ট্রেন চালাতে চান না! হাজারে হাজারে মহিলা লোকো পাইলট কেন চিঠি দিচ্ছেন রেলকে?

Woman Loco Pilots: বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ২,০০০ মহিলা লোকো পাইলট কাজ করছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ জন কাজ বদলাতে চেয়ে ওই চিঠিতে সই করেছেন।

inscript
৪ মিনিট
ট্রেন চালাতে চান না! হাজারে হাজারে মহিলা লোকো পাইলট কেন চিঠি দিচ্ছেন রেলকে?

কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের নিরাপত্তার দাবি নিয়ে হইহই আন্দোলনকে অনেকেই ‘নাটক’ বলে, ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করেছেন, আগামীতেও করবেন। এমনিতেই 'মেয়েরাও তো আজকাল গাড়ি চালাচ্ছে, প্লেন চালাচ্ছে, মহাকাশে যাচ্ছে’ বলে অনেকেই প্রমাণ করে দেন আসলে মেয়েদের এগুলো করার কথাই ছিল না। করছে মানেই সমস্ত ক্ষমতায়ন ঘটে গেছে। মেয়েরা এসব কাজ কোন পরিস্থিতিতে করছে? কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা তো দূর অস্ত সামান্য স্বাস্থ্যকর অবস্থাও কি মহিলারা পান? ধরা যাক ভারতীয় রেলের কথা। মহিলাচালক দেখলেই সোশ্যাল মিডিয়া উপচে পড়ে লাগাতার পোস্টে। রেলের সেই মহিলা লোকো পাইলটরাই ভারতীয় রেলকে চিঠি দিয়েছেন যাতে তারা চাইছেন তাঁদের লোকো পাইলট বাদে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হোক! কেন?

চিঠিতে অল ইন্ডিয়া রেলওয়েম্যান ফেডারেশনের মহিলা লোকো পাইলটরা উল্লেখ করেছেন, তাঁদের চাকরিতে স্বাস্থ্য সমস্যা ভয়াবহ, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, নিরাপত্তার ভয় তো আছেই। এত ভয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সামলানোর পর আবার সংসারের দায়িত্বও তো মেয়েদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেয় পরিবার। চিঠিতে তারা দাবি জানিয়েছেন, মহিলা লোকো পাইলটদের 'ক্যাডার চেঞ্জ' হোক, অর্থাৎ লোকো পাইলট ছাড়া অন্য ভূমিকা দেওয়া হোক তাঁদের। উল্লেখ্য, বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ২,০০০ মহিলা লোকো পাইলট কাজ করছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ জন কাজ বদলাতে চেয়ে ওই চিঠিতে সই করেছেন। এই প্রথম যে মহিলা ট্রেনচালকরা এমন চিঠি দিলেন তা নয়। ২০১৮ সাল থেকে রেলের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা চলছে। রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মহিলাচালকদের ভূমিকা পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচনা করার কথা জানালেও কোনও কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি বলেই জানিয়েছেন তারা।

স্ক্রোল ডট ইনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের এক সহকারী লোকো পাইলট জানিয়েছেন, ২০২১ সালের মে মাসে তাঁর তীব্র পেটে ব্যথা আর জ্বর হয়। রেলের হাসপাতাল তাকে ব্যথানাশক ওষুধ দেয়, সোনোগ্রাফি করতে বলে। ওই মহিলা চালক ভেবেছিলেন অনিয়মের জন্য হয়তো বা গ্যাস হয়েছে, অথবা মূত্রনালীর সংক্রমণ। আগেও হয়েছে এমন। কিন্তু সেবার তাঁর কিডনির টিস্যুতে পুঁজ জমে যায়। সময়ে চিকিৎসা করিয়ে বেঁচে যান তিনি। মূত্রনালীর সংক্রমণ থেকেই এই মারাত্মক রোগ হয়েছিল তাঁর। মালগাড়ির লোকো পাইলট এই মহিলা ১২ ঘণ্টার শিফটে কাজ করতেন। এই সময়ে বাথরুম যেতে পারেন না তারা, কম জল খান। প্রস্রাব পেলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেপে রাখতে বাধ্য হন। ফলে এমন মারাত্মক রোগ ঘটতে বাধ্য!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাতের পর রাত ঘুম নেই! কেমন জীবন বাঁচেন রেলচালকেরা?

Indian Rail: ৬ জুলাই নয়াদিল্লি রেল স্টেশনে রাহুল গান্ধিকে সামনে পেয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন রেলের চালক ও লোকো পাইলটরা। তাঁদের অভিযোগ, ট্রেন নিয়ে বহু দূর যাওয়ার পর যে ন্যূনতম বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, তা তাঁরা পান না।

মহিলা লোকো পাইলটদের মূত্রনালীর সংক্রমণ অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সারা দেশে মহিলা লোকো পাইলটদের বড় অংশই পরিচ্ছন্ন শৌচালয়ের অভাবে, কাজের কঠিন সময়সীমার ফলে মূত্রনালীর সংক্রমণ, জরায়ুর ফাইব্রয়েড, উচ্চ রক্তচাপ,এমনকী গর্ভপাত সহ বিভিন্ন জটিলতায় ভোগেন।

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে, ভারতীয় রেল ট্রেনের ক্রু কেবিনে লোকো পাইলটদের জন্য টয়লেট স্থাপন করা শুরু করে। তবে খুব নগণ্য সংখ্যক লোকো পাইলটদের কেবিনেই টয়লেট রয়েছে। টয়লেট থাকলেও, বেশিরভাগ সময় ভিতরে জল থাকে না, ফলে অস্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে জায়গাটি। মহিলা লোকো পাইলটরা এও জানিয়েছিলেন যে শৌচাগার না থাকায় মহিলারা যে অসুবিধায় পড়েন তাতে কাজে মনোনিবেশ করাও অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে ট্রেনের নিরাপত্তাও এতে প্রভাবিত হতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দামী টিকিট, রক্তঘাম করা টাকায় দেওয়া আয়কর; ভারতীয় রেলে কোথায় যাত্রীসুরক্ষা?

Coromandel express Rail Kavach: যখন করমণ্ডল এক্সপ্রেস এবং যশবন্তপুর এক্সপ্রেসের সংঘর্ষ হলো, তখন কোনওটাতেই ছিল ছিল না এই ‘কবচ’ প্রযুক্তি। কেন ছিল না?

শুধু ট্রেনের ভিতরে তো সমস্যা নয়, বহু স্টেশনের লবিতেও মহিলা লোকো পাইলটদের জন্য আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থা নেই। শৌচালয় ব্যবহার করার জন্য, তাদের স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে যেতে হয়, সেখানে যাওয়া আসাতেই মিনিট দশেক চলে যায়।

আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি মহিলা লোকো পাইলটরা কাজ করছেন, অথচ তাঁদের জন্য সুষ্ঠু কাজের পরিকাঠামোই নেই। মহিলা লোকো পাইলটরা জানিয়েছেন, তাদের কেবিনের সিঁড়িগুলি মাটি থেকে এতটাই উঁচু যে তাদের মধ্যে ওঠার সময় সমস্যা তো হয়ই, নামার সময়েও লাফ দিতে হয়। মূলত মালগাড়ির লোকো পাইলটদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কারণ মালগাড়ি সাধারণত প্ল্যাটফর্মে থামে না। ভারতীয় মহিলাদের গড় উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট। অথচ মহিলাদের কথা মাথায় রেখে ট্রেনের কামরার সিঁড়িগুলি তৈরিই করা হয়নি। কেবিন থেকে এভাবেই লাফিয়ে নামতে গিয়ে মাটিতে পড়ে আহত হয়েছেন বহু মহিলা।

মহিলা লোকো পাইলটরা গর্ভধারণের সময় বিশেষ করে তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হন। বাইরে গর্ভাবস্থায় ডিউটি করার সময় গর্ভপাত ঘটে রক্তপাত হয়েছে বহু মহিলার। সেই সময় অফিসে বসে কাজ চাওয়া হলেও সেই আবেদন মঞ্জুর হয় না অনেকের। কোনও গর্ভবতী মহিলার পক্ষেই প্রায় ৬ থেকে ১১ ঘণ্টা বিরতি ছাড়া একটানা কাজ করা সম্ভব নয়। গর্ভবতী মহিলার শারীরিক শক্তি কম, মাথা ঘোরে, মেজাজের পরিবর্তন হয়, ঘুম থেকে উঠে অসুস্থ লাগে। ট্রেন চালানোর মতো কঠিন দায়িত্বের জন্য সক্রিয় এবং শারীরিকভাবে ফিট কর্মীদের প্রয়োজন যারা তাড়াতাড়ি উপরে উঠতে পারে, লোকোমোটিভ থেকে নেমে লোকোমোটিভ চেক করতে পারে, প্রযুক্তিগত ত্রুটি হলে সামলাতে পারে, এসব কাজ একজন গর্ভবতী মহিলার পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ গর্ভবতীরা ছুটি চাইলে, বা বসে কাজ চাইলে তা মঞ্জুরও করা হয় না অনেকসময়।

কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি মহিলা লোকো পাইলটদের নিরাপত্তার আশঙ্কাও বিপুল। মাঝরাতে কোথাও ট্রেন থামানো, জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে একজন মহিলার শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের ভয় কাজ করেই। রাতের ডিউটিতে মহিলাদের পিক-আপের ব্যবস্থাও নেই। তারপর এত ঝক্কি সামলে রয়েছে সংসারের গুরুভার। আর সবচেয়ে মজার বিষয়, পুরুষ সহকর্মীরাই বড়াই করে বলেন, এসব চাকরি মহিলাদের জন্য নয়। অথচ মহিলাদের জন্য সুন্দর পরিবেশ গড়ার কথা তারা ভাবেন না। রেলও ভাবে না কারণ কর্মস্থলটি পুরুষ-প্রধান। মহিলা লোকো পাইলট দেখে যতটা গর্ব হয়, তাঁদের কর্মস্থলের পরিস্থিতি দেখে ততটাই করুণা হওয়ার কথা। লিঙ্গসাম্যের পক্ষে কথা বলা, নিরাপত্তার দাবিতে স্লোগান তোলা যত বাড়বে, টনক কি নড়বে পুরুষ নিয়ন্ত্রিত এই কর্মক্ষেত্রগুলির মাথাদের?

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।