কলকাতার গর্ব ট্রাম এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে? মুছে যাচ্ছে যে স্মৃতিগুলো

কোথাও মেট্রোর কাজ চলার জন্য ট্রাম ডিপো বন্ধ করা হয়েছে, আবার কোথাও ঝড়ে উপড়ে পড়া তার ঠিক করা হয় নি বলে ট্রাম চলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
কলকাতার গর্ব ট্রাম এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে? মুছে যাচ্ছে যে স্মৃতিগুলো

"ট্রাম গাড়ি চলেছে ঘটাং ঘটাং"- 'ভূতের ভবিষ্যৎ' সিনেমার বিপ্লবী গায়ক ভূত পাবলো পত্রনবীশের গাওয়া গান এখনও নেটমাধ্যমে পাওয়া গেলেও গত দু'-তিন বছর বাড়ির সামনের বড় রাস্তায় ট্রামের ঘটাং ঘটাং আওয়াজ শুনতে পাই না। কলিকাতা চলিতেছে নড়িতে নড়িতে- রবীন্দ্রনাথের সেই পংক্তি যেন মূর্ত হয়ে ওঠে ট্রামে। কলকাতার ঐতিহ্যর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ট্রাম। জীবনানন্দের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও যেমন জড়িয়ে ট্রামের সঙ্গে, তেমনই জড়িয়ে অনেক নস্টালজিয়াও।

ছোটবেলায় আমার সবচেয়ে পছন্দের পরিবহণের মাধ্যম ছিল ট্রাম। তখনও শহরজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল অসংখ্য ট্রামলাইন । ছোটবেলায় প্রায় প্রত্যেক রবিবার বিকেলে বাবা ট্রামে করে ধর্মতলা অথবা ডালহৌসি নিয়ে যেত, মনে পড়ে। আমরা ট্রাম স্টপেজে দাঁড়িয়ে ১ অথবা ২ নম্বর ট্রামের জন্য অপেক্ষা করতাম। তখনও ট্রামের আলাদা স্টপেজ ছিল, যদিও বাসের জন্যে নির্ধারিত স্টপেজেও ট্রাম দাঁড়াত। ভিক্টোরিয়া আর ময়দানে যে ট্রাম রুট আমরা অসংখ্য সিনেমা এবং বিজ্ঞাপনে দেখি, সেই সবুজ ঘাসে ঢাকা ধর্মতলা-খিদিরপুর রুটের ট্রামে কিন্তু সেই সময়ে আমরা অনেকেই চড়েছি।

ট্রামের চেহারা ছিল মার্কামারা। কাঠের জানলা, হলুদ আলোর বেশি ওয়াটের ধুলোপড়া পুরনো বাল্ব, বড় বড় পাখা আর ড্রাইভারের কেবিনের আলগা হয়ে যাওয়া পাল্লা। একটা সময় কোনও ট্রামেই সেকেন্ড ক্লাসে পাখা ছিল না। ফার্স্ট আর সেকেন্ড ক্লাসের সিট আলাদা ধরনের। অনেকেরই সবচেয়ে পছন্দের সিট ছিল ফার্স্ট ক্লাসের একদম প্রথম একজনের বসার সিট। ওই সিটটা দুটো কারণে পছন্দ ছিল মানুষের। সেই সিটে বসলে ড্রাইভারের কেবিনের ভেতর দেখা যেত, কারণ বেশিরভাগ ট্রামের ড্রাইভার কেবিনের দরজা আটকাতে যে ইট ব্যবহার করত, সেটা ট্রাম চলতে শুরু করার একটু পরেই ঝাঁকুনিতে সরে যেত। ড্রাইভার কীভাবে ট্রাম চালায়, সেটা জানার কৌতূহল অনেকেরই থাকে। আর তাই ওই সিটটাই সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আদর্শ। আমি প্রথমবার ট্রামে চড়ার বহু বছর পরেও এটা জানতাম না যে, ড্রাইভারের পাশে স্টিয়ারিংয়ের মতো জিনিস কী কাজে লাগে? দ্বিতীয় কারণটা হল, এটা একা বসার সিট, জানলার ধারে, এখানে বসে শহরের দৃশ্য উপভোগ করার আনন্দই ছিল আলাদা‌।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঙালি ভুলেছে ঢাকাই পরোটার স্বাদ, রইল তার সেরা ঠিকানাগুলো

সাধারণত হিঙের স্বাদযুক্ত ছোলার ডালের সঙ্গেই পরিবেশন করা হয় এই পরোটা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম অনেকটা বদলাতে শুরু করেছিল। যদিও ট্রামের এই বদল নতুন নয়, কারণ, কলকাতার প্রথম ট্রাম যাত্রী পরিবহণ না, বরং পণ্য পরিবহণ করার জন্য নিজের যাত্রা শুরু করে। ট্রাম সব সময় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। তাই পুরনো কাঠের জানলা, হলুদ আলো এবং কাঠের চেয়ারের বদলে কাঁচের জানলা, সাদা আলো, আর গদি দেওয়া সিট নিয়ে সে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেয়েছিল। হয়তো রাস্তায় বেড়ে চলা গাড়িকে জায়গা করে দিতেই সে দুই কামরা থেকে এক কামরা নিয়ে চলতে শুরু করেছিল।

আমাদের আশপাশে চলা ট্রামগুলোর বয়স হয়েছে, শহর আর তাদের কথা ভাবছে না। চারপাশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা ট্রামলাইন উধাও হয়ে গিয়েছে। আমার বাড়ির কাছের দুটো ট্রাম ডিপো বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও মেট্রোর কাজ চলার জন্য ট্রাম ডিপো বন্ধ করা হয়েছে, আবার কোথাও ঝড়ে উপড়ে পড়া তার ঠিক করা হয় নি বলে ট্রাম চলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন পুরো শহরে হাতে গোনা রুটে ট্রাম চলে। অনেক ক্ষেত্রেই অব্যবহৃত অথবা ব্যবহৃত ট্রাম লাইন গাড়ি পার্ক করার জায়গায় পরিণত হয়েছে। ছোটবেলায় প্রায় প্রত্যেক বড় ক্রসিংয়ে যে অসংখ্য পয়েন্টম্যান দেখতাম, আজ তাদের কোনও দরকার নেই।

পরিবেশ বিদ্যার বইতে, "ট্রাম পরিবেশ-বান্ধব পরিবহণ" পড়ে পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার থেকে বেশি কিছু করি না। হাতে গোনা কিছু মানুষ কলকাতায় ট্রাম নিয়ে লড়ছেন, চেষ্টা করছেন এই ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার। তাঁদের লড়াই কত দূর সফল হবে জানা নেই, কিন্তু এই চেষ্টাটুকু দেখলে অন্তত মনে হয়, শহর এখনও জীবিত।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।