শরীরে সমস্যা থাকেই, তবু লড়ে যায় নারী

Anasuya Sen
৪ মিনিট
শরীরে সমস্যা থাকেই, তবু লড়ে যায় নারী

সপ্তাহের প্রথমদিন | অফিস কামাই করার কোনও উপায় নেই | কামাই করলে বসের চিমটি কাটা মন্তব্য তো আছেই, তার ওপর কাস্টমাররা আছে | ফোনে ফোনে উত্যক্ত করবে | অনেকগুলো Car Insuarance Premium -এর চেক কালেকশন হয়ে গেছে কী না! ইন্সিওরেন্স পলিসিগুলো চটপট রিনিউ করতে হবে | এই সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই সেগুলো Expire করে যাবে | পলিসি ডকুমেন্টগুলো রেডি করতে হবে | তাই নিমরাজি হয়েই শ্যামবাজার স্ট্রিটের ভাড়া বাড়ি থেকে হাঁটুর কাছাকাছি জমা জল ভাঙতে ভাঙতে সকাল ৯:৩০ নাগাদ পারমিতা এসে উপস্থিত হল শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে | ফোনে কথাবার্তা বলা ছিল, তাই তরুণও বাসস্টপে এসে হাজির | তরুণ বয়সে পারমিতার থেকে বছর তিনেকের ছোট | মহম্মদ আলি পার্কার কাছে একটা অটোমোবাইল কোম্পানিতে দুজনে চাকরি করে| থার্টি এ রুটের একটা বাস ধরে মহম্মদ আলি পার্কের স্টপেজে নামল| রাতভর নিম্নচাপের বৃষ্টিতে সেখানে তখন হাঁটু-ডোবা জল| বাস থেকে নামামাত্রই দুজনের প্যান্ট গেল ভিজে| পারমিতার তখন করুণ অবস্থা| মাথার ওপর ধরা ছাতা সামলাবে না কাঁধের ব্যাগ আর পরনের প্যান্ট ও কুর্তা! তরুনের অবস্থা তথৈবচ! শরীর মনের অস্বস্তি চাপতে না পেরে পারমিতা বলে উঠল- "পোড়া কপাল আর কী! একে একবিংশ শতাব্দী, তায় একবিংশ বর্ষা | গ্রামগঞ্জের কথা দূরে থাক, খাস কলকাতা শহরে বর্ষার দিনে মেয়েদের নিদারুন অবস্থা দেখ! কী প্রগতিটাই না হয়েছে! মেয়েদের দুর্ভোগ কোনদিন যাবে?" শুনে তরুণ বলল - "তুমি শুধু তোমাদের মেয়েদের কোথায় ভাবলে? আমরা ছেলেরা কী কষ্টভোগ করছি না?" তরুণকে পারমিতা ভাইয়ের মতো স্নেহ করে| ওকে কী করে সব কথা খুলে বলে? দুজনে ফুটপাথে উঠল, সেখানে জল অনেকটা কম| অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে পারমিতা প্রশ্ন করল তরুণকে- "তোর একে চন্দ্র মনে আছে? প্রশ্ন শুনে তরুণ চমকে গেল| খানিক হেসে ফেলে বলল- "কেন মনে থাকবে না? একে চন্দ্র, দুইয়ে পক্ষ, তিনি নেত্র, চারে বেদ, পাঁচে পঞ্চবাণ, ছয়ে ঋতু... তরুণকে থামিয়ে দেয় পারমিতা- " থাম, থাম, ছয়ে ঋতু আর সকলের জন্য| মেয়েদের জন্য একটা ঋতু বেশি। পারমিতার ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে তরুনের চোখ মুখ রক্তিম হয়ে উঠল, গম্ভীর হয়ে গেল| তরুণের ভাব দেখে পারমিতার মনে হল, তার এতটা প্রকাশ করা ঠিক হল না| কিন্তু, সে যে আর ধৈর্য্য রাখতে পারছে না! অফিসে ঢুকেই তাকে ওয়াশরুমে যেতে হবে, চেঞ্জ করতে হবে...

পারমিতা ব্যাগে করে আর একটা সেট পোশাক নিয়ে এসেছিল| না হলে, ভেজা পোশাক পরে অফিসে কাজ করলে নির্ঘাত জ্বর আসত| জ্বর এলে তো আর এক কেলেঙ্কারি! করোনা অতিমারির দাপট কমেছে, কিন্তু যায়নি| যে কোনও সময় তেড়েফুঁড়ে আবার আক্রমণ করতে পারে| তাই সাবধানের মার নেই| হাতে বেশ করে স্যানিটাইজার মাখতে মাখতে পারমিতা অফিসে নিজের Cubical- এ এসে বসল| সামনে জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেখল- আকাশ বেশ কালো করে আছে, আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে| দেখে পারমিতার কান্না পেল| রবিবার প্রচুর কাচাকাচি করে বারান্দায় শুকোতে দিয়েছিল| এই রকম চললে একটাও শুকোবে? ছোট মেয়েটাকে বাড়ি ফিরে কী পরতে দেবে? ওর আবার একটুতেই ঠান্ডা লেগে যায়| মানসের কাল সকাল আটটার ফ্লাইটে বেঙ্গালুরু যাওয়ার কথা| সে-ই বা কী জামাকাপড় সঙ্গে নিয়ে যাবে?

এতশত ভাবতে ভাবতে পারমিতার মাথা ধরে আসছিল| ওর মনে হল- এসব সমস্যা তো জীবনভর থাকবে আমাদের| তাই নিয়ে ভেবে ভেবে অফিসের কাজের অবহেলা করা ঠিক নয়| অফিস তো অন্ন যোগাচ্ছে| তাই কাজে মন দেওয়া যাক| কম্পিউটার চালু করল| ব্যাগের ভেতর থেকে মাস্কটা বার করে নাকের ওপর চাপানো মাত্রই দেখল সেটা ভিজে| আসলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসার সময় পাশ দিয়ে যাওয়া এক চলন্ত গাড়ির চাকার টানে জল ছিটকে এসেছিল মাস্কটার ওপর| নিজে হাতে ব্যাগে সব কিছু গোছানোর সময় একটা বাড়তি মাস্ক তো নেওয়া হয়নি আসার সময়| আর কে-ই বা গুছিয়ে দেবে?

এখন কী করা যায়? ভিজে মাস্ক পরে থাকা তো নিয়মবিরুদ্ধ| এখন কাকে পাঠানো যায় মাস্ক কিনে আনতে? এ বস্তু তো কারও কাছে চাওয়া যায় না ! আবার জল ভেঙে বেরোতে হবে? না সেটা একেবারেই অসম্ভব| অগত্যা স্বাস্থ্য-বিধির বিরুদ্ধে গিয়ে নোংরা জলের ছিটেলাগা ভেজা মাস্ক পরেই কাজ করতে হবে| বিনা মাস্ক-এ কাজ করা অফিস অ্যালাউ করবে না| পরিস্থিতির চাপে কত কিছুই না মেনে নিতে হয়!

অস্বস্তি চেপেই পারমিতা একটানা ঘণ্টা চারেক কাজ করল| দুটোর সময় টিফিন টাইম| দীপাদি ওঁর টিফিন বাক্স নিয়ে পারমিতার Cubical -এ এসে আরেকটা চেয়ার টেনে একটু তফাতে বসলেন| দীপাদির মেয়ের এখন Work From Home চলছে মেয়ের কথায় দীপাদি বললেন, এই প্রচণ্ড বর্ষার ভরপুর জলীয় বাস্প Internet Connection কীভাবে Disturb করছে| এত বেশি Interuption হচ্ছে Network -এ যে, কাজকর্ম করা দায়| একেবারে মাথায় হাত অবস্থা| "এমনিতেই তো কাজের সময়ের কোনও ছিরিছাঁদ নেই| রাত্রির দুটো-তিনটে পর্যন্ত জেগে বসে থাকা| তার ওপর যদি Network ঠিকমতো না পায় কী করে চাকরি বজায় রাখবে মেয়েটা? শরীরের তো বারোটা বাজছেই, তার সঙ্গে সংসারেরও| আমার মেয়ের কোলে একটা তিন বছরের বাচ্চা| কেমন করে তার যত্ন করবে, কেমন করেই বা আমার জামাইয়ের? আর ভেবে পাই না বাবা! মেয়েদের শতেক জ্বালা| জগ পাল্টালে কী হবে? মেয়েদের সমস্যা যেন নিত্যনতুন চেহারা নিয়ে আসছে"- বললেন দীপাদি পারমিতাকে| বর্ষার ধূসর মেঘ যেন ওঁর মুখের ওপর ভর করেছে |

সময় যায়, শরীরের সমস্যার শেষ হয় না। তা কেবল বাড়তেই থাকে। তার মধ্যেই লড়ে যায় পারমিতা বা দীপাদির মতো নারীরা।

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।