিকভাবে স্বীকৃত মাধ্যম।

কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ১৫৫ জন মহিলা এবং ১৯৪ জন পুরুষ শিক্ষার্থীদের উপর একটি সমীক্ষা চালান, তাঁদের সঙ্গীদের সঙ্গে সম্পর্কের খুঁটিনাটি বিষয়ে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৩২% মহিলা ও ৩৭% পুরুষই কোনও না কোনওভাবে পিডিএ-র সঙ্গে জড়িত, যাদের স্বীয়ভাগের মুখ‍্য উদ্দেশ্য অন্য লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করা। অর্ধেকেরও বেশি মহিলার বক্তব্য, তারা অন্য লোকেদের ঈর্ষান্বিত করার জন্যই প্রকাশ্যে পুরুষের সঙ্গে চুম্বন করতে চান এবং তিনভাগের একভাগ মহিলা স্বীকার করেছেন যে তাঁরা স্রেফ খ্যাতির জন্য এটি করেছেন। আবার পুরুষদের ভেতরে শতকরা ৫৯ ভাগের দাবি, সমাজে ভাবমূর্তি বাড়াতে তাঁরা এটি করেছেন।

তবে এখন ভারতের মতো তথাকথিত উন্নয়নশীল, রক্ষণশীল দেশগুলোতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জনসম্মুখে এই 'দেখনদারি' কেন? এই কৌতূহলের পর্যালোচনায় কানসাস ছাড়াও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাই গুচ্ছ গুচ্ছ যুগলদের নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছেন।সেখানে অন্য অনেক কারণের মধ‍্যে মনস্তাত্ত্বিক কিছু বিষয়ও উঠে এসেছে। অনেক যুগলই এতে লিপ্ত হন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার জন্য। কেউ আবার নিজেদের সাহস পরখ করে দেখতে চান যে জনসম্মুখে তাঁরা কতটা সাবলীল! এছাড়া লোকজনকে ঈর্ষান্বিত করার কারণ তো আছেই। শারীরবৃত্তীয় ও মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন জটিল টানাপড়েনে তিলোত্তমার আনাচে কানাচে, মেট্রোর সিঁড়িতে দু-এক জোড়া অতি উৎসাহী যুগল নজরে পড়তেই পারে। তবে, সমাজ কী বলবে- এই প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি, বিজ্ঞান কী বলছে এই যুক্তিও জানতে হবে। ঠোঁটের স্পর্শ শুধুই গতানুগতিক দৃষ্টিতে দোলাচল তোলে না, আসল দোলাচল তো হরমোনে। সেটুকু মাথায় রাখলেই হয়তো প্রকাশ্যে চুমু বিষয়ক সামাজিক 'ধাক্কা' কেটেই যাবে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।