বিশ্বের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন ঘটেছিল এই বাংলায়, জানেন কীভাবে জন্ম হয়েছিল পুরুলিয়া জেলার

The world's longest language movement : হিন্দি আগ্রাসন থেকে মাতৃভাষাকে ছিনিয়ে এনেছিল বাঙালিরা, পুরুলিয়ার মাটিতে আজও রয়ে গিয়েছে সেই ইতিহাস

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
বিশ্বের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন ঘটেছিল এই বাংলায়, জানেন কীভাবে জন্ম হয়েছিল পুরুলিয়া জেলার

বছরের এই একটা দিন তাক থেকে নামিয়ে ফুল চন্দন দেওয়া হয় বাংলা ভাষাকে। তার পর আবার যে কে সেই, আধুনিক যুগে এটাই দস্তুর। শিশুর ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হওয়া থেকে শুরু হয়ে যায় বাংলার প্রতি উপেক্ষাটা। তাই হাই, হ্যালোর যুগে বাংলা ভাষা নিয়ে মাতামাতি যেন বড্ড বেমানান। তবুও বছর বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আসে। ধুলো ঝাড়া হয় মাতৃভাষার। আর এই ধুলোর আস্তরণ থেকে বেরিয়ে আসে কত শত ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন বলতেই বাংলাদেশের কথা সর্বাগ্রে মনে আসে আমাদের। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য যে লড়াই তার সাক্ষ্য দেয় এপার বাংলাও। পুরুলিয়া জেলার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে সেভাবে চর্চা হয় না ঠিকই কিন্তু এটিই বাংলা তথা বিশ্বের দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন। সময়টা ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর। দীর্ঘ ৪৫ বছরের লড়াই শেষে সেদিন জন্ম হয় বাংলার একটা নতুন জেলা, পুরুলিয়ার। যার নেপথ্যে আসলে রয়েছে দীর্ঘতম ওই ভাষা আন্দোলনটিই।

আরও খানিকটা পিছিয়ে যাওয়া যাক। ১৯১১ সাল, সেবারের মতো ঠেকানো হল বঙ্গভঙ্গ, কিন্তু কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত হল দিল্লিতে। পাশাপাশি নতুন করে ভারতের মানচিত্রে সংযুক্তি ঘটল দুটি জেলার। বিহার এবং উড়িষ্যা। ঠিক এই সময় মানভূম এবং ধলভূম এই দুই জেলাকে দুই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হল। এদিকে এই দুটি জেলারই প্রধান ভাষা হল বাংলা। অথচ বিহার এবং উড়িষ্যা মানেই হিন্দি অধ্যুষিত এলাকা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বাংলা ভাষার ওপর হিন্দি আগ্রাসন নিয়ে যে গলা ফাটানো হয় তার শুরু হয়েছিল ওই অত বছর আগেই। বিহার এবং উড়িষ্যার হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল মানভূম এবং ধলভূম জেলার বাংলা ভাষাভাষীরা। একট দুটো দিন নয়, এই লড়াইয়ের মীমাংসা হতে কেটে গিয়েছিল টানা ৪৫ টা বছর। প্রথম দিকে লড়াই কিছুটা থিতিয়ে পড়লেও ১৯৪৮ সাল থেকে আবারও ঘুরে দাঁড়ান আন্দোলনকারীরা। তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে ভারতের তথা পৃথিবীর দীর্ঘতম ভাষা আন্দোলন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
এ ভাষা বোঝে না সকলে, কেন রহস্যে মোড়া হিজড়েদের উল্টিভাষা?

Hijra Language Ulti Bhasha: হিজড়েদের এই গোপন ভাষাটি ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মুসলিম হিজড়েদের মধ্যে হিজড়া ফারসি এবং হিন্দু হিজড়েদের মধ্যে 'গুপ্তি ভাষা' বা 'উল্টি ভাষা' নামে পরিচিত।

“বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান, ক্ষিপ্ত তীর ধনুক...”, এই গান যেন যথার্থতা খুঁজে পায় লাল মাটির দেশেই। ১৯৪৮ সাল থেকেই তীব্রতর আকার ধারণ করে আন্দোলন। বাংলা ভাষাভাষীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হিন্দি ভাষার প্রভাব। স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে চাকরি এবং সরকারি যে কোনও কাজেই হিন্দির ভাষার প্রয়োগ তীব্রতর হয়। এত দিন ধরে ভাষা আন্দোলনের ধিকিধিকি যে আগুন জ্বলছিল, এবার তাতেই যেন ঘৃতাহুতি পড়ে। আর নয়, লড়াই শুরু হয় জানকবুল।

প্রাথমিক স্তর থেকে সরকারি অনুমোদিত স্কুল সব জায়গাতে একরকম জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া শুরু হয়, ওখানকার বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে বাংলা ও হিন্দিতে শিক্ষা শুরু হলেও আদিবাসী অঞ্চলগুলিতে কেবল হিন্দি ভাষায় শিক্ষা প্রদান শুরু হয়। বাঙালিরা বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাদের ওপর শুরু হয় জুলুমবাজি, এমনকী কেউ বাংলা ভাষাতে কথা বললেও তাদের ওপর শারীরিক অত্যাচার শুরু করে হিন্দি ভাষাভাষীরা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভাষার মারপ্যাঁচে গলদঘর্ম বাঙালির! জানেন কি চেয়ার-টেবিলের বাংলা প্রতিশব্দ?

Bengali Language : ইংরেজির দাপটে হারাচ্ছে প্রকৃত বাংলা শব্দ

বাঙালির ওপর এই অকথ্য অত্যাচার মালভূমের কেউই মেনে নিতে পারেনি, সেখানকার সকল বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণআন্দোলনের ডাক দেন। অতুল চন্দ্র ঘোষ, লাবণ্যপ্রভা ঘোষ, অরুণচন্দ্র ঘোষ ও বিভূতিভূষণ দাশগুপ্ত সহ ৩৭ জন নেতা কংগ্রেস দল ত্যাগ করে লোক সেবক সংঘ গঠন করেন বাংলা ভাষার পদমর্যাদার দাবিতে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দেয় এই গোষ্ঠী।

প্রতিবাদ শুরু হয় আদিবাসীদের হাত ধরেই। তাঁদের টুসু গানই হয়ে ওঠে লড়াইয়ের প্রাথমিক অস্ত্র। “শুন বিহারী ভাই তোরা রাইখতে লারবি ডাং দেখাই”, গানে গানেই তীব্রতর হয় আন্দোলন। নারীরাও মুঠো শক্ত করে এগিয়ে আসেন আন্দোলন।

লাবণ্য প্রভা ঘোষ ভবানী মাহাতো রেবতী ভট্টাচার্যের মতো মহিলারা সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন আন্দোলনে। বিহারী দুষ্কৃতীরা লাবণ্যপ্রভা ঘোষের চুলের মুঠি ধরে বাড়ি থেকে বের করে তার ওপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালায়। ছাড় পাননি রেবতী ভট্টাচার্য এবং ভবানী মাহাতোও। বিহার পুলিশ পিটিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় জঙ্গলে ফেলে দেয় রেবতী ভট্টাচার্যকে। অন্যদিকে ভবানী মাহাতোর ওপরও চলে অকথ্য নির্যাতন। কুখ্যাত বিহার জননিরাপত্তা আইনে ভবানী মাহাতোদের গ্রেফতার পর্যন্ত করা হয়।

এরপর আসে সেই দিন। শুরু হয় লং মার্চ। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল বিহার থেকে যাত্রা শুরু করে টানা ১৬ দিন চলে পায়ে হেঁটে কলকাতা আসার সফর। অবশেষে ৬ মে হাজার হাজার মানুষের সেই মিছিল কলকাতায় এসে পৌঁছয়। ভাষাই তাদের একমাত্র অস্ত্র। সমাবেশ ঠেকাতে সেদিন কলকাতায় ১৪৪ ধরা জারি হয়। তাতেও অবশ্য ভ্রুক্ষেপ করে না আন্দোলনকারীরা। প্রায় চার হাজার জন আন্দোলনকারীকে সেদিন গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু এতো কিছু করেও ঠেকানো যায়নি আন্দোলন। ততদিনে আগুন ছড়িয়েছে অনেকদূর। অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১৭ অগাষ্ট লোকসভায় এবং ২৮ অগাষ্ট রাজ্যসভায় সরকার বাধ্য হয় বাংলা বিহার সীমান্ত নিয়ে নয়া হল পাশ করতে। ১ সেপ্টেম্বর সই হয় বিলে। অবশেষে ১ নভেম্বর মানভূমকে তিন টুকরো করে বাঙালি অধ্যুষিত ১৬ টি থানা জুড়ে জন্ম হয় নয়া পুরুলিয়া জেলার।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।