নুপুর শর্মা বিতর্কে ভারতের পাশে 'বন্ধু' বাংলাদেশ, নেপথ্যে যে কারণ

 

সম্প্রতি, পয়গম্বর বিতর্ক নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। বিজেপি মুখপাত্র নুপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ভারত সরকার। একের পর এক ইসলামিক দেশগুলি যেভাবে ভারতকে আক্রমণ করে চলেছে, সাম্প্রতিককালে সেই দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং সৌদি আরবের মতো দেশগুলি যখন প্রতিনিয়ত মোদি সরকারকে তুলোধোনা করে ছাড়ছে, সেই মুহূর্তে ভারতের বিরুদ্ধে কোনও কড়া প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে একপ্রকার তাদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে চলেছে 'বন্ধু' বাংলাদেশ। এই ঘটনার প্রায় ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনওরকম মন্তব্য প্রকাশ করেনি শেখ হাসিনা সরকার। তবে এই ভারতপ্রীতির পিছনে কারণ কি? এক্ষেত্রে অবশ্য বেশ কয়েকটি কূটনীতিক দিক সামনে উঠে এসেছে; যে কারণে ওপার বাংলার সরকার এহেন ভূমিকা নিয়েছে।

পয়গম্বর বিতর্কের পর থেকেই ইসলামিক দেশগুলি ভারতকে ক্রমশ কোণঠাসা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া থেকে শুরু করে ভারতীয় দ্রব্যসামগ্রী বয়কট করার ডাক পর্যন্ত দিয়েছে তারা। যদিও তাদের সেই সিদ্ধান্ত কত দূর কার্যকর হবে, সেই নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠে গিয়েছে। প্রসঙ্গত, একটি পরিসংখ্যান বর্তমানে দাবি করেছে, ইসলামিক দেশগুলিতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী যথা মাংস, চিনি এবং একাধিক জিনিসপত্র রপ্তানির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে রয়েছে ভারত। করোনার সময়কালে এ-সকল দেশে প্রয়োজনীয় দ্রব্য রপ্তানি করে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় তারা। ফলে ভারতীয় জিনিসপত্র বয়কট করলে তা সেই সকল দেশের পরিকাঠামোর ওপরেই বজ্রাঘাত করবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তবে এর মাঝেই ভারতকে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি তারা। এক্ষেত্রে অবশ্য প্রথম থেকেই ভারতের পাশে থেকেছে বাংলাদেশ। তবে তাদের এহেন পদক্ষেপের নেপথ্যে শেখ হাসিনার বেশ কয়েকটি কৌশল রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার এই প্রসঙ্গে কেন এখনও চুপ করে রয়েছে, সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। প্রায় ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত কোনওরকম প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকে। এক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ মহল প্রধান দু'টি কারণকে তুলে ধরেছে। প্রথমত, বর্তমানে ভারত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক এবং সামাজিক সম্পর্ক বেশ ভালো জায়গায় রয়েছে। উল্লেখ্য, অতীতে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে মনোমালিন্য থাকলেও বর্তমানে মোদি সরকার এবং শেখ হাসিনা সরকারের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি হয়েছে বলে খবর। যার মধ্যে স্থল, বাণিজ্য-সহ অন্যান্য একাধিক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার সেই সম্পর্ক কোনওভাবেই তলানিতে নিয়ে যেতে চায় না। এছাড়াও দ্রুত ভারত সফরে আসার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তার আগে আপাতত ভারতকে চটাতে চায় না সরকার।

আরও পড়ুন: মুসলিম বিশ্বের চাপে বেকায়দায় ভারত, সামাল দিতে কী অস্ত্র মোদি-শাহর?

প্রথম কারণ অবশ্য ভারতপ্রীতি হলেও দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। মনে করা হচ্ছে, যদি বর্তমানে পয়গম্বর বিতর্ক নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে মুখ খোলে বাংলাদেশ সরকার, তবে সেই মুহূর্তেই সে-দেশের মৌলবাদী এবং উগ্রপন্থী সম্প্রদায়ের মানুষ আন্দোলনের পথে নামতে পারে। এমনকী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ পথে নামলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ফলে সেক্ষেত্রে অশান্তি আরও বাড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। অশান্তির প্রসঙ্গটি আটকানোর কারণেই ভারতের বিরুদ্ধে আপাতত কঠোর ব্যবস্থা বা কড়া প্রতিক্রিয়া দেয়নি সে-দেশের সরকার এবং ভবিষ্যতেও তারা একই ভূমিকা অবলম্বন করতে চলেছে বলে মত সকলের। 

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনও মন্তব্য প্রকাশ না করা হলেও সে-দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও অন্যান্য বিভিন্ন মহল থেকে বেশ কয়েকটি মন্তব্য সামনে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশের সুশাসনের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে গোটা বিশ্বের নিকট। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্তব্য, "ভারত সরকারের তুলনায় ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে আমাদের সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ করে চলেছে আর সেই কারণেই আমরা নিশ্চিন্তে এখানে বসবাস করতে পারছি।"

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান খন্দকার গোলাম মাওলা নকশেবন্দি বলেন, "সম্প্রতি ভারতের বুকে পয়গম্বর বিতর্কটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও সেই প্রসঙ্গে কোনওরকম মন্তব্য করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ করা উচিত ছিল, কিন্তু সেই প্রসঙ্গে কোনওকিছুই করা হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তবে বর্তমানে যখন সৌদি আরব, কুয়েত এবং কাতারের মতো দেশগুলো ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়ার পথে নেমেছে, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে চলেছে ভারত সরকার। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। বরং আমাদের বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে আমাদের সরকার যথেষ্ট কঠোর।"

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বাংলাদেশের দুর্গাপুজো প্রসঙ্গ এবং এনআরসি প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মাওলা নকশেবন্দি বলেন, "দুর্গাপুজোর সময় কুমিল্লা এবং তার আশপাশের এলাকায় কিছু মানুষ অশান্তি সৃষ্টি করেছিলেন, যার ফলে বাংলাদেশজুড়ে সেই সময় পরিস্থিতি অত্যন্ত সরগরম হয়ে পড়ে। অবশ্য পরবর্তীকালে সরকার দ্বারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং বেশ কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার পর্যন্ত করে নিরাপত্তা বাহিনী। তবে আমাদের সরকারের তরফে একাধিক কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্যদিকে ভারত সরকার এই ধরনের ঘটনায় চুপ করে থাকে। এনআরসি বিতর্ক নিয়ে যখন গোটা দেশ উত্তাল হয়ে পড়েছিল, তখনও সেদেশের সরকার সেই একই পন্থা অবলম্বন করে।"

তবে শুধু তিনি নন, সমালোচনা ভেসে এসেছে অন্য একটি মহল থেকেও। সম্প্রতি বাংলাদেশে ইসলামি ঐক্য জোটের এক নেতা বলেন, "আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সরকারের অবদান আমরা কোনওভাবে অস্বীকার করতে পারি না। আমরা সব সময় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে গোমাংস বিতর্ক থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ এবং সম্প্রতি পয়গম্বর বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং এর ফলে শান্তির পরিবেশ বিরাজ করতে পারে না। আমাদের দেশে যখন সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হন, তখন আমরা সবাই মিলে আন্দোলনের পথে নামি। ফলে বর্তমানে এই বিতর্কও ভারত সরকারের কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলে আমরা মনে করি।"

 

 

More Articles

;