স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে নয়! জানেন, হস্তমৈথুন ঠেকাতেই তৈরি হয়েছিল কেলগ'স কর্নফ্লেক্স!

History of Kellogg's Cornflakes: শোনা যায়, তিনি এবং তাঁর স্ত্রী পৃথক ঘরে ঘুমোতেন এবং তাদের বৈবাহিক জীবনে তারা কোনওদিন যৌনতায় লিপ্ত হননি।

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে নয়! জানেন, হস্তমৈথুন ঠেকাতেই তৈরি হয়েছিল কেলগ'স কর্নফ্লেক্স!

মানুষ যবে থেকে স্বাস্থ্য সচেতন হতে শেখার গুরুত্ব বুঝল, প্রাতঃরাশে লুচি-ছোলার ডাল, রুটি-আলুভাজার, ডিম-অমলেটের গুরুত্ব গেল কমে। সকাল সকাল ভাজাভুজি, তেল-ঘি খেলে যে কী কী হতে পারে তা নিয়ে দিস্তে দিস্তে নিবন্ধ কাগজে ছাপা হতে থাকল, মোবাইলে ঘুরতে থাকল, আড্ডাতে আলোচ্য হয়ে উঠল। ঘানির তেল ছাড়া মুখে না রোচা খাঁটি বাঙালি বাড়িও বাজারে গিয়ে তেল মশলাহীন, উপকারী খাবারের খোঁজ করতে থাকল। সেই খোঁজেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠল ভুট্টা। তবে কাঁচা ভুট্টা নয়, কর্ন ফ্লেক্স! ভারতে অনেক পরে হলেও বিশ্বে কর্নফ্লেক্সের জনপ্রিয়তা কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন। তবে সকালের প্রথম খাবার হিসেবে কিন্তু এই কর্নফ্লেক্সের জন্ম নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত বিষয়, যা শুনে চক্ষু কপাল ছাড়িয়ে মহাকাশে উঠে গেলেও যেতে পারে। কর্নফ্লেক্স আসলে ১৯ শতকের এক ওষুধ। সেই সময় হস্তমৈথুন সম্পর্কিত 'পাপ' দূর করতে এবং বিশুদ্ধ খ্রিস্টান বিশ্বাসের আস্থা ফেরাতেই এই খাবারের জন্ম।

জন হার্ভে কেলগ ১৮৯৮ সালে তাঁর ভাই, ডব্লিউকে কেলগের সঙ্গে মিলে প্রথম কর্ন ফ্লেক্স তৈরি করেছিলেন। আসলে তারা তৈরি করতে চেয়েছিলেন গ্রানোলা, কিন্তু তা তৈরিতে ব্যর্থ হয়ে বানিয়ে ফেলেন ফ্লেক্স! মিশিগানের ব্যাটল ক্রিক স্যানিটারিয়ামে হার্ভে কেলগ কাজ করতেন। সেখানে রোগীদের খাওয়ানোর জন্য এই খাবারটি তৈরি হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টয়লেট পেপার নয়, এক সময়ে ভুট্টাই ছিল মানুষের শৌচাগারের অন্যতম সঙ্গী

Before Toilet Paper: মার্কিনরা নাকি নিজেকে পরিষ্কার রাখার অন্যতর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করত শুকনো ভুট্টার কাণ্ডকে।

১৯ শতকের শুরুতে ফ্রান্সের একটি হস্তমৈথুন বিরোধী পোস্টার

হার্ভে কেলগ ছিলেন পেশায় একজন চিকিত্সক এবং পুষ্টিবিদ। সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের প্রতি তাঁর ভক্তির ছায়া এসে পড়ল তাঁর এই সদ্য আবিষ্কৃত খাবারের উপরেও! কর্ন ফ্লেক্সকে দেখা হতে থাকল এক অদ্ভুত 'পবিত্র' দৃষ্টিতে। ২০ শতকের সূচনাপর্বে কেলগই ছিলেন 'পরিচ্ছন্ন জীবনধারা আন্দোলন'-এর নেতৃত্বস্থানীয় মুখ। এই আন্দোলন মূলত নৈতিকতার উপর জোর দিয়েছিল। জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার সম্পর্ক, স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং বিশুদ্ধতার গুরুত্বের প্রচার করাই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। সেই সময়ে যৌনতাকে দেখা হতো অদ্ভুত এক 'পাপ'নজরে। হার্ভে কেলগও এই নৈতিক বিশুদ্ধতার পথে হেঁটে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যৌনতা এক 'পাপ'। যৌনতার তীব্র বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। শোনা যায়, তিনি এবং তাঁর স্ত্রী পৃথক ঘরে ঘুমোতেন এবং তাদের বৈবাহিক জীবনে তারা কোনওদিন যৌনতায় লিপ্ত হননি। আত্মরতির সাংঘাতিক বিরোধিতা করতেন কেলগ যে কারণে তিনি ছিলেন হস্তমৈথুনের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে।

চিকিৎসক কেলগ মানুষের যৌনতার তীব্রতায় এতটাই বিরক্ত হয়েছিলেন যে তিনি যৌনতা, হস্তমৈথুন, 'নোংরা স্বপ্ন’, বেশ্যাবৃত্তি এবং অন্যান্য যৌনতা সম্পর্কে একটি আস্ত বইও লিখে ফেলেছিলেন। তাঁর সেই মূল গ্রন্থ – প্লেইন ফ্যাক্টস ফর ওল্ড অ্যান্ড ইয়াং: এমব্রেসিং দ্য ন্যাচারাল হিস্ট্রি অ্যান্ড হাইজিন অব অর্গানিক লাইফ-এ তিনি কিছু 'টিপস' লিখলেন কীভাবে হস্তমৈথুন থেকে মানুষকে দূরে রাখা যায় এই বিষয়ে। আত্মরতিকে তিনি মনে করতেন 'স্ব-অত্যাচার'। তাই নিজেকে এভাবে অত্যাচার করা থেকে কীভাবে একজন ব্যক্তি বিরত থাকতে পারেন সে সম্পর্কে পরামর্শ দিলেন কেলগ। তাঁর মতে, ব্যায়াম এবং খাদ্যাভ্যাসই নাকি হস্তমৈথুনের মতো ঘটনা থেকে মানুষকে দূরে রাখতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
যৌনতার খেলনা নয়, উন্মাদনার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো 'রেক্টাল ডাইলেটর'?

Rectal Dilator: রেক্টাল ডাইলেটরের প্যাকেটে বড় বড় করে উল্লেখ করা রইত, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া ৮ বছরের কম বয়সের কারও এসব ব্যবহার করা উচিত নয়।

ঝাল এবং মশলাদার খাবার ছিল তাঁর নজরে বিষ! তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, সাধারণ খাবারই হস্তমৈথুনের আকাঙ্ক্ষাকে বশ করতে পারে, যেমন তাঁর সদ্য আবিষ্কৃত কর্ন ফ্লেক্স! এবং সেই থেকেই বেচারা কর্ন ফ্লেক্স হয়ে উঠল হস্তমৈথুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক সৈনিক!

যদিও হস্তমৈথুন বিরোধী প্রাতঃরাশ ছিল শুরুয়াদ মাত্র! কেলগ হস্তমৈথুন প্রতিরোধের কিছু চরমপন্থী পদ্ধতিও লিখেছিলেন। মহিলাদের ক্ষেত্রে 'অস্বাভাবিক উত্তেজনা' রোধ করতে তিনি ক্লিটোরিসে বিশুদ্ধ কার্বলিক অ্যাসিড প্রয়োগের পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন, হস্তমৈথুন ঠেকাতে সমস্ত অল্প বয়সি ছেলেদের লিঙ্গের উপরের চামড়াটি কেটে দেওয়া উচিত৷ এসব ভয়ানক পরামর্শ একজন চিকিৎসক কীভাবে দিতে পারেন, প্রশ্নটি যদি মাথার মধ্যে কামড়ায়, মাথায় রাখতে হবে সময়টা ১৯ শতক। যৌনতাকে ধর্মের সঙ্গে মিশিয়ে তাতে পাপ-ভয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল সচেতনভাবেই।

জন হার্ভে কেলগ এসব মারাত্মক যৌনতারোধী কাজের পাশাপাশি অবশ্য রোগের জীবাণু তত্ত্ব নিয়েও বিশাল কাজ করেছিলেন। নির্দিষ্ট মাইক্রোস্কোপিক জীবগুলিই যে নির্দিষ্ট সব রোগের কারণ, তা বলেছিলেন তিনিই। অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বোঝার ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে ঢের এগিয়ে ছিলেন। আর রইল কথা কর্নফ্লেক্সের, হস্তমৈথুনবিরোধী খাবার হিসেবে কর্নফ্লেক্স কিন্তু বাজারে টিকে রইল না। এই খাবার টিকে রইল তার স্বাস্থ্যগুণের জন্যই। শতাব্দী পেরিয়েও তাই প্রাতঃরাশে এখনও কর্ন ফ্লেক্স অন্যতম বিশ্বস্ত খাবার। তা নিয়মিত খেয়েও মানুষ হস্তমৈথুন উপভোগ করেন, যথেষ্ট। এই দুইয়ের কোনও সংঘাত নেই, সম্পর্কও না।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।

সুপারমার্কেটের শাকে নয়, বুনোশাকেই রয়েছে বেশি পুষ্টিগুণ

Wild leafy greens: Scientific Reports (2024)-এর গবেষণা বলছে, বাণিজ্যিক উপায়ে চাষ করা সাধারণ সবজির চেয়ে এই বুনো শাকগুলিতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ ও সি এবং ফাইবার অনেক বেশি থাকে। এমনকী কর্ণাটকের সোলিগা উপজাতির মহিলারা গর্ভবতী মায়েদের রক্তশূন্যতা দূর করতে বিশেষ কিছু বুনো শাক ব্যবহার করে আসছেন যুগের পর যুগ।