স্নানযাত্রা থেকে রথ, ১৫ দিন কেন বন্ধ থাকে জগন্নাথের গর্ভগৃহ? যে পৌরাণিক কাহিনি জড়িয়ে

রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধূমধাম

ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম!

রথ ভাবে আমি দেব, পথ ভাবে আমি,

মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী!

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

আষাঢ় মানেই রথযাত্রা। বারো মাসে তেরো পার্বণের এক পার্বণ। রথযাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় স্নানযাত্রার দিন। রথযাত্রার আগে ১৪ জুন মঙ্গলবার পালিত হল জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার স্নানযাত্রা। বলা হয়, এই তিথিতেই মর্ত্যে আবির্ভাব হয়েছিল জগন্নাথ দেবের৷ শাস্ত্র অনুসারে জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা তিথিতে স্বয়ম্ভ‌ু মনুর ‌যজ্ঞের প্রভাবে জগন্নাথ আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাই এই তিথিকে জগন্নাথদেবের জন্মদিন হিসেবে পালন করার নির্দেশ দেন স্বয়ং মনু-ই। সেই জন্মদিন উপলক্ষেই এই বিশেষ স্নান উৎসব পালিত হয়ে আসছে।

কাল ২০২২, ১৪ জুন; ৬২৬ বছরে পা দিল হুগলির মাহেশে জগন্নাথের স্নানযাত্রা। পুরীতেও এত সমারোহে স্নানযাত্রা উৎসব পালিত হয় না। এখানকার স্নানযাত্রার যে জল, সেই জল আসে রিষড়ার কুমোর পরিবার থেকে। গঙ্গায় যে ষাঁড়াষাঁড়ি বান হয়, সেই জল সারা বছর ধরে মাটির ঘড়া ভরে সংগ্রহ করে রাখেন। সুগন্ধি দিয়ে কলাপাতায় মুড়ে সেই আঠাশ ঘড়া জল এবং দেড় মণ দুধ দিয়ে প্রভু জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা রানিকে স্নান করানো হয়। এবারও প্রথা মেনে তা হয়েছে। ১৫ জুন থেকে জগন্নাথ দেবের মন্দির পনেরো দিনের জন্য বন্ধ থাকবে। এই সময়টাকে বলা হয় অনবসর সময়।

আরও পড়ুন: কেন অসম্পূর্ণ জগন্নাথ মূর্তির হাত-পা? অলৌকিক সেই কাহিনি আজও রোমহর্ষক

এই সময় মন্দিরের ঘণ্টা, উলুধ্বনি কিছুই ধ্বনিত হবে না। ইশারাতেই প্রভুর পুজো হয়। শুধু তাই নয়, রীতি অনুযায়ী স্নানের পরে মহাপ্রভুর জ্বর আসে। ঘাটাল, মেদিনীপুর এবং আরামবাগের বিভিন্ন জায়গা থেকে বৈদ্যরা এসে প্রভু-র চিকিৎসা করেন, এবং পাচন সেবন করান। এর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় জগন্নাথ দেবের অঙ্গরাগ। এখানকার মহাপ্রভু ৬২৬ বছরের প্রাচীন। পুরীতে যেমন বারো বছর অন্তর বিগ্রহ তৈরি হয়। এখানে জগন্নাথ দেব কিন্তু এই ৬২৬ বছর একই বিগ্রহে নিরবচ্ছিন্নভাবে পূজিত হয়ে আসছেন।

এই প্রশ্ন নিশ্চয়ই অনেকের মনেই এসেছে যে, কেন রথের ১৫ দিন আগে করা হয় স্নানযাত্রা? আর ওই ১৫ দিনে কী এমন হয় যে, বন্ধ থাকে গর্ভগৃহ?

এর পিছনেও রয়েছে এক কাহিনি। মাধব দাস ছিলেন জগন্নাথের বিরাট ভক্ত। সংসারের সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে কেবল জগন্নাথের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন মাধব। কিন্তু আচমকাই তিনি প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়েন। বমি ও মলমূত্র ত্যাগ করতে থাকেন। এই অবস্থায় অন্যরা তাঁকে সাহায্য করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। মাধব জানান, তাঁর কোনও ভয় নেই। পরম-আরাধ্য জগন্নাথ তাঁকে ঠিকই রক্ষা করবেন। পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ দিকে যায়। পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন মাধব। কিন্তু তাঁর ভক্তি ছিল অটুট। শেষ পর্যন্ত ভক্তর কষ্ট দেখে তাঁকে সেবা করতে আবির্ভূত হন জগন্নাথ। তাঁর সেবাতেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন মাধব। জগন্নাথ মল-মূত্র লেগে থাকা মাধবের পোশাকও পরিষ্কার করতেন বলে জানা যায়। মাধব অবশ্য এসবের কিছুই জানতেন না। অসুখের ঘোরে তিনি প্রায় জ্ঞানহীন হয়ে পড়েছিলেন। সংবিৎ ফিরতেই তিনি চমকে ওঠেন জগন্নাথকে দেখে। আপ্লুত মাধব জানতে চান, "প্রভু, আপনি কেন আমার সেবা করলেন? আপনি তো চাইলেই আমায় এক মুহূর্তে সুস্থ করে দিতে পারতেন।"

তখন জগন্নাথ জানান, প্রতিটি মানুষকে নিজের ভাগের কষ্টটা ভোগ করতে হয়। যদি তিনি মাধবকে আগেই সারিয়ে দিতেন, তাহলে মাধবকে এই অবশিষ্ট কষ্ট ভোগ করতে আবার জন্ম নিতে হত। জগন্নাথ কখনওই চান না, তাঁর কোনও ভক্তকে কেবল কষ্ট ভোগ করার জন্য পুনর্জন্ম নিতে হবে। তবে পাশাপাশি জগন্নাথ এও জানান, মাধবের এখনও ১৫ দিনের অসুখ বাকি রয়েছে। তিনি ওই ক’দিনের অসুখ মাধবের কাছ থেকে নিয়ে নিতে চান। শেষ পর্যন্ত তাই হয়। মাধব সুস্থ হয়ে ওঠেন। আর ভক্তের অসুখ নিজের শরীরে ধারণ করেন জগন্নাথ। সেই শুরু।

সেই থেকে প্রতি বছর ১৫ দিনের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েন জগন্নাথ। স্নানযাত্রার পরের ১৫ দিন অসুস্থ থাকার পরে হয় রথযাত্রা। এই ১৫ দিন তিনি গৃহবন্দি, তিনি বিশ্রাম নেন। এই ১৫ দিন জগন্নাথকে ৫৬ ভোগ দেওয়া হয় না। মন্দিরের দরজা থাকে বন্ধ। তাঁকে আয়ুর্বেদিক ভেষজ ভোগ নিবেদন করা হয়। শীতল প্রলেপ লাগানো হয় জগন্নাথের মূর্তিতে। ভক্তের কষ্টে ভগবানের এত বড় কষ্ট স্বীকারের কাহিনি ফিরে ফিরে আসে প্রতি বছরের রথযাত্রার সময়। জগন্নাথের কাহিনির সূত্রে তাঁর পরম ভক্ত মাধব দাসের কথাও স্মরণ করেন সবাই।

১৫ দিন পর রাজবেশে সুসজ্জিত হয়ে দর্শন দিলে পালিত হয় নবযৌবন উৎসব। পরদিন রথে চেপে মাসির বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা। মাহেশের রথ পরিচিত নীলাচল রথ নামে। ঐতিহাসিক এই রথযাত্রায় রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও যোগদান করেছিলেন। এই রথে প্রতি বছর জগন্নাথ, বলরাম, সুভ্রদাকে বসানোর পরে একটি বিশেষ পুজো করা হয়। সেই পুজো দামোদর পুজো নামে খ্যাত। রথযাত্রায় এখানে ভোগ হিসেবে থাকে পোলাও, খিচুড়ি, আলুর দম, ধোকার ডালনা, পনির ও পায়েস। সোজা রথ থেকে উল্টো রথ অবধি প্রতিদিন নানা রকমের পদ রান্না করে দেওয়া হয় জগন্নাথ-বলরাম-সুভ্রদাকে। এইভাবেই চলে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী মাহেশের রথযাত্রা।

 

 

More Articles

;