অযোধ্যার রামমন্দিরে ৬ কোটি বছরের পুরনো শালগ্রাম! ইতিহাস নাকি মিথ?

Shaligram Stones Ayodhya Ram Mandir : পবিত্র এই শিলা খোদাই করেই নাকি মন্দিরের জন্য রাম-সীতার মূর্তি তৈরি করা হবে বলে জানা গিয়েছে। তবে সেই কাজ শুরু হতে এখনও খানিক সময় লাগবে।

inscript
৩ মিনিট
অযোধ্যার রামমন্দিরে ৬ কোটি বছরের পুরনো শালগ্রাম! ইতিহাস নাকি মিথ?

বাইরে থেকে দেখলে, বিশাল বড় দুটি পাথর। অন্যান্য পাথরের মতোই সাধারণ, কঠিন তার চেহারা। কিন্তু সেই পাথর দুটিকে ঘিরেই দেশজুড়ে উত্তেজনায় মাতছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। এই মুহূর্তে ভারতের খবরের শিরোনামেও রয়েছে এই দুটি পাথর। যে সে পাথর নয়, খোদ শালগ্রাম শিলা! আর এই শিলা দিয়েই তৈরি হবে অযোধ্যার রাম মন্দিরের রাম-সীতার মূর্তি তৈরির কাজ।

রাম মন্দির কেবল ধর্মের দিক থেকে নয়, ভারতের বর্তমান রাজ্য-রাজনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল এই বিতর্কের। তারপর গঙ্গা দিয়ে গড়িয়ে গিয়েছে অনেক জল। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রাম মন্দির নির্মাণের জন্য ট্রাস্ট গঠনের নির্দেশ দেয়। তারপরও বিতর্কের রেশ থামেনি। সেই আবহের মধ্যে ফের একবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেন রামলালা। ইতিমধ্যেই অযোধ্যার প্রস্তাবিত জায়গায় রাম মন্দিরের নির্মাণ কাজ চলছে। সেখানেই নিয়ে আসা হল এই বিরাট দুটি শালগ্রাম শিলা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ফের আতঙ্কে যাত্রীরা, ‘জয় শ্রী রাম’-এর বদলা নিতেই কি বারবার পাথর বৃষ্টি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে?

Bande Bharat Express: ফের আক্রান্ত বন্দে ভারত এক্সপ্রেস, তিনদিনের মধ্যে দ্বিতীয়বার হামলা ট্রেনে

একটির ওজন ১৮ টন, অন্যটি ১২ টন। মোট ৩০ টনের এই দু’টি শালগ্রাম পাথরের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল নেপালের কালীগণ্ডকী নদী থেকে এই বিশেষ পাথর দুটি পাওয়া গিয়েছে। করসেবকদের দাবি, এই শিলা প্রায় ৬ কোটি বছরের পুরনো। নেপাল থেকে ট্রাকে করে এই শালগ্রাম শিলা পৌঁছয় উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ মন্দিরে। সেখান থেকে ২ ফেব্রুয়ারি অযোধ্যার প্রস্তাবিত রাম মন্দিরে আনা হয়। তারপর থেকেই সমানে শুরু হয়েছে পুজো। পবিত্র এই শিলা খোদাই করেই নাকি মন্দিরের জন্য রাম-সীতার মূর্তি তৈরি করা হবে বলে জানা গিয়েছে। তবে সেই কাজ শুরু হতে এখনও খানিক সময় লাগবে। নকশা তৈরি করে, সেরা ভাস্করকে দিয়ে মূর্তি তৈরির কাজ করানো হবে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৪-এর মকর সংক্রান্তি তিথিতে রামলালার মূর্তির অভিষেক হবে।

শালগ্রাম শিলা বরাবরই ভারতের সনাতন ধর্মের স্রোতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। বিভিন্ন ধর্মীয় কাজে এই শিলার প্রয়োজন। স্বয়ং বিষ্ণুর প্রতীক হিসেবে মানা হয় এই বিশেষ শিলাকে। হিন্দু ধর্মের নিরিখে অত্যন্ত পবিত্র বলেও মানা হয়। কিন্তু সেটি সংগ্রহের জন্য একেবারে নেপালে যেতে হল কেন?

বিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে, এই শালগ্রাম শিলা আসলে জীবাশ্ম পাথর। ইংরেজিতে এর নাম Ammonite fossils। কয়েক কোটি বছর আগে যখন টেথিস সাগর থেকে হিমালয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তখন বহু প্রাণী, উদ্ভিদ সেই ভূকম্পন, বিপর্যয়ে প্রাণ হারায়। ধীরে ধীরে পলির নিচে চাপা পড়তে পড়তে একেবারে পাথরের আকার ধারণ করে। হিমালয় পাললিক শিলা দিয়েই তৈরি; কাজেই সেখানে এরকম জীবাশ্ম পাথর পায়া যাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর নেপালের ওপর দিয়েই হিমালয়ের বেশিরভাগ অংশটি গিয়েছে।

যে বিশেষ পাথরটির কথা বলা হচ্ছে, সেটি প্রধানত নেপালের কালীগণ্ডকী নদী সংলগ্ন অঞ্চলেই পাওয়া যায়। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, অন্যান্য অনেক জায়গায় শালগ্রাম শিলা পাওয়া গেলেও, গণ্ডকী নদী সংলগ্ন এই জায়গার শিলা একেবারে খাঁটি। পুরাণেও বর্ণিত রয়েছে একই কথা। সেখানে বলা হয়েছে, হিমালয়ের দক্ষিণে গণ্ডকী নদী সংলগ্ন অঞ্চলটির নাম ‘হরিক্ষেত্র’। এখানেই নাকি স্বয়ং বিষ্ণু শিলারূপে অবস্থান করছেন। আর সেই শিলাই শালগ্রাম বা নারায়ণী শিলা। আর পুরাণে, রামকে বিষ্ণুর অন্যতম অবতার হিসেবে মানা হয়। তাই গণ্ডকী নদীর আসল শালগ্রাম শিলা দিয়েই মূর্তি তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে এখানে সামনে আসছে অন্য প্রসঙ্গও। সামনের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে রয়েছে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। তার আগে ধর্মীয় রাজনীতির ধ্বজা ওড়াতেই কি আরও একবার রামলালার অবতারণা? কেন এমন কথা? ২০১৯ সালে মোদি সরকার দুটি কাজ করে। প্রথম, কাশ্মীরের বিশেষ ৩৭০ ধারা রদ। অন্যটি হল, রাম মন্দিরের স্থাপন। ১৯৯২ সাল থেকে যা ভারতের রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৯ সালেই ছিল গত লোকসভা নির্বাচন। রাম মন্দির, রামলালার হাত ধরে ২০১৪ ও ২০১৯- দুই বছরই নির্বাচনে জিতেছে বিজেপি। ২০২০-র দিল্লি বিধানসভা ভোটের আগে ট্রাস্ট গঠন সম্পূর্ণ করে মোদি সরকার। তারপর ২০২৪ সাল। আবারও একটা লোকসভা নির্বাচন। তাই কি এত ধুমধাম করে শালগ্রাম শিলার আবির্ভাব? ২০২৪-র মকর সংক্রান্তিতে রামের মূর্তির উদ্বোধনও হবে বলা হচ্ছে। ভোটই কি বড় বালাই? ধর্ম কি স্রেফ ক্ষমতা দখল আর ব্যবসার অস্ত্র? প্রশ্ন তো উঠছেই।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।