রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে সরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঠিক কী ঘটেছিল ৬ বছর আগে

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে সরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঠিক কী ঘটেছিল ৬ বছর আগে

গণহত্যা, পাশবিক নির্যাতন, ধর্ষণ- ৬ বছর আগের রোহিঙ্গা জীবনের অপরিসীম সেই গ্লানিকে মান্যতা দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন হলোকাস্ট মিউজিয়ামের এক সভায় মার্কিন স্বরাষ্ট্র সচিব অ্যান্তনি ব্লিঙ্কেন স্বীকার করে নিয়েছেন ২০১৬ সাল থেকেই ধারাবাহিক ভাবে মায়ানমারে নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা মুসলিমরা।

এক বিবৃতিতে মার্কিন স্বরাষ্ট্রসচিব বলেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবেই মনে করে বার্মিজ মিলিটারি মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর যে নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে তা অসাংবিধানিক এবং তা গণহত্যাই। মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মায়ানমার সরকারের এই আচরণ চূড়ান্ত অমানবিক’। স্বরাষ্ট্রসচিব পদে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ১৪ মাস পর প্রথম ব্লিঙ্কেন এই বিষয়ে মন্তব্য করলেন। রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির সহায়তায় এক দীর্ঘ নথি তৈরি করছে যা ভবিষ্যতে মায়ানমার সরকারের এই অত্যাচারের নিদর্শন হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে পেশ করা হবে। ইতিমধ্যেই হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মায়ানমার সরকারের এই নৃশংস আচরণের বিচার চলছে। যদিও এই বিষয়ে কোনও রকম সহযোগিতাই এ পর্যন্ত আউং সান সুচির সরকার করেনি।

রোহিঙ্গা গণহত্যা কী?

রোহিঙ্গা গণহত্যার শিকড় লুকিয়ে সুদূর অতীতে। ১৯৮২ সাল থেকেই মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। নানা ভাবেই রোহিঙ্গা জনজাতিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়েছে বার্মিজ সরকার। মায়ানমার সরকারের কাছে রোহিঙ্গাদের পরিচয় তারা বাঙালি। যে আরাকান অঞ্চল মূলত রোহিঙ্গাদের বাসস্থান ছিল তা বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত। ইংরেজ আমলের শুরু থেকেই আরাকানি মুসলিম ও বর্মি বৌদ্ধদের সংঘাতের ইতিহাসের শুরু। কয়েক শতক পেরিয়ে ও সেই দ্বন্দ্ব থামেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে জাতিঘৃণা ছড়িয়েছে মায়ানমার সরকার। বার্মিজ সেনার তরফে জাতি বিদ্বেষ ছড়ানোর ব্যাপারে সুচারু ভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

উত্তর-উপনিবেশ সময়ে ও আরাকান মুসলিমদের নিগ্রহের ঘটনায় কোনও ছেদ পড়েনি। ফলে বহু রোহিঙ্গাকেই বাস্তুভিটে ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় অন্যদেশে। মূলত পরশি দেশেই পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে যখন মায়ানমার রাষ্ট্রের মধ্যে থেকে রাখাইন প্রদেশকে স্বশাসন দেওয়ার দাবি ওঠে। এইসময়ই রাখাইন প্রদেশের সেনা ও পুলিশ ঘাঁটিতে আক্রমণের অভিযোগ ওঠে আরাকান মুসলিমদের বিরুদ্ধে। এই যুক্তি দেখিয়েই রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে নামে মায়ানমার সেনা। প্রায় সাত লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে দেশ্ ছাড়া হতে হয়। রাষ্ট্রসংঘের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২০০০ থেকে ৩০০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় বিভিন্ন ভুয়ো সংঘর্ষে। রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা গ্রামগুলিতে নির্বিচারে তাণ্ডব চালায় বার্মিজ সেনা।

সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার

মায়ানমারে ইন্টারনেট সংযোগ আসার শুরু থেকেই সচেতনভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয় জাতি ঘৃণা ছড়ানোর অস্ত্র হিসেবে। সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে দাবি করা হয় এক বৌদ্ধ মহিলাকে ধর্ষণ করেছে এক মুসলিম। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মান্দালয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবার একাধিক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য, জাতি ঘৃণা, গুলি করার আহ্বান জানানো হত সরাসরি।

রোহিঙ্গা গণহত্যার সময়ে বার্মিজ সেনাবাহিনীর তরফে একাধিক ভুয়ো নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় পেজ খোলা হয়। যেখান থেকে গণহত্যার পরিকল্পনা শুরু করে সেনাবাহিনী। লাগাতার ভাবে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে তুলে ধরার এবং মায়ানমারের জনগণের আই ওয়াশের কাজ শুরু হয় এভাবেই।

কেমন আছে রোহিঙ্গারা?

বাস্তুহারা হওয়ার পরে যেসব রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছিলেন তাদের অধিকাংশই সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে চলে আসেন। একুশ শতকের সবথেকে বৃহৎ উদ্বাস্তু মিছিল দেখেছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের একটা অংশ বাংলাদেশ এবং মায়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ও চলে আসে। যদি ও মায়ানমার সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের খাতিরে নয়াদিল্লি রোহিঙ্গাদের ভারতে সেইভাবে আশ্রয় দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময় রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারের কুটুপালং এলাকার রিফিউজি ক্যাম্পগুলিতে প্রায় ৮ লক্ষ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা বাস করে। এই মুহূর্তে এটিই বিশ্বের সবথেকে বৃহৎ উদ্বাস্তুদের আশ্রয়স্থল। ক্যাম্পগুলিতে অন্ত্যন্ত ঘেঁষাঘেঁষি ভাবে থাকতে গিয়েই ২০২১ সালের ২২ শে মার্চ ভয়াবহ অগ্নি কাণ্ড ঘটে রোহিঙ্গা রিফিউজি ক্যাম্পে। আগুনের বলি হয় প্রায় ১০,০০০ রিফিউজি ছাউনি। পানীয় জল, খাদ্যবণ্টন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। প্রায় ৪৫,০০০ হাজার রোহিঙ্গা রিফিউজি নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। প্রাণ হারান প্রায় ১৫ জন। আবার করোনা কালে সামাজিক দূরত্ব বিধি মানার শর্ত তো দূরে থাক নুন্যতম প্রাণ ধারণের জন্যই লড়াই করেছে এই কয়েক লক্ষ রোহিঙ্গা রিফিউজি।

এই এতগুলো মানুষের অসহায় বেঁচে থাকার দায় নেবে কে? যে শিশুগুলি পৃথিবীর আলো দেখল রিফিউজি ক্যাম্পের স্যাতস্যতে অন্ধকারে তারা কি আদৌ কোনদিন মাথার ওপর ছাদ পাবে! মার্কিন সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আদালতের মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান খানিক হলেও আশা জাগায় একুশ শতকের সবথেকে ভয়াবহ গণহত্যার প্রতিকার হয়তো মিলতেও পারে।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।