এবার ওষুধেই সারবে ক্যানসার! ঐতিহাসিক আবিষ্কারের পিছনে কারা?

 

 

ইতিহাসে প্রথমবার এক ওষুধেই শরীর থেকে উধাও মারণ ক্যানসার। কোনওরকম অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই। যুগান্তকারী এই ফলাফল চারদিকে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সকলেই শুনে অবাক। সত্যি তবে এমনটাও সম্ভব! চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি কঠিন এই রোগের সঙ্গে লড়াইয়ে যোগ্য হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ওষুধের ট্রায়ালে একশো শতাংশ সাফল্য মিলেছে। আর তাতেই চর্চায় উঠে এসেছে 'ডোস্টারলিম্যাব' নামক ওষুধটি।

তথ্য বলছে, ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। স্তন ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার এবং মলদ্বার ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এই ওষুধের সাফল্যের হিসেবনিকেশ করে গবেষকরা তাঁদের স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছলে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষকে এই রোগের হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে। যা নিঃসন্দেহে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে মানুষকে।

ওষুধের ট্রায়ালের বিবরণ
ঘটনাটি ঘটেছে আমেরিকার ম্যানহাটানে মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে। ওই হাসপাতালে ক্যানসার-আক্রান্ত ১৮ জন রোগীর ওপর ওষুধটির ট্রায়াল করা হয়। এঁদের প্রত্যেকেই রেক্টাল ক্যানসার বা মলদ্বারের ক্যানসারে আক্রান্ত। দেখা যায়, কেমোথেরাপি বা অপারেশনের যন্ত্রণাময় দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্‍সা ছাড়াই ১০০ শতাংশ নিরাময় হয়েছে ক্যানসার। এমনকী, কোনও পরীক্ষাতেই তাঁদের শরীরে ক্যানসারের কোষ আর পাওয়া যায়নি। সমস্ত রোগীদের মধ্যেই রেক্টাল ক্যান্সার ছিল স্থানীয়। অর্থাৎ, টিউমারগুলি মলদ্বারের মধ্যে এবং কিছু ক্ষেত্রে লিম্ফ নোডগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তবে অন্যান্য অঙ্গগুলিতে টিউমার ছড়ায়নি।

আরও পড়ুন: ক্ষুদ্র প্রোটিন রোধ করবে করোনা, ভারতীয় বিজ্ঞানীদের আশ্চর্য আবিষ্কার

ডোস্টারলিম্যাব নামের ওষুধটি ছ'মাস ধরে এই ১৮ জন রোগীকে দেওয়া হয়েছিল। উল্লিখিত সময়ের জন্য প্রতি তিন সপ্তাহে ওষুধটি নির্ধারিত মাত্রায় তাঁদের দেওয়া হয়েছিল। জানা গেছে, নতুন এই ড্রাগ অ্যান্টিবডির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। ট্রায়ালের শেষে যে ফলাফল পাওয়া গেছে, তাতে অবাক গোটা বিশ্ব। সমস্ত রোগীরই শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়, যেমন, এন্ডোস্কোপি, পজিট্রন এমিসন টমোগ্রাফি বা পেট স্ক্যান বা এমআরআই স্ক্যান। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, কিছুতেই কোনও টিউমার শনাক্ত করা যায়নি।

মলদ্বারের ক্যানসার-সংক্রান্ত এই গবেষণাটি ২০১৭ সালে মেমোরিয়াল স্লোয়ান কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের ডা. লুইস এ. ডিয়াজ জুনিয়র দ্বারা পরিচালিত একটি ক্লিনিকাল ট্রায়াল থেকে অনুপ্রাণিত। এই ক্লিনিকাল ট্রায়ালের সঙ্গে জড়িত রোগীরা প্রত্যেকেই আগে কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন এবং অস্ত্রোপচার-সহ ক্যানসার নিরাময়ের সমস্ত চিকিৎসার মধ্য দিয়েই গিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কাবু করা যায়নি এই মারণ-রোগকে। ট্রায়ালের পর অবশ্য কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশনের প্রয়োজনও পড়েনি। রোগীদের দেহে ট্রায়াল শেষ হওয়ার ২৫ মাস পর্যন্ত চিকিৎসা-পরবর্তী কোনও জটিলতাও লক্ষ করা যায়নি, ক্যানসারের পুনরাবৃত্তির কোনও লক্ষণও দেখা যায়নি শরীরে। গবেষণাটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন ওষুধ কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন।

উল্লিখিত হাসপাতালের অন্যতম চিকিৎসক লুইস এ. ডিয়াজের কথায়, "প্রতিটি রোগী ক্যানসার থেকে সম্পূর্ণভাবে সেরে উঠেছে। আমার মনে হয় ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম।" ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালান পি. ভেনকুক-ও বলেছেন, "যাঁদের ওপর ট্রায়াল হয়েছে ওষুধটি, সকলেই ক্যানসার-মুক্ত হয়েছেন।" সবরকম ক্যানসার রোগীর ক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন আরও বেশি মানুষের ট্রায়ালের।

ভারতে এই ওষুধের দাম কত হতে পারে?

পরবর্তীকালে এই ওষুধ ব্যবহারের জন্য যদি অনুমতি দেওয়াও হয়, তাতেও তা সাধারণ ভারতীয়র নাগালের বাইরে থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ এই ড্রাগের প্রতি ডোজের দাম পড়বে ৮.৫৫ লক্ষ টাকা। সেক্ষেত্রে ভারতের মতো দেশে প্রধান বাধা হয়ে উঠতে পারে এর দাম। দিল্লি এইমসের সার্জিক্যাল অঙ্কোলজির অধ্যাপক ডা. এম. ডি. রায় বলেছেন, কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপির মাধ্যমে ভালোভাবেই ক্যানসার-আক্রান্তদের চিকিৎসা করা সম্ভব। প্রায় ১০ থেকে ১৫% ক্যানসার রোগীদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনই হয় না।

ইমিউনোথেরাপি-র সবথেকে বড় সমস্যা হলো, তা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই তিনি বলেছেন, "নির্ভুল ওষুধ, যেমন বিশেষ ধরনের ক্যানসারের জন্য বিশেষ ইমিউনোথেরাপির ওষুধ ব্যবহার করা, ভারতে এখনও এটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য নির্ভুল ওষুধ ভারতেও তৈরি সম্ভব। এটি বাজারে আসতে কমপক্ষে আরও দশ বছর সময় লাগবে।" এখনও চতুর্থ পর্যায়ের ট্রায়াল বাকি রয়েছে এই ওষুধের।

 

 

More Articles

;