সত্যিই এসএসসি মামলা থেকে সরলেন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়? যে সত্যি চাপা পড়ে যাচ্ছে

আদৌ কোনও বিরল বা বেনজির ঘটনা এটা নয়৷ এমন মনে করার কোনও কারণই নেই যে বিশেষ কোনও মহলের চাপে বা বিশেষ কাউকে খুশি করতে এমন কাণ্ড ঘটেছে। নিয়মিতভাবেই হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির নির্দেশে এবং পরামর্শে বিচারপতিদের বিচার্য বিষয় বা Roster-Determination নির্ধারিত হয়। কোন বিচারপতি কোন ধরনের মামলার বিচার করবেন, তা আগাম জানানো হয় এই Roster বা তালিকার মাধ্যমে। এই তালিকা গোপনীয়ও নয়। আইনজীবী বা বিচারপ্রার্থীদের সুবিধের জন্য এই Roster/Determination প্রকাশ্যে আনা হয়।

কলকাতা হাই কোর্টও ৩ জুন স্বাভাবিক নিয়মেই এই তালিকা প্রকাশ করেছে। আর তার পরেই বিস্ময়করভাবে সেই তালিকা নিয়ে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কেন এই চর্চা? কারণ একটাই, জনপ্রিয়তায় এই মুহূর্তে যে কোনও সেলিব্রিটিকে দশ গোল দেওয়া বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিচার্য বিষয়ে বদল ঘটানো হয়েছে‌। জানানো হয়েছে, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে ৬ জুন থেকে SSC-সংক্রান্ত নতুন কোনও মামলার আর শুনানি হবে না। এই ধরনের মামলা এখন শুনবেন বিচারপতি রাজশেখর মান্থা।

এই ঘোষণাতেই শোরগোল পড়েছে একাধিক মহলে, বিশেষত রাজনীতির ময়দানে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই অকারণে নিজেদের সুবিধেমতো এর ব্যাখ্যা করে নিয়েছে৷ ফলে আনন্দ এবং দুঃখ, জয় এবং পরাজয়, সব ধরনের প্রতিক্রিয়াই সামনে আসছে৷ এবং সত্যি বলতে কী, একদম বিনা কারণে অথবা না বুঝে রাজনীতির লোকজন যেসব ভাষায় মন্তব্য করছেন, তা নিতান্তই স্ট্যান্ড-আপ কমেডির সমতুল।

আরও পড়ুন: এবার ইডির নজরে রাহুল সোনিয়া, কী পরিণতি অপেক্ষা করছে?

হাই কোর্টের রোস্টারে বলা হয়েছে, বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বেঞ্চে SSC-সংক্রান্ত নতুন কোনও মামলা আর যাবে না। এই ধরনের মামলার বিচার করবেন বিচারপতি রাজশেখর মান্থা। আর প্রাথমিক শিক্ষা ও মাদ্রাসা সার্ভিস সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি করবেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, যেসব SSC-নিয়োগ দুর্নীতি এবং সিবিআই তদন্তের মামলা আগেই বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে চলছে বা পার্ট-হার্ড হয়ে রয়েছে, সেই সব মামলার বিচার করবেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ই‌। এর অর্থ, রাজ্যের দুই মন্ত্রী, পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং পরেশ অধিকারীর বিরুদ্ধে SSC-নিয়োগ দুর্নীতি এবং সেই দুর্নীতির সিবিআই তদন্ত-সংক্রান্ত মামলার বিচারের ভার বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতেই থাকছে‌‌‌‌। অন্যদিকে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত যাবতীয় মামলার বিচার করবেন বিচারপতি কৌশিক চন্দ‌। প্রসঙ্গত, এই বিচারপতি চন্দর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, তিনি অতীতে বিজেপির সক্রিয় নেতা ছিলেন৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একুশের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর যে 'ইলেকশন-পিটিশন' করেছিলেন, সেই মামলার বিচারের ভার দেওয়া হয় এই বিচারপতি কৌশিক চন্দকেই। মামলাকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে প্রবল আপত্তি জানানো হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, বিচারপতি কৌশিক চন্দ একসময়ে বিজেপির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এর ফলে মামলার রায় প্রভাবিত হতে পারে। এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে চিঠি পাঠানো হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে। তবে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রাজেশ বিন্দল উত্তর না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিচারপতি কৌশিক চন্দর বেঞ্চেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবেদন জানান, মামলাটি যেন তিনি না শোনেন। এই ইস্যুতে সওয়ালের পর ২০২১-এর ৭ জুলাই বিচারপতি কৌশিক চন্দ এক নির্দেশে জানান, তিনি এই মামলা থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু মামলাকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে একজন বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর অতীত নিয়ে, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে কোর্টের ভেতরে এবং বাইরে আলোচনা চলছে, তা বিচারব্যবস্থার অবমাননার শামিল। সেই কারণেই মামলাকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন বিচারপতি চন্দ। এর পরই মুখ্যমন্ত্রীর 'ইলেকশন-পিটিশন' অ্যাসাইন করা হয় বিচারপতি শম্পা সরকারের এজলাসে ৷ এবার সেই বিচারপতি কৌশিক চন্দর এজলাসেই হবে এ-রাজ্যের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত যাবতীয় মামলার বিচার। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ-সহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বেশ কিছু মামলা চলছে হাই কোর্টে। এসবের বিচার করবেন বিচারপতি চন্দ।

ওদিকে নতুন রোস্টার অনুসারে বিচারপতি শম্পা সরকারের এজলাসে হবে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, অতিসক্রিয়তার মামলার বিচার। শুধুই এই বিচারপতিরা নয়, নতুন রোস্টারে প্রায় সব বিচারপতিরই বিচার্য বিষয়ের বদল ঘটেছে। বিচার্য বিষয়ের এমন বদল রুটিনমাফিক বলেই ধরা হয় হাই কোর্টে।

এদিকে, বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাস থেকে SSC-দুর্নীতির বিচারের ভার সরিয়ে নেওয়ায় আইনজীবীদের একাংশ খুশি। তাঁদের বক্তব্য, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় SSC-সংক্রান্ত মামলায় অতি-সক্রিয়তা দেখিয়েছেন৷ এবার আর তেমন না-ও হতে পারে। এই ধরনের মামলা এবার শুনবেন বিচারপতি মান্থা। আইনি মহলের অন্য অংশের বক্তব্য, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়কে SSC-সংক্রান্ত মামলার বিচারের ভার দেওয়া না হলেও এবার থেকে তিনি শিক্ষা-সংক্রান্ত যে ধরনের মামলা শুনবেন, তার মধ্যে রাজ্যের 'টেট-পরীক্ষা' সংক্রান্ত প্রতিটি মামলা থাকছে। টেট নিয়ে অজস্র বিতর্ক রয়েছে। প্রাথমিক টেট পরীক্ষা না দিয়েই প্রাথমিক স্কুলে চাকরি পেয়ে যাওয়া নিয়ে বহু মামলা এখনও বিচারাধীন অন্য বেঞ্চে। এই মামলাগুলি বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের এজলাসে গেলে ভবিষ্যতে কতখানি শোরগোল উঠবে, তা নিয়ে আইনি তথা রাজনৈতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে।

এদিকে, এখনও পর্যন্ত SSC-দুর্নীতি সংক্রান্ত ৮টি মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়। অন্তর্বর্তী প্রতিটি নির্দেশে ‘Heard in Part’ বলে উল্লেখ করে দিয়েছেন বিচারপতি। এর অর্থ, তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এসব মামলার আংশিক শুনানি হয়েছে। তাই নিয়ম অনুসারে ওই ৮টি মামলা বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতেই থাকছে। ফলে চালু থাকা SSC-দুর্নীতির মামলা, যার সঙ্গে দুই মন্ত্রী জড়িত, সেইসব মামলাও যথারীতি চলবে এই একই বিচারপতির এজলাসে। তবে SSC-দুর্নীতির নতুন সব মামলা আগামী ৬ জুন থেকে চলবে বিচারপতি রাজশেখর মান্থার ঘরে।

সিঙ্গল বেঞ্চের পাশাপাশি বদল করা হয়েছে আপিল বেঞ্চও। তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে, এসএসসি, আপার প্রাইমারির মামলাগুলি এতদিন পর্যন্ত বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন শুনতেন আপিল-ডিভিশন বেঞ্চে। কিন্তু এবার থেকে আপিল বেঞ্চের মামলাগুলি শুনবেন বিচারপতি সুব্রত তালুকদারের ডিভিশন বেঞ্চ।

বিচারপতিদের কোনও রাজনৈতিক পরিচয় হয় না। বিচারপতি মান্থার সতীর্থ বিচারপতি কৌশিক চন্দর বিরুদ্ধে এক সময় তাঁর বিজেপি যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। যদিও তাতে বিচারপতির কাজের পরিসরে কোনও সমস্যা হয়নি। এর কারণ, বিচারপতিরা একমাত্র আইন ও সংবিধানের কাজেই দায়বদ্ধ। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তার প্রভাব কখনওই পড়ে না বিচারপতির আসনে বসার সময়। অতীতেও যেমন হয়নি, আগামী দিনেও হবে না বলেই আইনজীবীদের বদ্ধমূল ধারণা।

More Articles

;