মন্ত্রীকন্যা অঙ্কিতা বনাম সাধারণ মেয়ে ববিতা, কে কী পেলেন, কী হারালেন

দুর্নীতির চোরাগোপ্তা পথে প্রভাবশালী বাবার তকমা কাজে লাগিয়ে চাকরি পেয়েও অঙ্কিতার মুখের হাসি ম্লান করে দিল সত্যের লড়াই। ববিতা এই ঘুণ ধরা সমাজের বুকেই লিখে দিলেন এভাবেও রুখে দাঁড়ানো যায়।

tiasa gupta
৪ মিনিট
মন্ত্রীকন্যা অঙ্কিতা বনাম সাধারণ মেয়ে ববিতা, কে কী পেলেন, কী হারালেন

লড়াইটা সহজ ছিল না। মরচে পড়া, ঘুণ ধরা একটা সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ের নায়ক এক উত্তরকন্যা। শেষ ভালো যার সব ভালো- অনেক লড়াইয়ের পর একথা যে একদিন তাঁর ক্ষেত্রে ফলে যাবে, তা কি ভেবেছিলেন, বোধহয় না! দোর্দণ্ডপ্রতাপ মন্ত্রীর মেয়ের বিরুদ্ধে লড়াই। দেশের আইন-আদালতকে আশ্রয় করে দেখিয়ে দিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এভাবেও রুখে দাঁড়ানো যায়।

শিলিগুড়ির কোর্ট মোড়ের বাসিন্দা ববিতা সরকারের প্রবঞ্চনার বিনিময়েই চাকরি পেয়েছিলেন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতা। এবার অঙ্কিতার জায়গায় ববিতা সরকারকে চাকরি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এমনকী, এতদিন যে বেতন তিনি পেয়েছেন তাও ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর সেই টাকা এবার পাবেন ববিতা সরকার।

ববিতা কী পেলেন

আদালতের নির্দেশ, অবিলম্বে অঙ্কিতা অধিকারীর বেতনের প্রথম কিস্তির টাকা সুদ-সহ ববিতা সরকারকে দিতে হবে। দশ দিনের মধ্যে চাকরিতেও যোগ দেবেন তিনি। আদালতের নির্দেশে ববিতা সরকার পেতে চলেছেন তাঁর জায়গায় চাকরি পাওয়া মন্ত্রী-কন্যা অঙ্কিতা অধিকারীর বেতনের প্রথম কিস্তি— ৭,৯৬,৪৪২ টাকা এবং ১০ দিনের সুদ।

কিন্তু এত দিন তো সেই অর্থে স্কুলে পড়াতে হয়নি তাঁকে। অথচ বেতনের অর্থ হাতে পাচ্ছেন। ববিতাকে প্রশ্ন করা হয়, কেউ এই নিয়ে কিছু বলেনি তাঁকে? তখনও ববিতার গলা কাঁপছে। জানালেন, সময় ফেরত আসে না। আমার বয়স তো আর ফিরবে না। গত চার বছরে আমি রোজ স্বপ্ন দেখেছি যে, স্কুলে পড়াচ্ছি। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙেছে কঠোর বাস্তবে। ভাবতেই পারিনি কখনও এই দিন আসবে। তবু হতাশ হয়ে লড়াই ছেড়ে দিইনি। আজ আদালতের এই রায়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তবে আমি খুশি। হয়তো আমার বয়স চার বছর পিছোবে না, কিন্তু আদালতের নির্দেশে চার বছর আগের সেই সময় আমার জীবনে ফেরত এসেছে। আমি সেই সমস্ত সুযোগ-সুবিধা পাব, যা চার বছর আগে আমার প্রাপ্য ছিল।

এত টাকা কী ভাবে খরচ করবেন ববিতা? জবাব দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছেন। তার পর জানিয়েছেন, এই টাকা শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়। টাকাটি তিনি কোনও ভালো কাজে ব্যবহার করবেন। ববিতার কথায়, ‘‘আমি জানি না। এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিছু ভেবে রাখিনি।’’ তবে পরক্ষণেই বললেন, ‘‘এ টাকা শুধু আমার নিজের জন্য নয়, যাতে কোনও ভালো কাজে ব্যবহার করা হয়, সেটা দেখব।’’ কোনও সমাজকল্যাণমূলক, ভালো কাজে টাকা ব্যয় করার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সাধারণ মেয়ের জেদের কাছে হারতে হল মন্ত্রীর মেয়েকে! প্রতিবাদের নাম ববিতা

পরেশ অধিকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরেই পরেশ অধিকারী প্রভাব খাটিয়ে মেয়েকে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন।

অঙ্কিতা কী হারালেন

একটা দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজ আর প্রভাবশালী বাবার দৌলতে চাকরি পেয়েছিলেন। শেষরক্ষা হয়নি। চাকরি আগেই গেছে, এবার গেল প্রাপ্য মাইনের প্রথম কিস্তি!

বিগত কয়েক বছর ধরে নিয়োগ নিয়ে লড়াই করে চলেছেন উত্তরবঙ্গের মেয়ে ববিতা সরকার। তালিকা তৈরি হওয়ার পরও কীভাবে জুড়ে বসল অঙ্কিতা অধিকারীর নাম? টেস্ট না দিয়ে কীভাবে চাকরি পেলেন অঙ্কিতা? এই প্রশ্ন প্রথম থেকে তুলে এসেছেন তিনি। সেই মামলায় ইতিমধ্যে চাকরি গিয়েছে রাজ্যের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশ অধিকারীর মেয়ে অঙ্কিতার। তবে ববিতার অভিযোগ যে সত্যি, এবার তাও প্রমাণ হয়ে গেল আদালতে। শুক্রবার এসএসসি-সংক্রান্ত মামলায় প্রথমবার মধ্যশিক্ষা পর্ষদ স্বীকার করে নিল, অঙ্কিতা কোনও দিন ইন্টারভিউ দেননি। অর্থাৎ ইন্টারভিউ ছাড়াই চাকরি হয়ে গিয়েছিল মন্ত্রী-কন্যার। শুক্রবার বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বেঞ্চে ছিল এই মামলার শুনানি। আর সেখানেই মধ্যশিক্ষা পর্ষদের আইনজীবী সুতনু পাত্র জানিয়েছেন, অঙ্কিতা কোনও ইন্টারভিউ দেননি। খোদ চেয়ারম্যান একথা জানিয়েছেন।

এই মামলার মামলাকারী ববিতা জানিয়েছিলেন, অঙ্কিতার কোনও পার্সোনালিটি টেস্টের পরীক্ষা হয়নি। পার্সোনালিটি টেস্ট না দিয়েই চাকরি পেয়েছিলেন অঙ্কিতা। ববিতার দাবি এবার মেনে নিল পর্ষদও। তাহলে দুর্নীতির হাত ধরে পাওয়া চাকরি যেমন খোয়াতে হল অঙ্কিতাকে, তেমনই করতে হল সত্যের কাছে সমর্পণ ও আর্থিক দণ্ড!

ববিতার লড়াই

ববিতা ২০১৬ সালে স্কুল শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় বসেন। যার মেধাতালিকা প্রকাশ হয়েছিল ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর। সেই তালিকায় ববিতার নাম প্রথম ২০-তে থাকলেও পরে তালিকাটি বাতিল করে দেয় এসএসসি। প্রকাশ হয় নতুন তালিকা। তাতে একঘর পিছিয়ে যায় ববিতার নাম। ববিতার থেকে ১৬ নম্বর কম পেয়েও মেধাতালিকার শীর্ষে ওঠে রাজ্যের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশচন্দ্র অধিকারীর কন্যা অঙ্কিতার নাম। ফলে ববিতার নাম চলে যায় ওয়েটিং লিস্টে। ঘটনাটি জানতে পেরে শুরু হয় ববিতার লড়াই।

২০১৭ থেকে ২০২২ সাল। রাজ্যের শিক্ষামানচিত্রে অঙ্কিতা অধিকারীর নাম ছাড়াও অপর একটি নাম ফের আসে চর্চায়। তিনি ববিতা সরকার। ওয়েটিং লিস্টে নাম ছিল তাঁর। এদিকে সাধারণত প্যানেল লিস্টে থাকা কর্মপ্রার্থীদের চাকরি হওয়ার পরে ওয়েটিং লিস্টে থাকা চাকরিপ্রার্থীদের পালা আসে। এই নিয়ে আশায় আশায় বসেছিলেন শিলিগুড়ির কোর্ট মোড়ের বাসিন্দা ববিতা সরকার। কিন্তু সেই চাকরি আর জুটল না। তালিকা প্রকাশের দাবিতে আন্দোলনে নামেন কর্মপ্রার্থীরা। এরপর দেখা যায় ববিতা সরকারের নাম রয়েছে ২০ নম্বরে। এদিকে দ্বিতীয় কাউন্সেলিংয়ের পর তিনি জানতে পারেন তাঁর নাম চলে এসেছে ২১ নম্বরে। আর এক অদৃশ্য হাতের জোরে এক নম্বরে চলে এসেছে অঙ্কিতা অধিকারীর নাম। তাঁর বাবা-ই পরেশ অধিকারী।

ববিতার দাবি, অঙ্কিতার ইন্টারভিউ ছাড়া প্রাপ্ত নম্বর ছিল ৬১। এদিকে তাঁর ইন্টারভিউ-সহ নম্বর ছিল ৭৭। অঙ্কিতা যদি ইন্টিরভিউতে ১০ নম্বরও পান তবেও তাঁর নম্বর কোনওভাবে ববিতার থেকে বেশি হবে না। তাহলে কীভাবে মেধাতালিকায় অঙ্কিতার নাম প্রথমে এসে যায়?

প্রভাবশালী মন্ত্রী-কন্যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ববিতা। তাঁর হার না-মানা জেদ প্রভাবশালী মন্ত্রীকেও এনে ফেলেছে সিবিআইয়ের দরজায়। এদিকে এসএসসির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন সিদ্ধার্থ মজুমদার। তিনিও জানিয়েছিলেন, পরেশ কন্যাকে অবৈধভাবে চাকরি দেওয়ার কথা। এই লড়াইয়ের শরিক তিনিও। তারপর ববিতার ভরসা দেশের আইন-আদালত। শুক্রবার এত লড়াইয়ের পর শেষ হাসি হাসলেন তিনি।

দুর্নীতির চোরাগোপ্তা পথে প্রভাবশালী বাবার তকমা কাজে লাগিয়ে চাকরি পেয়েও অঙ্কিতার মুখের হাসি ম্লান করে দিল সত্যের লড়াই। ববিতা এই ঘুণ ধরা সমাজের বুকেই লিখে দিলেন এভাবেও রুখে দাঁড়ানো যায়। সততার পথে সত্যেরই জয়। জয়ী ববিতা!

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?