মন্ত্রীকন্যা অঙ্কিতা বনাম সাধারণ মেয়ে ববিতা, কে কী পেলেন, কী হারালেন

দুর্নীতির চোরাগোপ্তা পথে প্রভাবশালী বাবার তকমা কাজে লাগিয়ে চাকরি পেয়েও অঙ্কিতার মুখের হাসি ম্লান করে দিল সত্যের লড়াই। ববিতা এই ঘুণ ধরা সমাজের বুকেই লিখে দিলেন এভাবেও রুখে দাঁড়ানো যায়।

লড়াইটা সহজ ছিল না। মরচে পড়া, ঘুণ ধরা একটা সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের নায়ক এক উত্তরকন্যা। শেষ ভালো যার সব ভালো- অনেক লড়াইয়ের পর একথা যে একদিন তাঁর ক্ষেত্রে ফলে যাবে, তা কি ভেবেছিলেন, বোধহয় না! দোর্দণ্ডপ্রতাপ মন্ত্রীর মেয়ের বিরুদ্ধে লড়াই। দেশের আইন-আদালতকে আশ্রয় করে দেখিয়ে দিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এভাবেও রুখে দাঁড়ানো যায়।

শিলিগুড়ির কোর্ট মোড়ের বাসিন্দা ববিতা সরকারের প্রবঞ্চনার বিনিময়েই চাকরি পেয়েছিলেন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা। এবার অঙ্কিতার জায়গায় ববিতা সরকারকে চাকরি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এমনকী, এতদিন যে বেতন তিনি পেয়েছেন তাও ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর সেই টাকা এবার পাবেন ববিতা সরকার।

ববিতা কী পেলেন
আদালতের নির্দেশ, অবিলম্বে অঙ্কিতা অধিকারীর বেতনের প্রথম কিস্তির টাকা সুদ-সহ ববিতা সরকারকে দিতে হবে। দশ দিনের মধ্যে চাকরিতেও যোগ দেবেন তিনি। আদালতের নির্দেশে ববিতা সরকার পেতে চলেছেন তাঁর জায়গায় চাকরি পাওয়া মন্ত্রী-কন্যা অঙ্কিতা অধিকারীর বেতনের প্রথম কিস্তি— ৭,৯৬,৪৪২ টাকা এবং ১০ দিনের সুদ।

আরও পড়ুন: সাধারণ মেয়ের জেদের কাছে হারতে হল মন্ত্রীর মেয়েকে! প্রতিবাদের নাম ববিতা

কিন্তু এত দিন তো সেই অর্থে স্কুলে পড়াতে হয়নি তাঁকে। অথচ বেতনের অর্থ হাতে পাচ্ছেন। ববিতাকে প্রশ্ন করা হয়, কেউ এই নিয়ে কিছু বলেনি তাঁকে? তখনও ববিতার গলা কাঁপছে। জানালেন, সময় ফেরত আসে না। আমার বয়স তো আর ফিরবে না। গত চার বছরে আমি রোজ স্বপ্ন দেখেছি যে, স্কুলে পড়াচ্ছি। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙেছে কঠোর বাস্তবে। ভাবতেই পারিনি কখনও এই দিন আসবে। তবু হতাশ হয়ে লড়াই ছেড়ে দিইনি। আজ আদালতের এই রায়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবে আমি খুশি। হয়তো আমার বয়স চার বছর পিছোবে না, কিন্তু আদালতের নির্দেশে চার বছর আগের সেই সময় আমার জীবনে ফেরত এসেছে। আমি সেই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাব, যা চার বছর আগে আমার প্রাপ্য ছিল।

এত টাকা কী ভাবে খরচ করবেন ববিতা? জবাব দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছেন। তার পর জানিয়েছেন, এই টাকা শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়। টাকাটি তিনি কোনও ভালো কাজে ব্যবহার করবেন। ববিতার কথায়, ‘‘আমি জানি না। এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিছু ভেবে রাখিনি।’’ তবে পরক্ষণেই বললেন, ‘‘এ টাকা শুধু আমার নিজের জন্য নয়, যাতে কোনও ভালো কাজে ব্যবহার করা হয়, সেটা দেখব।’’ কোনও সমাজকল্যাণমূলক, ভালো কাজে টাকা ব্যয় করার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

অঙ্কিতা কী হারালেন
একটা দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ আর প্রভাবশালী বাবার দৌলতে চাকরি পেয়েছিলেন। শেষরক্ষা হয়নি। চাকরি আগেই গেছে, এবার গেল প্রাপ্য মাইনের প্রথম কিস্তি!

বিগত কয়েক বছর ধরে নিয়োগ নিয়ে লড়াই করে চলেছেন উত্তরবঙ্গের মেয়ে ববিতা সরকার। তালিকা তৈরি হওয়ার পরও কীভাবে জুড়ে বসল অঙ্কিতা অধিকারীর নাম? টেস্ট না দিয়ে কীভাবে চাকরি পেলেন অঙ্কিতা? এই প্রশ্ন প্রথম থেকে তুলে এসেছেন তিনি। সেই মামলায় ইতিমধ্যে চাকরি গিয়েছে রাজ্যের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতার। তবে ববিতার অভিযোগ যে সত্যি, এবার তাও প্রমাণ হয়ে গেল আদালতে। শুক্রবার এসএসসি-সংক্রান্ত মামলায় প্রথমবার মধ্যশিক্ষা পর্ষদ স্বীকার করে নিল, অঙ্কিতা কোনও দিন ইন্টারভিউ দেননি। অর্থাৎ ইন্টারভিউ ছাড়াই চাকরি হয়ে গিয়েছিল মন্ত্রী-কন্যার। শুক্রবার বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বেঞ্চে ছিল এই মামলার শুনানি। আর সেখানেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদের আইনজীবী সুতনু পাত্র জানিয়েছেন, অঙ্কিতা কোনও ইন্টারভিউ দেননি। খোদ চেয়ারম্যান একথা জানিয়েছেন।

এই মামলার মামলাকারী ববিতা জানিয়েছিলেন, অঙ্কিতার কোনও পার্সোনালিটি টেস্টের পরীক্ষা হয়নি। পার্সোনালিটি টেস্ট না দিয়েই চাকরি পেয়েছিলেন অঙ্কিতা। ববিতার দাবি এবার মেনে নিল পর্ষদও। তাহলে দুর্নীতির হাত ধরে পাওয়া চাকরি যেমন খোয়াতে হল অঙ্কিতাকে, তেমনই করতে হল সত্যের কাছে সমর্পণ ও আর্থিক দণ্ড!

ববিতার লড়াই
ববিতা ২০১৬ সালে স্কুল শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় বসেন। যার মেধাতালিকা প্রকাশ হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর। সেই তালিকায় ববিতার নাম প্রথম ২০-তে থাকলেও পরে তালিকাটি বাতিল করে দেয় এসএসসি। প্রকাশ হয় নতুন তালিকা। তাতে একঘর পিছিয়ে যায় ববিতার নাম। ববিতার থেকে ১৬ নম্বর কম পেয়েও মেধাতালিকার শীর্ষে ওঠে রাজ্যের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশচন্দ্র অধিকারীর কন্যা অঙ্কিতার নাম। ফলে ববিতার নাম চলে যায় ওয়েটিং লিস্টে। ঘটনাটি জানতে পেরে শুরু হয় ববিতার লড়াই।

২০১৭ থেকে ২০২২ সাল। রাজ্যের শিক্ষামানচিত্রে অঙ্কিতা অধিকারীর নাম ছাড়াও অপর একটি নাম ফের আসে চর্চায়। তিনি ববিতা সরকার। ওয়েটিং লিস্টে নাম ছিল তাঁর। এদিকে সাধারণত প্যানেল লিস্টে থাকা কর্মপ্রার্থীদের চাকরি হওয়ার পরে ওয়েটিং লিস্টে থাকা চাকরিপ্রার্থীদের পালা আসে। এই নিয়ে আশায় আশায় বসেছিলেন শিলিগুড়ির কোর্ট মোড়ের বাসিন্দা ববিতা সরকার। কিন্তু সেই চাকরি আর জুটল না। তালিকা প্রকাশের দাবিতে আন্দোলনে নামেন কর্মপ্রার্থীরা। এরপর দেখা যায় ববিতা সরকারের নাম রয়েছে ২০ নম্বরে। এদিকে দ্বিতীয় কাউন্সেলিংয়ের পর তিনি জানতে পারেন তাঁর নাম চলে এসেছে ২১ নম্বরে। আর এক অদৃশ্য হাতের জোরে এক নম্বরে চলে এসেছে অঙ্কিতা অধিকারীর নাম। তাঁর বাবা-ই পরেশ অধিকারী।

ববিতার দাবি, অঙ্কিতার ইন্টারভিউ ছাড়া প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৬১। এদিকে তাঁর ইন্টারভিউ-সহ নম্বর ছিল ৭৭। অঙ্কিতা যদি ইন্টিরভিউতে ১০ নম্বরও পান তবেও তাঁর নম্বর কোনওভাবে ববিতার থেকে বেশি হবে না। তাহলে কীভাবে মেধাতালিকায় অঙ্কিতার নাম প্রথমে এসে যায়?

প্রভাবশালী মন্ত্রী-কন্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ববিতা। তাঁর হার না-মানা জেদ প্রভাবশালী মন্ত্রীকেও এনে ফেলেছে সিবিআইয়ের দরজায়। এদিকে এসএসসির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন সিদ্ধার্থ মজুমদার। তিনিও জানিয়েছিলেন, পরেশ কন্যাকে অবৈধভাবে চাকরি দেওয়ার কথা। এই লড়াইয়ের শরিক তিনিও। তারপর ববিতার ভরসা দেশের আইন-আদালত। শুক্রবার এত লড়াইয়ের পর শেষ হাসি হাসলেন তিনি।

দুর্নীতির চোরাগোপ্তা পথে প্রভাবশালী বাবার তকমা কাজে লাগিয়ে চাকরি পেয়েও অঙ্কিতার মুখের হাসি ম্লান করে দিল সত্যের লড়াই। ববিতা এই ঘুণ ধরা সমাজের বুকেই লিখে দিলেন এভাবেও রুখে দাঁড়ানো যায়। সততার পথে সত্যেরই জয়। জয়ী ববিতা!

More Articles

;