পোস্টার বয় থেকে ফ্যামিলি ম্যান— অন্দরের বিরাট, অন্তরের বিরাট

Virat Kohli: বিরাট একবারও নিজেকে গড়ে-পিটে নিতে চাননি সমাজের ফেলে দেওয়া টেমপ্লেটে। কারণ? বিরাট নিজের ভেতরের রক্তমাংসের বিরাট কোহলির নিঃশব্দ রক্ষক হয়ে থেকেছেন।

Arpan Gupta
৪ মিনিট
পোস্টার বয় থেকে ফ্যামিলি ম্যান— অন্দরের বিরাট, অন্তরের বিরাট

বাজার অর্থনীতি চায় তারকা— যে তারকার মূর্তির সামনে নতজানু হবে বাজার— যে বাজারের চাহিদা মেনে সে মূর্তির গায়ে পড়বে না কোনও ধুলোর আস্তরণ। আবার সেই তারকার সামান্যতম সামাজিক অবস্থানের হেরফের গড়ে দেবে প্রবল বিতর্কের পরিসর। দুই ক্ষেত্রেই, ব্যক্তি হয়ে ওঠে বাজারের নিয়ন্ত্রক। আর এই ব্যক্তিকে প্রতি দশকে খুঁজে নেয় বাজার নিজেই, তার নিজস্ব প্রয়োজনে। নয়ের দশকের উদার অর্থনীতি এই দেশের পোস্টার বয় হিসেবে যেমন প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল মারাঠি সেনসেশনকে, তার জোরেই সচিন তেণ্ডুলকর কেবল এক নাম থেকে হয়ে উঠেছিলেন ব্র্যান্ড! বিলিতি পণ্যের এদেশে ঘরে ঘরে ঢুকে পড়ার ভরসা হয়ে উঠলেন সচিন। মিডিয়াসহ সবরকম প্রচারমাধ্যমের উৎস থেকে সমস্ত শক্তি দিয়ে তৈরি করা হলো সচিনকে; তাঁর ক্রিকেটীয় জিনিয়াস, বাইশ গজে তাঁর উত্তুঙ্গ মেধা নিঃসন্দেহে সকলের চেয়ে দড়, কিন্তু তারপরেও সচিন সচিন হতে পারতেন না যদি না বাজার চাইত। তাই সচিনের অবসরের পরেই বাজারের প্রয়োজন পড়েছিল আরেকজন পোস্টার বয়ের। সেই চাহিদার বিশাল হাঁ-এর সামনে এসে দাঁড়ালেন ঝকঝকে তরুণ বিরাট কোহলি। হোবার্টের ইনিংসের পর তাঁর শরীরী ভাষা, বিশ্বকাপ ফাইনালে সচিন-শেহবাগের উইকেটের পর তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়ী ব্যাটিং, অ্যাডিলেডের সেঞ্চুরির পর হেলমেট খোলা আগ্রাসন— সবটাই নিঃশব্দে হয়ে গেছে বাজারের রসদ এবং বিরাট হয়ে উঠেছেন সচিনের পর এদেশের সবচেয়ে বড় পণ্য।

তবে, সচিন এবং বিরাটের মধ্যে থেকে গেছে এক সামান্য তফাত। কী তফাত? সচিন নিজের জীবনকে, ব্যক্তি ও পেশাদার জীবনের সুতোকে জুড়ে দিয়েছেন বৃহত্তর বাজারের চাহিদার সঙ্গে। তাই সচিনের জীবনের প্রতিটি বাঁকই প্রবলভাবে বন্দিত উপমহাদেশীয় জনতার মনে। যেমন ধরা যাক, নিজের বাবার মৃত্যুর পরেও দেশের হয়ে খেলে তবে বাড়ি ফেরা, নিজের স্ত্রী-সন্তানের চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখের পানসির অনেক আগে নিজের পেশাকে রাখা। ভারতীয় উপমহাদেশে আইকনের যে বাজার চলতি ছাঁচ, তাতে নিজেকে নিখুঁতভাবে বসাতে পেরেছিলেন সচিন। তাই অবসরের এতবছর পরেও সচিনের সঙ্গেই তুলনা করা হয় পরবর্তী তারকা-মহাতারকাদের।

তবে বিরাটের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিঞ্চিৎ আলাদা। তিনি গুডবয় ইমেজের ধারক নন, হাতে ট্যাটু, কৈশোরে বেপরোয়া, একাধিক বান্ধবী, বলিউডি নায়িকার সঙ্গে প্রকাশ্যে প্রেম-বিয়ে এবং সর্বোপরি নিজের সন্তান জন্মের সময়ে স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য ৩৬ রানে অলআউট হয়ে যাবার পরেও আডিলেড থেকে সোজা দেশে ফিরে এসেছেন— এই প্রতিটি ঘটনাই বিরাটকে ফেলেছে বিতর্কের মুখে। অথচ, বিরাট একবারও নিজেকে গড়ে-পিটে নিতে চাননি সমাজের ফেলে দেওয়া টেমপ্লেটে। কারণ? বিরাট নিজের ভেতরের রক্তমাংসের বিরাট কোহলির নিঃশব্দ রক্ষক হয়ে থেকেছেন। সেই অন্তঃলোকে প্রবেশাধিকার তিনি দেননি মিডিয়াকে— সেখানে আছে কেবল পরিবার ও প্রিয় মানুষেরা।

বিরাট টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট আসার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিকে শুরু হলো হইহই। বিরাট-বন্দনা থেকে সচিনের সঙ্গে তুলনা, পুরনো ব্যাটিং ক্লিপিংস থেকে প্যাটার্নাল লিভ বিতর্ক সবই হলো। আর এরই মাঝে একটি পোস্ট করলেন তাঁর স্ত্রী অনুষ্কা শর্মা। প্রথম লাইনে তিনি লিখলেন-

‘ They’ll talk about the records and the milestones- but I’ll remember the tears you never showed...’

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আইপিএলের কিং কোহলি নন, সব ধরনের ক্রিকেটের আজীবন 'ঈশ্বর' সচিনই

Inscript Debate: একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সচিন তেন্ডুলকর মোট রান, বাউন্ডারি, নট আউট, মোট অর্ধশতরান, মোট শতরানের সংখ্যায় বিরাটের থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন।

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে এই অনুষ্কাই সেই অনুষ্কা শর্মা যাঁকে বারবার দোষারোপ করা হয়েছে বিরাটের খারাপ ফর্মের কারণে। বিন্দুমাত্র অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নেট-নাগরিকেরা। বিরাট যখন সন্তান জন্মের সময়ে স্ত্রীর পাশে থাকার জন্য ফিরে এলেন, তখনও এই মেয়েটিকে কাঠগড়ায় তুলেছিল বড় সংখ্যক জনতা। সেই অনুষ্কাই বোধহয় টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর দিন শ্রেষ্ঠ উপহারটি দিলেন তাঁকে এবং বিরাট কোহলির বাজারের আইকন হয়ে ওঠা মূর্তির পিছনে ব্যক্তি বিরাটকে প্রতিষ্ঠা দিলেন বিরাট সংখ্যক জনতার মনে।

আমাদের দেশে সুবৃহৎ ঔপনিবেশিকতার ইতিহাসের কারণে আজও বেশিরভাগ মানুষ মনে করে থাকেন, একজন ব্যক্তি যিনি দেশের জন্য কিছু করছেন, যিনি দেশের পতাকা হাতে ময়দানে নামছেন কিংবা সীমান্তে যুদ্ধ করছেন তাঁর ব্যক্তিগত জীবন গৌণ। মুখ্য কেবল দেশপ্রেম। এই সামাজিক ধারণাকে ভেঙেছেন রক্তমাংসের বিরাট। তিনি জানেন এবং নিশ্চিতভাবেই মানেন, একজন মানুষের কাছে সবার আগে তাঁর পরিবার। সেই পরিবারের ছোট ছোট সুখ-দুঃখকে জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া মানে কখনই কর্তব্যে অবহেলা নয়। দ্বিতীয়ত, পরিপাটি আঁচড়ানো চুল, টাক-ইন করে পরা শার্টের যে ধোপদূরস্ত ইমেজ সমাজের কাছে গুড-হিউম্যান হিসেবে স্বীকৃত, তাকেও ভেঙেছেন বিরাট। হাতে ট্যাটু, চুলে রঙ করা কোনও ছেলেও যে নিজেকে নিংড়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ব্যাটার হতে পারে সেই ধারণাকে গেঁথে দিয়েছেন দেশবাসীর মনে গত একযুগ ধরে। আর এই স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে গিয়েই বিরাটকে ঝরাতে হয়েছে অনেক রক্ত, শারীরিকভাবে নয়— মানসিকভাবে। এই মানসিক যন্ত্রণার সমস্ত কান্না সযত্নে আগলে রেখেছেন অনুষ্কা শর্মা, যিনি বিরাটের স্ত্রীয়ের চেয়েও বেশি বন্ধু-আত্মজন। এই বাজার বিরাটকে যত পণ্যায়িত করতে পেরেছে, তত ক্লান্ত হয়ে বিরাট ফিরে এসেছেন অনুষ্কার কাছে এবং ব্যক্তি বিরাট এখানে প্রমাণ করে দিয়েছেন, সামগ্রিকভাবে একজন মানুষের শেষ আশ্রয় তাঁর প্রিয় মানুষটিই, আর কিচ্ছু নয়।

এই ক্রমশ বেড়ে চলা অসহিষ্ণু আবহে, গত দশ বছরে বিরাট কোহলি নিঃশব্দে পাশে থেকে গেছেন তাঁর স্ত্রীয়ের, তাঁর সমস্ত আঘাত যেমন বে-আব্রু হয়েছে তাঁর সামনে, তেমনই তিনি অনুষ্কাকে আগলেছেন বাজারের আগুনের আঁচ থেকেও। অবসরের পর তাই অনুষ্কা সেই পারস্পরিক বন্ধুতার স্মারকটুকুই তুলে ধরলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, আর বিরাট কোহলি বাজারের ঝকঝকে পোস্টার বয় থেকে শেষবেলার আলোয় হয়ে উঠলেন একজন আদ্যোপান্ত ফ্যামিলি ম্যান— যে ইমেজের সঙ্গে বৈরিতা নেই ক্রিকেটার বিরাটের, বরং বিরাটের এই নির্মাণই আগামীদিনে বাজারে তারকা তৈরির ছাঁচ হয়ে উঠবে বলেই বিশ্বাস।

লিখেছেন
Arpan Gupta
Arpan Gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।